হজ্জ পালনের নিয়মাবলি: ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ
ইসলামের মৌলিক জ্ঞান · তথ্যবক্স
বিস্তারিত বিবরণ
ইসলামের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের মধ্যে হজ্জ পঞ্চম আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতগুলোর একটা। এটা শুধু ভ্রমণ বা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়। আল্লাহর ঘর কাবা শরিফের দিকে যাত্রা, নিজের সবকিছু ছেড়ে তাঁর কাছে নিজেকে সমর্পণ করার এক অনন্য সুযোগ।
প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ আর সামর্থ্যবান মুসলিম নর-নারীর উপর জীবনে অন্তত একবার হজ্জ করা ফরজ। সামর্থ্য মানে শারীরিক সক্ষমতা, আর্থিক সচ্ছলতা আর পথের নিরাপত্তা। যার কাছে হজ্জ করার মতো টাকা আছে, অথচ তিনি সেটা না করে অন্য কাজে খরচ করেন, তিনি ফরজ ইবাদত ছেড়ে দেওয়ার গুনাহগার হন।
হজ্জ শুধু ধনীদের জন্য নয়। যারা সামর্থ্য অর্জন করেন, তাদের উপরই এটা ফরজ হয়। অনেকে সারাজীবন জমিয়ে, অনেকে ধার-দেনা করেও এই সফরে যান। কারণ হজ্জের ফজিলত অপরিসীম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য হজ্জ করে আর অশ্লীল কথা ও পাপাচার থেকে দূরে থাকে, সে ফিরে আসে এমনভাবে যেন তার মা তাকে নতুন করে জন্ম দিয়েছেন। মানে তার আগের সব গুনাহ মাফ হয়ে যায়।
হজ্জের সময় ও স্থান
হজ্জ শুধু নির্দিষ্ট সময়েই করা যায়। জিলহজ মাসের ৮ তারিখ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত এই ইবাদত সম্পন্ন হয়। এর বাইরে গেলে সেটা উমরাহ হতে পারে, কিন্তু হজ্জ হয় না। হজ্জের মূল কাজগুলো মক্কা, মিনা, আরাফা আর মুজদালিফায় হয়।
ইহরাম: হজ্জের প্রথম ধাপ
হজ্জ শুরু হয় ইহরাম বাঁধার মাধ্যমে। ইহরাম মানে নিজেকে হজ্জের নিয়মে বেঁধে ফেলা। পুরুষরা দুই টুকরো সাদা কাপড় পরেন—একটা কোমরে, অন্যটা কাঁধে। মহিলারা সাধারণ পোশাকই পরেন, তবে মুখ আর হাত এমনভাবে ঢেকে রাখেন না যা নামাজে বাধা দেয়।
ইহরাম বাঁধার পর কিছু কাজ হারাম হয়ে যায়—সুগন্ধি লাগানো, নখ কাটা, চুল কাটা, স্বামী-স্ত্রীর মিলন, শিকার করা ইত্যাদি। ইহরাম বাঁধতে হয় মীকাত থেকে। মীকাত হলো সেই নির্দিষ্ট সীমানা, যেখান থেকে হজ্জ বা উমরাহর নিয়ত করে ইহরাম বাঁধতে হয়। বিভিন্ন দিক থেকে আসা হাজীদের জন্য আলাদা আলাদা মীকাত আছে। মীকাত পার হয়ে গেলে ইহরাম না বেঁধে কাবায় ঢোকা যায় না। কেউ ভুলে গেলে বা না জানলে পরে দম (কুরবানি) দিতে হয়।
হজ্জের মূল কার্যক্রম
হজ্জের কয়েকটা প্রধান অংশ আছে। এগুলো সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে হয়।
তাওয়াফ
কাবা শরিফকে সাতবার ঘুরে প্রদক্ষিণ করাই তাওয়াফ। হজ্জের শুরুতে উমরাহর তাওয়াফ, পরে তাওয়াফে জিয়ারত আর শেষে বিদায়ী তাওয়াফ করতে হয়। তাওয়াফের সময় হাজীরা দোয়া করেন, কুরআন পড়েন বা নিজের মনের কথা আল্লাহর কাছে নিবেদন করেন।
সায়ী
সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সাতবার দৌড়ানো বা হাঁটা। এটা হাজেরা আলাইহিস সালামের স্মৃতি। তিনি পানি খুঁজতে গিয়ে এই পথ পাড়ি দিয়েছিলেন। সায়ী করার সময় হাজীরাও সেই ত্যাগ আর আল্লাহর উপর ভরসা স্মরণ করেন।
আরাফার ময়দানে অবস্থান
জিলহজের ৯ তারিখ আরাফার ময়দানে থাকা হজ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “হজ্জ হলো আরাফা।” এই দিন সূর্য ঢলে পড়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফায় অবস্থান করতে হয়। এখানে হাজীরা দোয়া করেন, ক্ষমা চান, আল্লাহর কাছে কাঁদেন। অনেকে বলেন, এই দিনের দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
মুজদালিফায় রাত যাপন
আরাফা থেকে সূর্যাস্তের পর মুজদালিফায় এসে রাত কাটাতে হয়। এখানে মাগরিব ও এশা একসাথে পড়া হয় আর কঙ্কর সংগ্রহ করা হয়।
কঙ্কর নিক্ষেপ (রমী)
মিনায় তিনটি জামরায় (বড়, মাঝারি ও ছোট) কঙ্কর মারা হয়। এটা শয়তানকে প্রত্যাখ্যানের প্রতীক। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যখন নিজের সন্তানকে কুরবানি করতে গিয়েছিলেন, তখন শয়তান তাঁকে বাধা দিতে চেয়েছিল। তিনি কঙ্কর মেরে শয়তানকে তাড়িয়েছিলেন। হাজীরাও সেই স্মৃতিকে জীবন্ত করেন।
কুরবানি
জিলহজের ১০ তারিখে কুরবানি করা হয়। এটা ইবরাহিম আলাইহিস সালামের ত্যাগের স্মরণ। যারা হজ্জে যান, তাদের জন্য এই কুরবানি ওয়াজিব।
মাথা মুণ্ডন বা চুল ছাঁটাই
কুরবানির পর পুরুষরা মাথা মুণ্ডন করেন বা চুল ছাঁটেন। মহিলারা একটু চুল কেটে নেন। এরপর ইহরাম খুলে সাধারণ পোশাক পরা যায়।
বিদায়ী তাওয়াফ
মক্কা ছাড়ার আগে কাবা শরিফকে শেষবারের মতো সাতবার প্রদক্ষিণ করতে হয়। একে তাওয়াফে বিদা বলে।
হজ্জের প্রকারভেদ
হজ্জ তিন ধরনের হতে পারে—তামাত্তু, কিরান আর ইফরাদ। সবচেয়ে সহজ আর অধিকাংশ হাজী যেটা করেন, সেটা হলো তামাত্তু হজ্জ। এতে প্রথমে উমরাহ করে ইহরাম খুলে সাধারণ জীবনযাপন করা যায়, পরে আবার হজ্জের ইহরাম বেঁধে হজ্জ সম্পন্ন করা হয়।
সতর্কতা ও গুরুত্ব
হজ্জের নিয়মগুলো খুব সূক্ষ্ম। কোনো অংশ ভুল হলে বা বাদ পড়লে হজ্জ অসম্পূর্ণ হতে পারে। অনেক সময় দম বা কুরবানি দিয়ে ক্ষতিপূরণ করতে হয়। তাই হজ্জে যাওয়ার আগে ভালোভাবে শেখা আর অভিজ্ঞ মানুষের সঙ্গে থাকা জরুরি। এখন অনেক নির্ভরযোগ্য হজ্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে, যেখানে আগে থেকেই নিয়মকানুন শেখানো হয়।
হজ্জ শুধু পাপ ধুয়ে দেয় না। এটা মানুষকে ধৈর্য, ত্যাগ, সমানতা আর আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য শেখায়। সাদা কাপড়ে সবাই একই রকম দেখায়—রাজা-প্রজা, ধনী-গরিবের কোনো পার্থক্য থাকে না। এই দৃশ্য মানুষের অন্তরে গভীর প্রভাব ফেলে।
হজ্জ আদায়ের পর ব্যক্তি ফিরে আসেন নতুন মানুষ হয়ে। অনেকে বলেন, হজ্জের পর জীবনটাই বদলে যায়। আল্লাহর কাছে কাছাকাছি হওয়ার যে অনুভূতি হজ্জে পাওয়া যায়, তা অন্য কোনো ইবাদতে সহজে মেলে না।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হজ্জ করার তাওফিক দান করুন আর কবুল করুন। যারা ইতিমধ্যে হজ্জ করেছেন, তাদের হজ্জ যেন কবুল হয়। আর যারা এখনো করতে পারেননি, তাদের যেন সামর্থ্য ও সুযোগ দান করেন। আমিন।
হজ্জ পালনের নিয়মাবলি: ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ সম্পর্কে
হজ্জ পালনের নিয়মাবলি: ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ ইসলামের মৌলিক জ্ঞানের একটি বিষয়।
ইসলামের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের মধ্যে হজ্জ পঞ্চম আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতগুলোর একটা। এটা শুধু ভ্রমণ বা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়। আল্লাহর ঘর কাবা শরিফের দিকে যাত্রা, নিজের সবকিছু ছেড়ে তাঁর কাছে নিজেকে সমর্পণ করার এক অনন্য সুযোগ।প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ আর সামর্থ্যবান মুসলিম নর-নারীর উপর জীবনে অন্তত একবার হজ্জ করা...
আরও বিষয় দেখতে ইসলামের মৌলিক জ্ঞান সেকশনে যান।