যাকাত হিসাব করার সঠিক পদ্ধতি: ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ

ইসলামের মৌলিক জ্ঞান · তথ্যবক্স

১০৭ ভিউ

বিস্তারিত বিবরণ

ইসলামের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের মধ্যে যাকাত তৃতীয়। নামাজের ঠিক পরেই এর স্থান। কুরআন মজীদে নামাজের সঙ্গে যাকাতের কথা বারবার এসেছে। এটা শুধু দান নয়। সম্পদের একটা নির্দিষ্ট অংশ আল্লাহর হক হিসেবে দরিদ্র ও অসহায়দের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ফরজ ইবাদত। যাকাত দিলে সম্পদ পবিত্র হয়, সমাজে সম্পদের ভারসাম্য আসে আর গরিব মানুষের জীবন একটু সহজ হয়।


যাকাত কখন ফরজ হয়


যাকাত ফরজ হতে কয়েকটা শর্ত পূরণ হতে হয়। প্রথমে ব্যক্তি মুসলিম হতে হবে। তার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকতে হবে। সেই সম্পদ পুরো এক চান্দ্র বছর (হিজরি বছর) তার মালিকানায় থাকতে হবে। আর সম্পদটা বৃদ্ধি পাওয়ার যোগ্য হতে হবে—যেমন নগদ টাকা, সোনা, রুপা বা ব্যবসার পণ্য। ব্যক্তিগত ব্যবহারের ঘর, কাপড়, আসবাবপত্র, গাড়ি বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ওপর যাকাত নেই।


নিসাব কী আর কত


নিসাব মানে সেই সর্বনিম্ন পরিমাণ সম্পদ, যার মালিক হলে যাকাত ফরজ হয়। শরিয়তে দুই রকম নিসাব নির্ধারণ করা হয়েছে।


সোনার নিসাব: সাড়ে সাত তোলা বা প্রায় ৮৫ থেকে ৮৭.৪৮ গ্রাম খাঁটি সোনা।

রুপার নিসাব: সাড়ে বায়ান্ন তোলা বা প্রায় ৫৯৫ থেকে ৬১২ গ্রাম রুপা।


এখন সোনা আর রুপার দাম অনেক আলাদা। রুপার নিসাবের মূল্য অনেক কম হয়। অধিকাংশ আলেম, বিশেষ করে হানাফি মাজহাবের অনুসারীরা, নগদ টাকা আর মিশ্র সম্পদের ক্ষেত্রে রুপার নিসাবকেই প্রাধান্য দেন। কারণ এতে বেশি মানুষ যাকাতের আওতায় আসে আর গরিবরা বেশি উপকৃত হয়। শুধু সোনা থাকলে সোনার নিসাব ধরা হয়। নিসাবের সমমূল্যের নগদ টাকা বা ব্যবসার পণ্য থাকলেও যাকাত ফরজ হয়।


যাকাতের হার


সোনা, রুপা, নগদ টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স, ব্যবসার পণ্য, শেয়ার—এসবের ওপর যাকাতের হার ২.৫ শতাংশ বা চল্লিশ ভাগের এক ভাগ। মানে মোট যাকাতযোগ্য সম্পদের প্রতি চল্লিশ টাকায় এক টাকা।


কৃষিজাত ফসলের ক্ষেত্রে হার আলাদা। বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক পানিতে চাষ হলে ১০ শতাংশ, কৃত্রিম সেচে চাষ হলে ৫ শতাংশ। গবাদি পশুর ক্ষেত্রেও আলাদা নিয়ম আছে। তবে সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় হলো নগদ, সোনা-রুপা আর ব্যবসার সম্পদের যাকাত।


কোন কোন সম্পদের ওপর যাকাত আসে


যাকাতযোগ্য সম্পদের মধ্যে আছে—

হাতে থাকা নগদ টাকা আর ব্যাংকে জমা টাকা,

সোনা ও রুপার গয়না বা বার (ব্যবহার করুক বা না করুক, হানাফি মতে),

ব্যবসার পণ্যের বর্তমান বাজারমূল্য (কেনার দাম নয়, বিক্রি করার দাম),

শেয়ার, সঞ্চয়পত্র, বিনিয়োগের বর্তমান মূল্য,

অন্যের কাছে পাওনা টাকা (যেগুলো ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা আছে)।


ব্যবসার পণ্যের ক্ষেত্রে শুধু লাভের ওপর যাকাত হয় না। দোকান বা গুদামে যে পণ্য বিক্রির জন্য রাখা আছে, তার পুরো বর্তমান বাজারমূল্য হিসাবে ধরতে হয়। দোকানের আসবাবপত্র, মেশিনারি বা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিসের ওপর যাকাত নেই।


যাকাত হিসাব করার ধাপ


প্রথমে একটা নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করে নিন (অনেকে রমজানে করেন)। প্রতি বছর একই তারিখে হিসাব করুন।

সেই দিনে আপনার কাছে থাকা সব যাকাতযোগ্য সম্পদের বর্তমান মূল্য যোগ করুন।

যদি কোনো তাৎক্ষণিক ঋণ থাকে (যেগুলো শিগগির পরিশোধ করতে হবে), সেগুলো বাদ দিন (মাজহাবভেদে নিয়ম একটু আলাদা হতে পারে)।

মোট যাকাতযোগ্য সম্পদ নিসাব পরিমাণ বা তার বেশি কিনা দেখুন।

নিসাব পূর্ণ হলে মোট সম্পদের ২.৫ শতাংশ হিসাব করুন। সহজ উপায়—মোট সম্পদকে ৪০ দিয়ে ভাগ করুন।


উদাহরণ: কারো কাছে নগদ ও ব্যাংকে ৩ লাখ টাকা, সোনার গয়না যার বর্তমান মূল্য ২ লাখ টাকা আর ব্যবসার পণ্যের মূল্য ১ লাখ টাকা। মোট ৬ লাখ টাকা। এটা নিসাবের উপরে হলে যাকাত হবে ৬ লাখ ÷ ৪০ = ১৫,০০০ টাকা।


যাকাত কাদের দেওয়া যাবে


কুরআনে সূরা তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে আট শ্রেণীর মানুষের কথা বলা হয়েছে, যাদের মধ্যে যাকাত বিতরণ করা যায়—

ফকির (যাদের প্রায় কিছুই নেই),

মিসকিন (যাদের প্রয়োজন মেটানোর মতো নেই),

যাকাত আদায় ও বিতরণের কাজে নিযুক্ত কর্মচারী,

যাদের অন্তর ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করতে হয়,

দাসমুক্তির জন্য,

ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি,

আল্লাহর পথে (জিহাদ বা কল্যাণকর কাজে),

মুসাফির (পথে বিপদগ্রস্ত)।


যাকাত পরিবারের নিকটাত্মীয়দের (বাবা-মা, সন্তান) দেওয়া যায় না। তবে ভাই-বোন, চাচা-চাচি ইত্যাদিকে দেওয়া যায় যদি তারা যোগ্য হয়।


যাকাত না দিলে কী হয়


যাকাত ফরজ। ইচ্ছাকৃতভাবে না দিলে এটা কবিরা গুনাহ। কুরআনে সতর্ক করা হয়েছে—যারা সোনা-রুপা জমা করে আর আল্লাহর পথে খরচ করে না, তাদের কঠিন শাস্তির সংবাদ দাও। হাদিসেও যাকাত না দেওয়ার ভয়াবহ পরিণতির কথা বলা হয়েছে।


যাকাত শুধু সম্পদ পরিশুদ্ধ করে না, মনের কৃপণতাও দূর করে, সমাজে সহানুভূতি বাড়ায় আর আল্লাহর রহমত আকর্ষণ করে। হিসাব করার সময় সতর্ক থাকা উচিত। কোনো সন্দেহ হলে স্থানীয় আলেম বা বিশ্বস্ত ইসলামি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরামর্শ করা ভালো। এখন অনেক নির্ভরযোগ্য যাকাত ক্যালকুলেটরও পাওয়া যায়, তবে মূল নীতিমালা বুঝে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।


আল্লাহ আমাদের সবাইকে যাকাত সঠিকভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ইসলামের মৌলিক জ্ঞান তালিকায় ফিরে যান

যাকাত হিসাব করার সঠিক পদ্ধতি: ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ সম্পর্কে

যাকাত হিসাব করার সঠিক পদ্ধতি: ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ ইসলামের মৌলিক জ্ঞানের একটি বিষয়।

ইসলামের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের মধ্যে যাকাত তৃতীয়। নামাজের ঠিক পরেই এর স্থান। কুরআন মজীদে নামাজের সঙ্গে যাকাতের কথা বারবার এসেছে। এটা শুধু দান নয়। সম্পদের একটা নির্দিষ্ট অংশ আল্লাহর হক হিসেবে দরিদ্র ও অসহায়দের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ফরজ ইবাদত। যাকাত দিলে সম্পদ পবিত্র হয়, সমাজে সম্পদের ভারসাম্য আসে আর গরিব মানুষের জীবন একটু...

আরও বিষয় দেখতে ইসলামের মৌলিক জ্ঞান সেকশনে যান।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

যাকাত হিসাব করার সঠিক পদ্ধতি: ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ইসলামের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের মধ্যে যাকাত তৃতীয়। নামাজের ঠিক পরেই এর স্থান। কুরআন মজীদে নামাজের সঙ্গে যাকাতের কথা বারবার এসেছে। এটা শুধু দান নয়। সম্পদের একটা নির্দিষ্ট অংশ আল্লাহর হক হিসেবে দরিদ্র ও অসহায়দের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ফরজ ইবাদত। যাকাত দিলে সম্পদ পবিত্র হয়, সমাজে সম্পদের ভারসাম্য আসে আর গরিব মানুষের জীবন একটু...
আরও বিষয় কোথায় পাব?
ইসলামের মৌলিক জ্ঞান পেজে সব বিষয় একসাথে দেখতে পারবেন।
যাকাত হিসাব করার সঠিক পদ্ধতি: ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ | ইসলামের মৌলিক জ্ঞান | তথ্যবক্স | Totthobox