প্রবারণা পূর্ণিমা (আশ্বিনী পূর্ণিমা)
ছুটির ক্যালেন্ডার · বিস্তারিত তথ্য
তারিখ ও বার
26 October, 2026
সোমবার



বিস্তারিত বিবরণ
প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ও পবিত্র ধর্মীয় উৎসব। বৌদ্ধ ধর্মে ‘বুদ্ধ পূর্ণিমা’র পর এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পরিগণিত হয়। আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত হয় বলে একে ‘আশ্বিনী পূর্ণিমা’ নামেও অভিহিত করা হয়। মূলত তিন মাসব্যাপী ভিক্ষুদের কঠোর আত্মসংযম ও সাধনার ‘বর্ষাবাস’ বা ‘বর্ষাব্রত’ সমাপ্তির দিন হিসেবে প্রবারণা পূর্ণিমা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
‘প্রবারণা’ শব্দের অর্থ ও তাৎপর্য
‘প্রবারণা’ একটি পালি শব্দ, যার আক্ষরিক অর্থ—তৃপ্তি বা আশাপূরণ, বর্জন, নিষেধ কিংবা আত্মনিবেদন। তবে বৌদ্ধ ধর্মীয় পরিভাষায় প্রবারণা বলতে বোঝায় ‘ত্রুটি-বিচ্যুতি স্বীকার করা এবং তা থেকে মুক্ত হওয়ার আহ্বান’।
বৌদ্ধ ভিক্ষুরা তিন মাসব্যাপী বর্ষাবাসের সময় সাধনা করতে গিয়ে জানাসত্বেও বা অজান্তে কোনো ভুল করে থাকলে, এই দিনে তাঁরা অন্য ভিক্ষুদের সামনে তা বিনয়ের সাথে স্বীকার করেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেন। একই সাথে অন্য কেউ তাঁদের ভুল ধরিয়ে দিলে তা সানন্দে মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। আত্মশুদ্ধি, হিংসা-দ্বেষ ত্যাগ এবং পারস্পরিক ভাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠার এই মহৎ শিক্ষা প্রবারণা পূর্ণিমার মূল ভিত্তি।
ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক পটভূমি
প্রবারণা পূর্ণিমার সাথে গৌতম বুদ্ধের জীবনের বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক ও অলৌকিক ঘটনা জড়িত রয়েছে:
- বর্ষাবাসের সমাপ্তি: আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস বৌদ্ধ ভিক্ষুদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে জ্ঞানচর্চা, ধ্যান ও সাধনা করা বাধ্যতামূলক, যাকে ‘বর্ষাবাস’ বলা হয়। প্রবারণা পূর্ণিমার মাধ্যমে এই কঠোর সাধনার সমাপ্তি ঘটে।
- তাবতিংশ স্বর্গ থেকে প্রত্যাবর্তন: বৌদ্ধ ত্রিপিটক ও পৌরাণিক তথ্য অনুযায়ী, সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধ মাতৃঋণ পরিশোধের জন্য তাবতিংশ স্বর্গে গমন করেছিলেন এবং সেখানে তাঁর প্রয়াত মাতা মায়াদেবীসহ দেবতাদের উদ্দেশে ‘অভিধর্ম’ দেশনা (ধর্মোপদেশ) প্রদান করেন। ধর্মদেশনা শেষে প্রবারণা পূর্ণিমার দিনে বুদ্ধ অলৌকিক সিঁড়ি বেয়ে মর্ত্যের ‘সংকাস্য’ নগরে অবতরণ করেন।
- চূড়ামণি চেত্য ও কেশ ধাতু: রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগের পর অনোমা নদীর তীরে স্বহস্তে নিজের মাথার চুল কেটে বাতাসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং প্রতিজ্ঞা করেছিলেন—যদি তিনি বুদ্ধত্ব লাভের যোগ্য হন, তবে এই চুল উর্ধ্বে গমন করবে। বিশ্বাস করা হয়, দেবরাজ ইন্দ্র সেই চুল গ্রহণ করে তাবতিংশ স্বর্গে ‘চূড়ামণি চেত্য’ (পবিত্র স্তূপ) স্থাপন করে প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রধান ধর্মীয় আচার ও ঐতিহ্য
প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপনে বৌদ্ধ বিহার ও গৃহস্থ পরিবারগুলোতে নানা ধর্মীয় ও সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হয়:
| অনুষঙ্গ ও আচার | বিবরণ ও গুরুত্ব |
| শীল গ্রহণ ও সংঘদান | গৃহস্থ উপাসক-উপাসিকারা সকালে বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে পঞ্চশীল ও অষ্টাঙ্গশীল গ্রহণ করেন। ভিক্ষুসংঘকে অন্ন, বস্ত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী (সংঘদান) প্রদান করা হয়। |
| ফানুস ওড়ানো | প্রবারণা পূর্ণিমার সন্ধ্যায় আকাশজুড়ে শত শত রঙিন ফানুস ওড়ানো হয়। স্বর্গের ‘চূড়ামণি চেত্য’র প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং জগতের সকল পাপ-কলুষ ধুয়ে ফেলার প্রতীক হিসেবে এই ফানুস উড়ানো হয়। |
| কঠিন চীবর দানের সূচনা | প্রবারণা পূর্ণিমার পরদিন থেকে শুরু হয় এক মাসব্যাপী ‘কঠিন চীবর দান’ উৎসব। এটি বৌদ্ধদের সবচেয়ে বড় দান উৎসব হিসেবে গণ্য হয়। |
| জাহাজ ভাসা উৎসব | কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের কোনো কোনো নদীতে এই দিনে ছোট ছোট প্রতিকৃতি বানিয়ে দীপ জ্বেলে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়, যা লোকজ সংস্কৃতির এক মনোরম দৃশ্য তৈরি করে। |
বাংলাদেশে প্রবারণা পূর্ণিমা
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, তিন পার্বত্য জেলা (রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) এবং পটুয়াখালী-বরগুনার রাখাইন অধ্যুষিত অঞ্চলে অত্যন্ত আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপিত হয়। বর্তমানে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের বৌদ্ধ বিহারগুলোতেও এটি মহাসমারোহে পালিত হয়।
সন্ধ্যায় বৌদ্ধ বিহারগুলোতে হাজার প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করা হয় এবং আকাশে বর্ণিল ফানুসের মেলা বসে। দেশের অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষও এই আলোকময় ফানুস উৎসব দেখতে সমবেত হন, যা বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সর্বজনীন সামাজিক মেলবন্ধনের এক দারুণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষা
প্রবারণা পূর্ণিমা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক ও নৈতিক দর্শন। ভুল স্বীকার করার মানসিকতা মানুষকে অহংকারমুক্ত করে এবং ক্ষমার গুণ শেখায়। জগতের সকল জীবের প্রতি মৈত্রী ও অহিংসার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই প্রবারণা পূর্ণিমার আসল শিক্ষা। অন্ধকারের ওপর আলোর বিজয় এবং কলুষতার ওপর পবিত্রতার জয়ের প্রতীক হয়ে এই উৎসব মানবজাতিকে সত্য ও সুন্দরের পথে চালিত করার অনুপ্রেরণা দেয়।
প্রবারণা পূর্ণিমা (আশ্বিনী পূর্ণিমা) সম্পর্কে
প্রবারণা পূর্ণিমা (আশ্বিনী পূর্ণিমা) হলো বাংলাদেশের Public ছুটি। তারিখ: 26 October, 2026 (সোমবার)।