বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য

প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত গৌরবময় ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন

ডিজিটাইজেশন, মেগা প্রজেক্ট ও আধুনিক বাংলাদেশের যাত্রা

ডিজিটাইজেশন, মেগা প্রজেক্ট ও আধুনিক বাংলাদেশের যাত্রাএকবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতি আর অর্থনীতিতে বাংলাদেশ আজ এক অনন্য উচ্চতায় দাঁড়িয়েছে। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের পর যে দেশকে একসময় ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে কটাক্ষ করা হয়েছিল, আজ সেই বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশ। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর মেগা প্রজেক্ট, সর্বাত্মক ডিজিটাইজেশন আর দ্রুত সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ওপর ভর করে এক আধুনিক, স্বনির্ভর ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলার যাত্রা শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালে জাতিসংঘের চূড়ান্ত স্বীকৃতির মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।বাংলাদেশে ডিজিটাইজেশনের যাত্রা শুধু প্রযুক্তি গ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটা হয়ে উঠেছে সর্বস্তরের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন আর অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির প্রধান হাতিয়ার। এর সবচেয়ে দৃশ্যমান আর ফলপ্রসূ প্রভাব পড়েছে দেশের আর্থিক খাতে। বিকাশ, রকেট, নগদের মতো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস আর আধুনিক ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার কল্যাণে প্রান্তিক কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ আজ ব্যাংকিং সেবার আওতায় এসেছেন। প্রবাসী আয় আর গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন এখন মুহূর্তের মধ্যেই গ্রামে পরিজনদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব গতি সঞ্চার হয়েছে।সরকারি অফিসের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনেও ডিজিটাইজেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ই-নামজারি, ডিজিটাল ভূমি জরিপ, অনলাইন পাসপোর্ট আবেদন, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেওয়া আর বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল পরিশোধের মতো সেবাগুলো এখন নাগরিকরা ঘরে বসেই মোবাইল বা কম্পিউটারের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে পারছেন। দেশের হাজার হাজার ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার আর ‘মাই গভ’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগণ সহজেই নাগরিক সেবা পাচ্ছে।ডিজিটাইজেশনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল এক তরুণ ফ্রিল্যান্সার ও উদ্যোক্তা গোষ্ঠী। তথ্যপ্রযুক্তি আর আইটি-এনাবল্ড সার্ভিস রপ্তানি করে দেশ প্রতি বছর বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। স্টার্টআপ সংস্কৃতির প্রসার, ই-কমার্স, রাইড শেয়ারিং আর ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলো শহরাঞ্চলে লাখ লাখ তরুণের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে।আধুনিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হলো উন্নত অবকাঠামো। অবকাঠামোগত ঘাটতি মেটাতে আর সংযোগ বৃদ্ধিতে গত এক যুগে বাংলাদেশে বাস্তবায়িত হয়েছে বেশ কিছু ঐতিহাসিক মেগা প্রজেক্ট, যা দেশের অর্থনৈতিক দৃশ্যপটকে চিরতরে বদলে দিয়েছে।নিজের অর্থায়নে ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মাসেতু নির্মাণ কেবল একটি কারিগরি সাফল্য ছিল না। এটা ছিল বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের আত্মমর্যাদার প্রতীক। পদ্মাসেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলাকে সরাসরি রাজধানী ঢাকা আর দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর ফলে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হয়েছে, নতুন নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠছে এবং এটি সার্বিক জিডিপিতে প্রতি বছর আনুমানিক ১.২ থেকে ১.৫ শতাংশ অতিরিক্ত অবদান রাখছে।রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসন আর গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়নে এমআরটি লাইন-৬ চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশ দ্রুতগতির পরিবেশবান্ধব নগর যাতায়াতের যুগে প্রবেশ করেছে। এতে কর্মঘণ্টা সাশ্রয়ের পাশাপাশি জ্বালানি নির্ভরতা আর পরিবেশ দূষণ কমেছে।চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম তলদেশীয় টানেল। এটা চট্টগ্রাম শহরকে নদীর অপর পাড়ের আনোয়ারা আর কোস্টাল বেল্টের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর ফলে চট্টগ্রাম ‘এক নগরী দুই শহর’ মডেলে চীনের সাংহাইয়ের আদলে গড়ে উঠছে।রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্ব পারমাণবিক ক্লাবে প্রবেশ করেছে। এটা পরিচ্ছন্ন আর টেকসই বেস-লোড বিদ্যুৎ নিশ্চিত করছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর আর পায়রা বন্দর বাংলাদেশের সমুদ্র বাণিজ্য অবকাঠামোকে বিশ্বমানে উন্নীত করছে। বড় মাদার ভেসেলগুলো এখন সরাসরি বাংলাদেশে নোঙর করতে পারছে, যা পণ্য আমদানি-রপ্তানির খরচ আর সময় নাটকীয়ভাবে কমিয়ে এনেছে।অর্থনৈতিক আর অবকাঠামোগত প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশে সামাজিক রূপান্তরও ঘটেছে ব্যাপক হারে। তৈরি পোশাক শিল্পে লাখ লাখ নারীর অংশগ্রহণ আর গ্রামীণ ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার সফলতার কারণে নারীরা আজ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। শিক্ষায় লিঙ্গ সমতা অর্জনে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। স্বাস্থ্যসেবার আধুনিকায়ন, গড় আয়ু বৃদ্ধি (বর্তমানে প্রায় ৭৩ বছর), শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া আর সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বিস্তার মানুষকে দারিদ্র্যসীমা থেকে বের করে আনতে সাহায্য করেছে।উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আধুনিক বাংলাদেশের পথচলা যেমন সম্ভাবনাময়, তেমনই কিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জও রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করা, ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ কমিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। কেবল পোশাক শিল্পের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি, ফার্মাসিউটিক্যালস, চামড়াজাত পণ্য আর হালকা প্রকৌশল শিল্পকে বৈশ্বিক বাজারে জনপ্রিয় করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এজন্য পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি আর টেকসই অবকাঠামো গঠনে ‘ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’-এর মতো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।ডিজিটাইজেশনের সুবাতাস, বিশ্বমানের মেগা প্রজেক্ট আর সাধারণ মানুষের অদম্য পরিশ্রমের সমন্বয়ে গঠিত আজকের আধুনিক বাংলাদেশ। অতীত আর বর্তমানের এই রূপান্তর প্রমাণ করে যে সঠিক পরিকল্পনা, সুশাসন আর প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে যেকোনো চ্যালেঞ্জ জয় করা সম্ভব। সকল বাধা আর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা পেরিয়ে প্রযুক্তি-নির্ভর, বৈষম্যহীন আর জ্ঞানভিত্তিক আধুনিক বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে—এটাই আজকের জাতির মূল প্রত্যাশা।

বিস্তারিত পড়ুন

১৯৬১ এর রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ

১৯৬১ সালের রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী: আইয়ুবী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ১৯৬১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন শুধু একটা সাহিত্যিক বা সাংস্কৃতিক আয়োজন ছিল না। এটা ছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু আর ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির প্রথম সংগঠিত সাংস্কৃতিক আন্দোলন। ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের চরম দমনপীড়নের মুখে দাঁড়িয়ে এই উৎসব পালন বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে। পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধিকার আর স্বাধীনতা সংগ্রামের সাংস্কৃতিক ভিত্তি রচনা করে এই আন্দোলন।১৯৪৭ সালে ধর্মীয় দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই করাচি আর লাহোরকেন্দ্রিক শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের ওপর সাংস্কৃতিক আর রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা শুরু করে। ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করার পর এই দমনপীড়ন চরম রূপ নেয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী রবীন্দ্রনাথকে ভারতীয় আর হিন্দু সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে। তাদের দাবি ছিল—মুসলিমপ্রধান পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীত বা রবীন্দ্রচর্চা করা পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় চেতনার পরিপন্থী।১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের শততম জন্মজয়ন্তী এগিয়ে আসতেই সরকার গণমাধ্যম, রেডিও আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে রবীন্দ্রচর্চার ওপর কঠোর নজরদারি শুরু করে। সরকারি আর আধা-সরকারি কর্মচারীদের রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটিতে যোগ না দেওয়ার জন্য লিখিত-অলিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়। আইএসআই আর পুলিশ প্রশাসন রবীন্দ্রপ্রেমী ও প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের ওপর নজরদারি বাড়িয়ে দেয়, যাতে কেউ প্রকাশ্যে শতবার্ষিকী পালন করতে না পারে। ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করার চেষ্টা চলে।কিন্তু সরকারি নিষেধাজ্ঞা আর দমনপীড়নের মুখেও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিশীল শিক্ষক, শিল্পী, সাহিত্যিক আর সাংস্কৃতিক কর্মীরা মাথা নোয়াতে রাজি হননি। তাঁরা বুঝেছিলেন—এটা শুধু রবীন্দ্রনাথকে স্মরণের লড়াই নয়, এটা বাঙালির নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য আর সংস্কৃতি রক্ষার আত্মপরিচয়ের লড়াই।১৯৬০ সালের শেষের দিকে বিচারপতি মাহবুব মুর্শেদকে সভাপতি করে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সমন্বয়ে ‘রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটি’ গঠন করা হয়। এই কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সন্‌জীদা খাতুন, ওয়াহিদুল হক আর ড. আনিসুজ্জামান—যাঁরা গান শেখানো, অনুষ্ঠান পরিকল্পনা আর ছাত্র-শিক্ষকদের সংগঠিত করার মূল কাজ করেন। ড. কাজী মোতাহার হোসেন আর ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষাবিদ হিসেবে আন্দোলনের বুদ্ধিভিত্তিক দিক পরিচালনা করেন। প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী আর ছাত্রনেতারাও যুক্ত হয়ে এই আয়োজনকে এক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের রূপ দেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এই বাধার মুখে সবচেয়ে সাহসিকতার পরিচয় দেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ আর কার্জন হল এলাকা হয়ে ওঠে এই আয়োজনের অন্যতম কেন্দ্রস্থল।সব ভয়-ভীতি আর হুমকি উপেক্ষা করে ১৯৬১ সালের মে মাসে, ২৫শে বৈশাখ ১৩৬৮ বঙ্গাব্দে, সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপিত হয়। বিশেষ করে ঢাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের পাশে অবস্থিত ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে সপ্তাহব্যাপী মূল উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি বাধা সত্ত্বেও হলরুম কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় হাজার হাজার উৎসুক বাঙালির উপস্থিতিতে।সন্‌জীদা খাতুন, কলিম শরাফী, ওয়াহিদুল হক, ফাহমিদা খাতুন প্রমুখের কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত আর রবীন্দ্রনাটকের মঞ্চায়ন উপস্থিত জনতাকে উদ্বেলিত করে তোলে। পরিবেশিত গানের প্রতিটি লাইন যেন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এক একটি প্রতিবাদী শ্লোগান হয়ে ওঠে। কেবল ঢাকায় সীমাবদ্ধ না থেকে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, যশোর আর ময়মনসিংহেও স্থানীয় প্রগতিশীল সংগঠন আর তরুণরা গোপনে-প্রকাশে আলোচনা সভা আর গান-বাজনার আয়োজন করে।এই জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের পরপরই উপলব্ধি হয় যে, সরকারের তোয়াক্কা না করে বাঙালি সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে একটি স্থায়ী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন। এর ফলশ্রুতিতেই ১৯৬১ সালেই জন্ম নেয় বিখ্যাত সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’। ছায়ানট পরবর্তীতে পয়লা বৈশাখ পালন আর সংগীত বিদ্যায়তনের মাধ্যমে রবীন্দ্র ও বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ ঘটায়।১৯৬১-এর সফলতার ধারাবাহিকতাতেই ১৯৬৭ সালে যখন তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন রেডিও ও টিভিতে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন, তখন পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনতা আর শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীরা রাজপথে তীব্র প্রতিবাদ জানান। সরকারের সেই নিষেধাজ্ঞা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায়।১৯৬১ সালে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ হিসেবে যা শুরু হয়েছিল, তা দ্রুত রাজনৈতিক রূপ লাভ করে। রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর মাধ্যমেই বাঙালি বুঝতে পারে—ধর্মের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও ভাষা আর সাহিত্যের প্রশ্নে সকল বাঙালি এক। এই আত্মপরিচয়ের বোধই পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান আর ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণা জুগিয়েছিল।১৯৬১ সালের রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী কেবল কবিপ্রণাম ছিল না। এটা ছিল আইয়ুব খানের সামরিক স্বৈরাচারের মুখে বাঙালির এক অদম্য চ্যালেঞ্জ। বন্দুক আর সামরিক পরোয়ানা দিয়ে একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি আর চেতনাকে দমন করা যায় না—১৯৬১ সালের মে মাসে বাঙালি জাতি তা প্রমাণ করে দিয়েছিল। সেই সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের মশাল ধরেই পরবর্তীতে জন্ম নেয় স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।

বিস্তারিত পড়ুন

বাংলাদেশে সামরিক শাসনের সূচনা (১৯৭৫)

বাংলাদেশে সামরিক শাসনের সূচনা (১৯৭৫): ১৯৭৫ সাল স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটময় আর কলঙ্কজনক বছর। ১৯৭১-এর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে গণতান্ত্রিক আর সাংবিধানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই বছরের রক্তাক্ত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে তা থমকে যায়। ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ড আর তার পরের কয়েকটি নাটকীয় সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে দীর্ঘ সামরিক শাসনের পথ খুলে যায়।সামরিক বাহিনী সরাসরি রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার পেছনে কয়েকটি গভীর কারণ কাজ করেছিল। ১৯৭১-এর যুদ্ধের পর দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়া অবস্থায় ছিল। তার ওপর ১৯৭৪ সালের চুয়াত্তরের মন্বন্তর, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর সামাজিক অসন্তোষ আওয়ামী লীগ সরকারের ভাবমূর্তিকে চরম সংকটে ফেলে দেয়। আইনশৃঙ্খলার অবনতি, জাসদসহ বিভিন্ন চরমপন্থী বাম দলের সহিংসতা সামাল দিতে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা—বাকশাল চালু করা হয়। এর ফলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বিলুপ্ত হয়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। এতে রাজনৈতিক অসন্তোষ আরও বেড়ে যায়।সেনাবাহিনীর ভেতরেও অসন্তোষ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠন, পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা অফিসারদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, পদোন্নতি আর সুযোগ-সুবিধার অভাব—এসব নিয়ে কিছু কর্মকর্তার মনে তীব্র ক্ষোভ জন্মায়।এই পটভূমিতেই ১৫ আগস্ট ভোরে ঘটে যায় সেই ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। একদল বিপথগামী জুনিয়র সেনাসদস্য—মেজর ফারুক রহমান, মেজর রশিদ, মেজর শরিফুল হক ডালিমসহ কয়েকজন—ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে বর্বরোচিত হামলা চালায়। সেই আক্রমণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তিন পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল আর শিশু শেখ রাসেলসহ পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগ সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহকে সরিয়ে আগস্টের শেষভাগে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে নতুন সেনাপ্রধান নিয়োগ দেওয়া হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে মোশতাকের সরকার বেসামরিক হলেও পর্দার আড়ালে ক্ষমতার আসল নিয়ন্ত্রণ ছিল ১৫ আগস্টের খুনি মেজরদের হাতে। দেশে সামরিক আইন জারি করা হয়, জাতীয় সংসদ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ২৬ সেপ্টেম্বর মোশতাক সরকার ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে, যার মাধ্যমে ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের বিচারের আওতা থেকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়।মোশতাক সরকারের অধীনে সেনা শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটে। বঙ্গভবন থেকে খুনি মেজরদের আদেশে সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে ৩ নভেম্বর এক পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে। ১৯৭১ সালের ঢাকা ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার বীর উত্তম ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ আর ৪ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্টের শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে এই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। উদ্দেশ্য ছিল সেনা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা আর খুনি মেজরদের বঙ্গভবন থেকে উৎখাত করা।কিন্তু খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গভবনে থাকা খুনি মেজরদের নির্দেশে ৩ নভেম্বর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি চারজন জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হয়—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী আর এ এইচ এম কামারুজ্জামান। এই জেলহত্যা বাংলাদেশের ইতিহাসের আরও এক কলঙ্কজনক অধ্যায়।অভ্যুত্থানের পর জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। খুনি মেজররা থাইল্যান্ডে পালিয়ে যায়। ৬ নভেম্বর বিচারপতি এ এস এম সায়েমকে নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেওয়া হয়। ৭ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেন।কিন্তু খালেদ মোশাররফের ক্ষমতা মাত্র কয়েক দিনের জন্য স্থায়ী হয়। ৩ নভেম্বরের ঘটনাকে সাধারণ সৈনিকদের কাছে ভারতীয় প্রভাব বা ষড়যন্ত্র হিসেবে চিত্রিত করা হয়। জাসদের গোপন সামরিক সংগঠন ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’—যার নেপথ্যে ছিলেন কর্নেল আবু তাহের—ব্যারাকে জিয়াউর রহমানের পক্ষে আর খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে প্রচারপত্র ছড়ায়।৬ নভেম্বর মধ্যরাতে, অর্থাৎ ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে, সিপাহীরা ঢাকা সেনানিবাসে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই বিদ্রোহে খালেদ মোশাররফ, খন্দকার নাজমুল হুদা আর এ টি এম হায়দার শহীদ হন। সিপাহীরা গৃহবন্দিত্ব থেকে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে। বিচারপতি সায়েম রাষ্ট্রপতির পদ ধরে রাখলেও, প্রকৃত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার চাবিকাঠি চলে যায় জিয়ার হাতে। পরে তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (সিএমএলএ) হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।১৯৭৫ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এই কয়েক মাসের ঘটনাবলী বাংলাদেশের রাজনৈতিক আর সাংবিধানিক ইতিহাসের দিক পরিবর্তনকারী অধ্যায়। এই সংক্ষিপ্ত সময়ে সংঘটিত একাধিক হত্যাকাণ্ড আর অভ্যুত্থান এক সদ্য স্বাধীন দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তি ছিন্নভিন্ন করে দেয়। সামরিক শাসনের কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়, যা কাটিয়ে উঠে গণতন্ত্রে ফিরতে দেশকে বহু বছর সংগ্রাম করতে হয়েছিল।

বিস্তারিত পড়ুন

১৯৭৪ এর মন্বন্তর ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি

১৯৭৪ সালের মন্বন্তর: সামাজিক-অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু সেই স্বাধীনতা শুধু মানচিত্রে একটি নতুন দেশের জন্ম দেয়নি। যুদ্ধ শেষে দেশ ছিল ধ্বংসস্তূপের মতো। সেতু, বন্দর, রাস্তাঘাট, কৃষিজমি—সবকিছুই ছিন্নভিন্ন। মানুষ অনাহারে কাতর, অর্থনীতি ভেঙে পড়া। স্বাধীনতার মাত্র তিন বছর পর, ১৯৭৪ সালে সেই ক্ষত আরও গভীর হয়ে ওঠে। মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলা চুয়াত্তরের মন্বন্তর শুধু লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বরং সদ্য স্বাধীন দেশটির অর্থনীতি, সমাজ ও রাজনীতিকে একেবারে অন্য মোড়ে ঘুরিয়ে দিয়েছিল।এই দুর্ভিক্ষ কোনো একটা আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটা ছিল যুদ্ধের ক্ষত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আন্তর্জাতিক রাজনীতি আর অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতার এক বিষাক্ত মিশ্রণ।যুদ্ধের পর দেশের পরিবহন ব্যবস্থা, গুদাম, কৃষিজমি—সবই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। অর্থনীতি পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছিল। ঠিক তখনই ১৯৭৪ সালের এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকায় শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ বন্যা আসে। দেশের বিশাল অংশের আমন আর আউশ ধানের ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে যায়। কৃষিনির্ভর একটা দেশের জন্য এটা ছিল মরণকামড়ের মতো।দুর্ভিক্ষের সময় বৈদেশিক খাদ্য সাহায্য ছিল প্রাণরক্ষার শেষ অবলম্বন। কিন্তু শীতল যুদ্ধের রাজনীতি বাংলাদেশকে চরম সংকটে ফেলে দেয়। কিউবা তখন মার্কিন অবরোধের মুখে। বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য কিউবায় পাট আর পাটের ছালা রপ্তানি করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মার্কিন প্রশাসন, বিশেষ করে হেনরি কিসিঞ্জারের পররাষ্ট্র বিভাগ, পিএল-৪৮০-এর অধীনে বাংলাদেশে পাঠানো গম ও চালের জাহাজ মাঝপথে আটকে দেয়। শর্ত ছিল পরিষ্কার—কিউবার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন না করলে খাদ্য সাহায্য পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত কিউবায় পাট রপ্তানি বন্ধ করে, কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। যখন সাহায্য পৌঁছায়, ততক্ষণে হাজার হাজার মানুষ অনাহারে মারা গেছে।খাদ্য সংকটের সুযোগ নেয় একশ্রেণীর মজুদদার, ব্যবসায়ী আর প্রভাবশালী মহল। চালের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম আকাশচুম্বী করে তোলা হয়। অন্যদিকে, ভারতীয় রুপির তুলনায় বাংলাদেশি টাকার মান কমে যাওয়ায় সীমান্ত দিয়ে চাল, গমসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ব্যাপক চোরাচালান চলতে থাকে। রেশন ব্যবস্থা প্রায় ভেস্তে যায়। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ক্যাবিনেট বৈঠকে মজুদদারদের সিন্ডিকেট আর বাজার নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর বিখ্যাত গবেষণায় দেখিয়েছেন—১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে মোট খাদ্য উৎপাদন একেবারে শূন্যে নেমে আসেনি। সংকটটা ছিল অন্য জায়গায়। তিনি যাকে বলেছেন ‘এন্টাইটেলমেন্ট ফেইলিয়ার’—মানুষের খাদ্য কেনার ক্ষমতা হারিয়ে যাওয়া। বন্যায় গ্রামের ভূমিহীন কৃষক, দিনমজুররা কাজ হারায়। আয় বন্ধ হয়ে যায়। বাজারে চাল থাকলেও সাধারণ মানুষের তা কেনার সামর্থ্য ছিল না। বণ্টন ব্যবস্থার ধস আর বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এই সংকটকে আরও গভীর করে তোলে।মধ্য ১৯৭৪-এর দিকে গ্রামে গ্রামে মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়। কুড়িগ্রাম, রংপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ আর সিলেট সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা প্রায় ২৭ হাজার বলা হলেও আন্তর্জাতিক ও বেসরকারি গবেষণায় এই সংখ্যা এক লাখ থেকে কয়েক লাখ পর্যন্ত বলা হয়। গ্রামের ক্ষুধার্ত মানুষ একটু ফ্যান আর ভাতের আশায় দলে দলে ঢাকায় ছুটতে থাকে। সরকার শত শত লঙ্গরখানা খোলে, কিন্তু সেগুলো প্রয়োজনের তুলনায় একেবারে অপ্রতুল ছিল। ডাস্টবিনে মানুষের সঙ্গে কুকুরের খাবারের লড়াইয়ের দৃশ্য তখনকার সংবাদপত্রে উঠে আসে। অনাহারের পাশাপাশি ডায়রিয়া, কলেরা, গুটিবসন্তের মতো রোগ মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসা আর অপুষ্টির অভাবে মৃত্যুর মিছিল দিন দিন লম্বা হতে থাকে।এই দুর্ভিক্ষ শুধু মানবিক ট্র্যাজেডি ছিল না। এটা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারকে গভীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটের মুখে দাঁড় করায়। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নাগালের বাইরে চলে যায়। মূল্যস্ফীতি আর মুদ্রার অবমূল্যায়নে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। রপ্তানি আয় তলানিতে ঠেকে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় শূন্য হয়ে যায়।এই অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে বিরোধী দলগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে জাসদ আর তার সশস্ত্র শাখা গণবাহিনী, এবং অন্যান্য চরমপন্থী বাম দল সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে। ব্যাংক ডাকাতি, পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা, জনপ্রতিনিধিদের ওপর আক্রমণ, সরকারি কর্মকর্তা হত্যা—এসব ঘটনা বেড়েই চলে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকে।এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার আমূল পরিবর্তনের পথে হাঁটে। ২৮ ডিসেম্বর ১৯৭৪-এ সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। মৌলিক অধিকার স্থগিত হয়, সামরিক বাহিনীকে অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নামানো হয়।এরপর ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫-এ সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস হয়। সংসদীয় পদ্ধতি বাতিল করে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়। সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে “বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ” বা বাকশাল নামে একক জাতীয় দল গঠন করা হয়।জুন মাসে আরও এক ধাপ এগিয়ে চারটি সরকারি পত্রিকা—দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ অবজারভার, দৈনিক ইত্তেফাক আর বাংলাদেশ টাইমস ছাড়া বাকি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাকস্বাধীনতা আর গণমাধ্যমের ওপর সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।দুর্ভিক্ষের ফলে সৃষ্ট জনরোষ, অর্থনৈতিক মন্দা, বিরোধী দল দমন আর বাকশাল গঠনের ফলে দেশে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সরকারের মিত্র কমে আসে। এই অস্থিরতার সুযোগ নেয় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা একদল ষড়যন্ত্রকারী কর্মকর্তা। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর ভোরে তারা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে নৃশংস আক্রমণ চালিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করে।এর পর থেকে বাংলাদেশে দীর্ঘ সামরিক শাসন আর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার অন্ধকার অধ্যায় শুরু হয়। গণতান্ত্রিক ধারা ব্যাহত হয়। একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থান আর পাল্টা অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটতে থাকে।চুয়াত্তরের মন্বন্তর শুধু একটা খাদ্য সংকট ছিল না। এটা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান অনুঘটক। যুদ্ধের ক্ষত, আন্তর্জাতিক খাদ্য কূটনীতি, অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মিলিত আঘাত সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রটিকে চরম পরীক্ষা আর ট্র্যাজেডির দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

বিস্তারিত পড়ুন

১৯৭১ এর ১৪ই ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ও বধ্যভূমিসমূহ

১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ঐতিহাসিক পটভূমি :১. রাও ফরমান আলীর গোপন ডায়েরি ও নীলনকশাবুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের প্রধান মাস্টারমাইন্ড ছিলেন পাকিস্তানি মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। বিজয়ের পর গভর্নমেন্ট হাউজ (বর্তমান বঙ্গভবন) থেকে উদ্ধারকৃত তাঁর নিজস্ব ডায়রিতে বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীর নাম, ঠিকানা ও গাড়ি নম্বর পাওয়া যায়।তালিকা প্রণয়ন: আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর সাহায্যে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন সহযোগী সংগঠনগুলোর সহযোগিতায় নিখুঁত তালিকা তৈরি করা হয়।ডায়েরির প্রমাণ: উদ্ধার করা ডায়েরির একাধিক পাতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জি সি দেব, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য, মুনীর চৌধুরীসহ বহু শিক্ষক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নাম স্বহস্তে লেখা ছিল।পরিকল্পনার উদ্দেশ্য: পাকিস্তানি জান্তা বুঝতে পেরেছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হতে যাচ্ছে। তাই বিজয়ের ঠিক ২ দিন আগে একটি পুরো জাতিকে স্থায়ীভাবে মেধাশূন্য করার উদ্দেশ্যে এই সুনির্দিষ্ট তালিকা ধরে অপারেশন চালানো হয়।২. প্রধান শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিচয় ও সংক্ষিপ্ত তালিকা১৪ই ডিসেম্বরে এবং এর ঠিক কিছুদিন পূর্বে বাসা থেকে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে হত্যা করা বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে প্রধান কজন:শিক্ষাবিদ ও গবেষক: ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব (জি সি দেব), মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, আনোয়ার পাশা, সিরাজুল হক খান, সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য।সাংবাদিক ও সাহিত্যিক: শহীদুল্লা কায়সার, সেলিনা পারভীন (একমাত্র নারী সাংবাদিক যিনি শহীদ হন), সিরাজুদ্দীন হোসেন, নিজামুদ্দীন আহমদ, খোন্দকার আবু তালেব।চিকিৎসক: ড. ফজলে রাব্বী, ড. আলিম চৌধুরী, ড. মোহাম্মদ মর্তুজা, ড. শামসুদ্দীন আহমেদ।প্রকৌশলী ও অন্যান্য: জহির রায়হান (চলচ্চিত্রকার ও সাহিত্যিক; বিজয়ের পর ৩০শে জানুয়ারি ১৯৭২ সালে নিখোঁজ ভাই শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে মিরপুরে শহীদ হন)।৩. রায়েরবাজার ও মিরপুর বধ্যভূমি এবং স্মৃতিসৌধপাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর আল-বদররা বুদ্ধিজীবীদের বাসা থেকে কাদামাখা কাদা-রঙা গাড়িতে করে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর মোহাম্মদপুর শারীরিক শিক্ষা কলেজে অবস্থিত টর্চার সেলে নির্যাতন করে।রায়েরবাজার বধ্যভূমি: মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডি সংলগ্ন রায়েরবাজার ইটখোলা ছিল প্রধান হত্যাকাণ্ড ও লাশ ফেলার জায়গা। ১৮ই ডিসেম্বর বিজয়ের পর এখানে হাত-পা বাঁধা, চোখ বাঁধা এবং বিকৃতাবস্থায় অসংখ্য বুদ্ধিজীবীর ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়।মিরপুর বধ্যভূমি: মিরপুরের শেওড়াপাড়া, কল্যাণপুর এবং কালশী এলাকার বিভিন্ন নিচু জলাশয় ও ইটের ভাটায় বহু বুদ্ধিজীবীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।স্মৃতিসৌধ নির্মাণ: শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি সম্মান ও তাঁদের অবদানের স্মরণে ১৯৯৯ সালে রায়েরবাজারে "শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ" এবং মিরপুরে "জাতীয় শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ" নির্মাণ করা হয়। প্রতি বছর ১৪ই ডিসেম্বর গোটা জাতি পরম শ্রদ্ধায় এই বীর সন্তানদের স্মরণ করে।

বিস্তারিত পড়ুন

১৯৭১ এর ক্র্যাক প্লাটুন ও ঢাকার অদম্য গেরিলা যুদ্ধ

১. মেলাঘর ক্যাম্প: প্রশিক্ষণ ও জীবনসংগ্রামের কঠিন বাস্তবতামুক্তিযুদ্ধের ২ নম্বর সেক্টরের সদর দপ্তর ছিল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মেলাঘর। ক্র্যাক প্লাটুনের বেশিরভাগ শহুরে তরুণ এই মেলাঘর ক্যাম্পেই গেরিলা যুদ্ধের কঠোর প্রশিক্ষণ নেন।কঠিন প্রাকৃতিক পরিবেশ: পাহাড়ি জঙ্গল ও কাদা-পানিতে ভরা মেলাঘরের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল। প্লাস্টিকের শিট টাঙিয়ে বানানো তাঁবুতে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আর মশার কামড়ের মধ্য দিয়েই প্রশিক্ষণার্থীরা দিন কাটাতেন। পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট ছিল প্রতিদিনের সঙ্গী।কঠোর ও দ্রুত প্রশিক্ষণ: সাধারণ গেরিলা ও কমান্ডোদের দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের সুযোগ না থাকায় সেখানে তরুণদের ৩ থেকে ৪ সপ্তাহের নিবিড় ও দ্রুতগতির প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। মেজর খালেদ মোশাররফ ও ক্যাপ্টেন এ.টি.এম হায়দারের অধীনে এখানে স্টেনগান, এসএলআর, রিভলভার চালনা এবং বিশেষ করে পিকে-২ (PK-2) ও সি-ফোর (C-4) প্লাস্টিক বিস্ফোরক ব্যবহারের মাধ্যমে 'ডিভোলুশন ও সাবোটেজ' (Devastation & Sabotage) অপারেশন পরিচালনা শেখানো হতো।মানসিক রূপান্তর: ঢাকা থেকে যাওয়া নটর ডেম কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের কোমল স্বভাবের ছাত্ররা অতি অল্প সময়ে শারীরিক ক্লান্তি ভুলে দক্ষ ও নির্মম গেরিলা যোদ্ধায় রূপান্তরিত হয়েছিলেন এই মেলাঘর ক্যাম্পেই।২. শহীদ আজাদের মা: ত্যাগের এক অমর ইতিহাসক্র্যাক প্লাটুনের অন্যতম শহীদ যোদ্ধা ছিলেন মাগফার আহমেদ চৌধুরী আজাদ। ২৯শে আগস্ট রাতে তাঁকে তাঁর ইস্কাটনের বাড়ি থেকে পাকিস্তানি সেনারা গ্রেপ্তার করে ঢাকা ফ্ল্যাগ স্টাফ হাউজের টর্চার সেলে নিয়ে যায়।ছেলের প্রতি মায়ের শেষ কথা: বন্দী অবস্থায় আজাদের মা তাঁকে দেখতে যান। নির্মম নির্যাতনে আজাদের শরীর তখন রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। খাবার না পেয়ে আজাদ মাকে বলেন, "মা, ওরা আমাকে খুব মারে। খুব খিদে পেয়েছে, ভাত খেতে ইচ্ছে করছে।" আজাদকে মা শক্ত থাকার সাহস দিয়ে বলেছিলেন, "বাবা, সহ্য করো, কারো নাম বলবে না।"আজীবন ভাত না খাওয়া ও মাটিতে ঘুমানো: আজাদের আর কোনোদিন ফিরে আসা হয়নি—আগস্টের শেষেই তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। কিন্তু ছেলের সেই একমুঠো ভাতের আকুতি তাঁর মায়ের হৃদয়কে চিরতরে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। আজাদের মা প্রতিজ্ঞা করেন—যেদিন পর্যন্ত তাঁর ছেলে ফিরে না আসবে, তিনি আর কোনোদিন থালায় করে ভাত খাবেন না। তিনি আজীবন কেবল হাত থেকে ভাত খেতেন এবং ছেলে ঠাণ্ডা মেঝেতে শুয়ে কষ্ট পেয়েছে মনে করে জীবনে আর কখনো বিছানায় শুেননি—মাটিতেই ঘুমাতেন। আজাদের মা ১৯৯০ সালে মারা যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ ১৪ বছর এইভাবেই জীবনযাপন করেছিলেন।৩. সেপ্টেম্বরের ক্র্যাকডাউন-পরবর্তী ঢাকার গেরিলা যুদ্ধ২৯ ও ৩০শে আগস্ট রুমী, আজাদ, বদি, জুয়েলসহ প্রধান যোদ্ধারা গ্রেপ্তার হলেও ক্র্যাক প্লাটুনের ঢাকার অপারেশন স্তব্ধ হয়ে যায়নি।পুনর্গঠন ও নতুন নেতৃত্ব: আগস্টের শেষ সপ্তাহে মূল ধাক্কা খাওয়ার পর সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ অতি দ্রুত অবশিষ্ট ও নতুন প্রশিক্ষিত গেরিলাদের ঢাকায় পাঠান। এই দফায় ঢাকা শহরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব নেন শাহাদাত চৌধুরী এবং তাঁদের সাথে যুক্ত হন তরুণ গেরিলা যোদ্ধা চিত্রশিল্পী বীর প্রতীক কাজী শাহরিয়ার ইকবাল, রাইসুল ইসলাম আসাদ (পরবর্তীতে খ্যাতনামা অভিনেতা), ফতেহ আলী চৌধুরী প্রমুখ।অপারেশনের কৌশল পরিবর্তন: দ্বিতীয় পর্যায়ে সরাসরি খোলা জায়গায় বড় আক্রমণের চেয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা অচল করে দেওয়া এবং পেট্রোল পাম্প ও পাকিস্তানি অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলোতে বিস্ফোরণ ঘটানোর কৌশল নেওয়া হয়।চূড়ান্ত বিজয়ের পথ প্রস্তুত: সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত পুনরায় ঢাকাজুড়ে সিরিজ মাইন ও বোমা হামলা চালানো হয়। সিদ্ধিরগঞ্জ ও ডেমরার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ কেন্দ্র উড়িয়ে দেওয়া হয়। বিজয়ের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে অর্থাৎ ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলারা ঢাকায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যে, অবরুদ্ধ ঢাকা শহরের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ পাকিস্তানি বাহিনীর হাতছাড়া হয়ে যায় এবং যৌথবাহিনীর ঢাকায় প্রবেশের পথ সুগম হয়।

বিস্তারিত পড়ুন

১৯৭১ এর ১লা মার্চ থেকে সাধারণ ধর্মঘট ও অসহযোগ আন্দোলন

মার্চ আন্দোলনের ৩৫টি কঠোর নির্দেশিকা (১৫ই মার্চ, ১৯৭১)অসহযোগ আন্দোলন শুধু রাস্তায় বিক্ষোভের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি ধীরে ধীরে এক ধরনের বিকল্প প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর আন্দোলনকে আরও সুসংগঠিত করার জন্য ১৫ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৩৫টি প্রশাসনিক নির্দেশিকা জারি করেন। এর ফলে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর থেকেই পুরো পূর্ব পাকিস্তানের বিচার ব্যবস্থা, ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যানবাহন ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হতে থাকে।প্রধান নির্দেশিকাগুলোর মধ্যে ছিল—পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় সরকারের কোষাগারে কোনো ধরনের ট্যাক্স, খাজনা, শুল্ক বা রাজস্ব প্রদান সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।ব্যাংকিং কার্যক্রম সীমিত সময়ের জন্য চালু রাখা হয়, যাতে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় টাকা তুলতে পারে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির না হয়ে পড়ে। তবে করাচি বা পশ্চিম পাকিস্তানে কোনো অর্থ পাঠানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়।হাইকোর্ট ও নিম্ন আদালতের বিচারকসহ সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অফিসে না গিয়ে আন্দোলনকে সফল করার নির্দেশ দেওয়া হয়।বিদ্যুৎ, গ্যাস, ওয়াসা, হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স, অগ্নিনির্বাপক বাহিনী এবং খাদ্য সরবরাহের যানবাহনগুলোকে আন্দোলনের আওতার বাইরে রেখে স্বাভাবিকভাবে চালু রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।ডাক, টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন শুধু দেশের ভেতরে যোগাযোগের জন্য খোলা রাখা হয়। রেডিও ও টেলিভিশনকে সর্বাত্মক আন্দোলন এবং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশাবলি প্রচার করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়। না মানলে কর্মচারীদের কাজ বয়কট করার কথাও বলা হয়।২. ১৬-২৪শে মার্চ: ঢাকা আলোচনা ও ইয়াহিয়ার সামরিক চক্রান্ত১৫ই মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান আলোচনার অজুহাতে ঢাকায় আসেন। পরদিন ১৬ই মার্চ থেকে প্রেসিডেন্ট ভবনে (বর্তমান সুগন্ধা) বঙ্গবন্ধু ও ইয়াহিয়ার মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। পরে এই আলোচনায় পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোও যোগ দেন।বাঙালির অবস্থান ছিল পরিষ্কার। বঙ্গবন্ধু চারটি শর্তে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে রাজি ছিলেন— ১. সামরিক শাসন অবিলম্বে প্রত্যাহার, ২. সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া, ৩. গণহত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ৪. নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর।কিন্তু ইয়াহিয়া ও তাঁর সামরিক জান্তা আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ভান করে শুধু সময় ক্ষেপণ করছিলেন। তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে জাহাজ ও উড়োজাহাজে করে সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র এনে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শক্তি বাড়ানো।এরই মধ্যে ১৯শে মার্চ জয়দেবপুরে (গাজীপুর) দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্যরা অস্ত্র সমর্পণে অস্বীকৃতি জানিয়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ২৪শে মার্চ আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে বলে প্রচার করা হয়। পরদিন ২৫শে মার্চ দুপুরে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন এবং চূড়ান্ত গণহত্যার নীলনকশা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়ে যান।৩. ২৩শে মার্চ: ‘বাংলাদেশ প্রতিরোধ দিবস’ ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন২৩শে মার্চ ছিল তৎকালীন পাকিস্তানের ‘পাকিস্তান দিবস’। কিন্তু ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও সর্বদলীয় আন্দোলনকারীরা এ দিনটিকে ‘বাংলাদেশ প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন।সেদিন সকাল থেকে সারা পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি-বেসরকারি ভবন, কূটনৈতিক মিশন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের বাড়িতে পাকিস্তানের পতাকার পরিবর্তে সোনালি মানচিত্রখচিত স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন পতাকা উত্তোলন করা হয়।পল্টন ময়দানে ‘জয় বাংলা বাহিনী’র প্যারেড শেষে ছাত্রনেতারা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে যান। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু নিজ হাতে তাঁর বাসভবনে বাংলাদেশের স্বাধীন পতাকা উত্তোলন করেন।ঢাকার একমাত্র সেনানিবাস ও গভর্নর হাউস ছাড়া পুরো শহরের কোথাও পাকিস্তানের পতাকা উড়েনি। এটি ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রতি চরম অবাধ্যতা এবং স্বাধীনতার পক্ষে বাঙালির সুস্পষ্ট ঘোষণা।

বিস্তারিত পড়ুন

১৯৪৮ এর প্রথম ভাষা আন্দোলন ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ

১৫ই মার্চ ১৯৪৮: মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ও সংগ্রাম পরিষদের ৮ দফা চুক্তি১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকে দেশব্যাপী সফল ভাষা ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘট চলাকালে শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, শামসুল হকসহ বহু ছাত্রনেতা গ্রেপ্তার হন। আন্দোলনের তীব্রতা এবং শিক্ষার্থীদের টানা বিক্ষোভের মুখে তৎকালীন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন বাধ্য হয়ে সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সাথে আলোচনায় বসেন।পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ১৯শে মার্চ ঢাকা সফরের আগেই পরিস্থিতি শান্ত করার লক্ষ্যে ১৫ই মার্চ খাজা নাজিমুদ্দিন এবং রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধি কামরুদ্দীন আহমদের মধ্যে ৮ দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।৮ দফা চুক্তির মূল শর্তাবলি:১. গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি: ভাষা আন্দোলনের দায়ে ১৯৪৮ সালের ২৯শে ফেব্রুয়ারি থেকে গ্রেপ্তারকৃত সব বন্দিকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। ২. পুলিশি নির্যাতনের তদন্ত: আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ ও অন্যায় আচরণের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। ৩. সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলা: ১৯৪৮ সালের এপ্রিল মাসে পূর্ব বাংলা সরকারের আইন পরিষদে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার এবং এটিকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব উত্থাপন করতে হবে। ৪. সংবাদপত্রের স্বাধীনতা: ভাষা আন্দোলনের খবর প্রকাশের ওপর জারি করা সংবাদপত্রের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। ৫. আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া: আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-যুবক বা সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। ৬. ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার: আন্দোলনে জারি করা সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা বা ১৪৪ ধারা তুলে নিতে হবে। ৭. রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা: সরকারি চাকুরিতে নিয়োগ এবং সরকারি কাজে ইংরেজি উঠে গেলে সেখানে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ৮. আন্দোলনকারীদের দেশপ্রেম স্বীকৃতি: সংগ্রাম পরিষদ যে উদ্দেশ্যে আন্দোলন চালিয়েছে তা দেশপ্রেমের দ্বারা অনুপ্রাণিত—সরকারকে এই মর্মে একটি বিবৃতি দিতে হবে।পরবর্তী পরিণতি: খাজা নাজিমুদ্দিন চুক্তি সই করলেও তা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন। জিন্নাহর ঢাকা সফরের পরই তিনি আবার উর্দুর পক্ষে অবস্থান নেন।১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা ও কারাবরণ১৯৪৮ সালের সূচনালগ্নে ভাষা আন্দোলনকে রাজপথে গণআন্দোলনে রূপ দিতে তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান (পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু) অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।সংগ্রাম পরিষদ গঠনে অংশগ্রহণ: ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে তমদ্দুন মজলিশের উদ্যোগে গঠিত প্রথম 'রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' এবং পরবর্তীকালে ১৯৪৮ সালের ২রা মার্চ ফজলুল হক হলে গঠিত 'সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' তৈরিতে তিনি সরাসরি ভূমিকা রাখেন।জনমত সৃষ্টি ও লিফলেট প্রচার: ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঘুরে ছাত্রদের একত্রিত করেন এবং উর্দুর প্রভাবে বাংলার অবমূল্যায়নের বিরুদ্ধে লিফলেট বিতরণে অংশ নেন।১১ই মার্চের ধর্মঘটে নেতৃত্ব ও কারাবরণ: ১১ই মার্চের সাধারণ ধর্মঘটের দিন সকালে শেখ মুজিবুর রহমান সচিবালয়ের ২ নম্বর গেটের সামনে পিকেটিং করছিলেন। এসময় পুলিশ এসে পিকেটিংকারীদের ওপর চড়াও হয়। শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, কাজী গোলাম মাহবুব, শামসুল হকসহ বহু নেতাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে।মুক্তির পর প্রতিক্রিয়া: বন্দি নেতাদের মুক্তির দাবিতে ১২ থেকে ১৫ই মার্চ টানা ছাত্র ধর্মঘট চলে। তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৫ই মার্চ সন্ধ্যায় অন্যান্য নেতাদের সাথে তিনি কারামুক্ত হন। জেল থেকে বেরিয়েই ১৬ই মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় অনুষ্ঠিত ছাত্রসভায় তিনি সভাপতিত্ব করেন। এই সভায় খাজা নাজিমুদ্দিনের চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা হয় এবং আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। ১৯৫২ সালের চূড়ান্ত 'সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' পুনর্গঠন১৯৪৮ সালের জিন্নাহর ঘোষণার পর কয়েক বছর আন্দোলন কিছুটা ঝিমিয়ে পড়লেও ১৯৫২ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ২৭শে জানুয়ারি পল্টন ময়দানে পুনরায় ঘোষণা দেন—"উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা"। এই ঘোষণার পর আন্দোলন দাবানলের মতো জ্বলে ওঠে।আন্দোলনকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে ১৯৫২ সালের ৩১শে জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার লাইব্রেরি হলে কাজী গোলাম মাহবুবের সভাপতিত্বে এক সর্বদলীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় আগের কমিটিকে পুনর্গঠন করে 'সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' গঠন করা হয়।নতুন পরিষদের রূপরেখা ও কার্যপদ্ধতি:আহ্বায়ক: কাজী গোলাম মাহবুব।গুরুত্বপূর্ণ সদস্যবৃন্দ: আতাউর রহমান খান, আবুল হাশিম, কামরুদ্দীন আহমদ, অলি আহাদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, মওলানা ভাসানী, খন্দকার মুশতাক আহমেদ, শামসুল হক, গাজীউল হকসহ তৎকালীন প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিগণ।রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য: যুবলীগ, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং খেলাফতে রব্বানী পার্টি এক ছাতার নিচে এসে কেন্দ্রীয় কমিটিতে যোগ দেয়।২১শে ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি: এই পুনর্গঠিত সর্বদলীয় পরিষদই ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সারা দেশে সার্বাত্মক হরতাল, জনসভা ও বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেয়। পরবর্তীতে ২১শে ফেব্রুয়ারি সরকারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণে এই পরিষদের বিভিন্ন নেতার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য ও ঐতিহাসিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যা অবশেষে ভাষা শহীদদের রক্তে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শক্ত রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করে।

বিস্তারিত পড়ুন

আধুনিক বাংলাদেশ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক রূপান্তর

আধুনিক বাংলাদেশ: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক রূপান্তরের ইতিহাস১৯৭১ সালে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশকে অনেকেই ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু গত পাঁচ দশকে এই যুদ্ধবিধ্বস্ত, দুর্যোগকবলিত ও দারিদ্র্যপীড়িত দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির একটি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আজকের বাংলাদেশ একটি প্রযুক্তিনির্ভর, নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ—যার যাত্রা আসলে এক অসাধারণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের গল্প।১. অর্থনৈতিক রূপান্তরের ধারাবাহিক ইতিহাসস্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পথচলাকে কয়েকটি স্পষ্ট ধাপে ভাগ করা যায়।ক. পুনর্গঠন ও রাষ্ট্রায়ত্ত অর্থনীতি (১৯৭২–১৯৭৫) স্বাধীনতার পরপরই দেশের অবস্থা ছিল শোচনীয়—কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কোনো রিজার্ভ ছিল না, যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংসপ্রাপ্ত, কৃষিখাতও ভেঙে পড়েছিল। তখন ব্যাংক, বীমা, পাটকল ও বস্ত্রশিল্পসহ বড় বড় প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হয়। কিন্তু মূলধনের অভাব, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার ঘাটতি আর খাদ্যসংকটের কারণে অর্থনীতির গতি তেমন বাড়েনি।খ. বেসরকারীকরণ ও পোশাক শিল্পের সূচনা (১৯৭৬–১৯৯০) সত্তরের দশকের শেষ দিক থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত খাত থেকে সরে এসে ধীরে ধীরে বেসরকারীকরণ নীতি নেওয়া হয়। আশির দশকে তৈরি পোশাক শিল্পের উত্থান ঘটে, যা আজও দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান স্তম্ভ। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসী শ্রমিকদের গমন শুরু হয়, যার ফলে রেমিট্যান্সের একটি নতুন প্রবাহ তৈরি হয়।গ. অর্থনৈতিক সংস্কার ও প্রবৃদ্ধির গতি বৃদ্ধি (১৯৯১–২০১০) নব্বইয়ের দশকে ভ্যাট চালু, শুল্ক কাঠামো সহজীকরণ এবং বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের প্রসার ঘটে। কৃষিতে উন্নত বীজ, সেচ ও সারের সহজলভ্যতার কারণে চাল ও অন্যান্য খাদ্যশস্য উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি চলে আসে।ঘ. টেকসই প্রবৃদ্ধি ও ‘মেগা প্রকল্প’ যুগ (২০১১–২০২৫) গত দেড় দশকে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি গড়ে ৬ থেকে ৭ শতাংশের উপরে অবস্থান করেছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পায়রা ও মহেশখালী গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো মেগা প্রকল্পগুলো দেশের অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। একইসঙ্গে বিকাশ, নগদসহ মোবাইল আর্থিক সেবা, ই-কমার্স ও ফ্রিল্যান্সিং খাতের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।২. সামাজিক রূপান্তর ও মানব উন্নয়নঅর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি বাংলাদেশের সামাজিক সূচকগুলোও বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে।চরম দারিদ্র্য হ্রাস: ১৯৭২ সালে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ৮০ শতাংশের বেশি, এখন তা ২০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্ত হয়েছে।নারীর ক্ষমতায়ন: তৈরি পোশাক খাতে লাখ লাখ নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ এবং গ্রামীণ ব্যাংক ও ব্র্যাকের ক্ষুদ্রঋণ মডেল গ্রামীণ নারীদের আত্মনির্ভরশীল হতে সাহায্য করেছে।জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন: শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার নাটকীয়ভাবে কমেছে। টিকাদান কর্মসূচি এবং আইসিডিডিআর,বি’র আবিষ্কৃত স্যালাইন জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিয়েছে। গড় আয়ু ১৯৭১ সালের প্রায় ৪৭ বছর থেকে বেড়ে এখন ৭৩ বছরেরও বেশি।শিক্ষা ও সচেতনতা: প্রাথমিক শিক্ষায় শতভাগ ভর্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে দেশ। ছেলে-মেয়ের শিক্ষার হারে সমতা এসেছে। বাল্যবিবাহ রোধ ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।৩. আধুনিক বাংলাদেশের মূল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতৈরি পোশাক (RMG): মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০-৮৫ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত।প্রবাসী আয় (Remittance): গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।কৃষি ও প্রাণিসম্পদ: সীমিত জমি থাকা সত্ত্বেও খাদ্যশস্য, মাছ ও সবজি উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি।আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং: সফটওয়্যার রপ্তানি ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে যুবসমাজের বিশাল অংশ আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানে যুক্ত হচ্ছে।৪. উদীয়মান চ্যালেঞ্জসমূহঅর্জনের পাশাপাশি বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে:এলডিসি উত্তরণ: জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখা কঠিন হবে।আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা: খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, মূল্যস্ফীতি কমানো এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা জরুরি।জলবায়ু ঝুঁকি: বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে।কর্মসংস্থান ও শিক্ষা: উচ্চশিক্ষিত তরুণদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক শিল্পের উপযোগী করে গড়ে তোলা প্রয়োজন।সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপজিডিপি: ১৯৭১ সালে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে এখন ৪৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।গড় আয়ু: স্বাধীনতার সময় প্রায় ৪৭ বছর থেকে বেড়ে এখন ৭৩ বছরেরও বেশি।দারিদ্র্যের হার: ৮০ শতাংশের উপরে থেকে নেমে এসেছে ২০ শতাংশের নিচে।একসময় যুদ্ধবিধ্বস্ত ও আন্তর্জাতিক সাহায্যনির্ভর এই দেশটি আজ উদীয়মান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক হাব এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাংলাদেশের এই পঞ্চাশ বছরের যাত্রা প্রমাণ করে—সঠিক নীতি, স্থিতিস্থাপক জনগোষ্ঠী এবং সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে যেকোনো সংকট কাটিয়ে একটি দেশ আধুনিক ও স্বাবলম্বী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।

বিস্তারিত পড়ুন

শহীদ নূর হোসেন

শহীদ নূর হোসেন: স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের জীবন্ত প্রতীক১৯৮৭ সালের ১০ই নভেম্বর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় দিন। এ দিন তৎকালীন সামরিক শাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত এক মিছিলে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন নূর হোসেন। বুকে ও পিঠে স্লোগান লিখে রাজপথে নেমে আসা এই অকুতোভয় যুবকের আত্মত্যাগ পরবর্তীকালে বাংলাদেশের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে এক চূড়ান্ত গতি এনে দেয় এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথ সুগম করে।১. প্রাথমিক জীবন ও পারিবারিক পরিচয়নূর হোসেনের পৈতৃক নিবাস পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার ঝাটিবুনিয়া গ্রামে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর তাঁর পরিবার পিরোজপুর থেকে ঢাকায় চলে আসে এবং পুরান ঢাকার ৭৯/১ বনগ্রাম রোডে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।জন্ম: ১৯৬১ সাল, ঢাকা।পিতা: মুজিবুর রহমান (পেশায় ড্রাইভার)।মাতা: মরিয়ম বিবি।পারিবারিক সদস্য: চার ভাই (আলী হোসেন, দেলোয়ার হোসেন, আনোয়ার হোসেন ও নূর হোসেন) এবং এক বোন (শাহানা বেগম)।রাজনৈতিক পরিচয়: তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুব সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ-এর সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।২. স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন ও ১০ই নভেম্বরের ঘটনা১৯৮২ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালের প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করলে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহ—বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)—একযোগে আন্দোলনে নামে। তাঁদের মূল দাবি ছিল নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু জাতীয় সংসদ নির্বাচন।ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি ও নূর হোসেনের আত্মত্যাগএই দাবির ধারাবাহিকতায় ১৯৮৭ সালের ১০ই নভেম্বর বিরোধী দলগুলো 'ঢাকা অবরোধ' কর্মসূচির আহ্বান জানায়।অনন্য প্রতিবাদ: নূর হোসেন সাধারণ কোনো আন্দোলনকারীর মতো মিছিলে যাননি। তিনি নিজের খালি গায়ে সাদা রঙ দিয়ে প্রথাভাঙ্গা এক বার্তা ফুটিয়ে তোলেন—বুকে লেখা ছিল "স্বৈরাচার নিপাত যাক" এবং পিঠে লেখা ছিল "গণতন্ত্র মুক্তি পাক"।ঐতিহাসিক মুহূর্ত: মিছিলটি ঢাকার জিপিও (GPO) সংলগ্ন জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি পৌঁছালে পুলিশ বাহিনী অতর্কিতে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়।শহীদ ও আহত: পুলিশের গুলিতে ঘটনাস্থলেই নূর হোসেন শহীদ হন। তাঁর সাথে আরও দুই যুবলীগ নেতা—নুরুল হুদা বাবুল ও আমিনুল হুদা টিটু শহীদ হন এবং অসংখ্য আন্দোলনকারী আহত হন। মৃত্যুর মাত্র ১০-১৫ মিনিট আগে আলোকচিত্রী দিনু আলমের তোলা নূর হোসেনের সেই ছবি পরবর্তীতে বাংলাদেশের গণআন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়।৩. প্রতিক্রিয়া, আন্দোলন জোরদার ও এরশাদের পতননূর হোসেনের নির্মম হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের দাবানল জ্বালিয়ে দেয়:দেশব্যাপী বিক্ষোভ: হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ১১ ও ১২ই নভেম্বর সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা কঠোর হরতাল পালিত হয়।গণঅভ্যুত্থান (১৯৯০): নূর হোসেনের রক্তদান স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে এক নতুন মাত্রা দেয়। এই আন্দোলনের পথ ধরে পরবর্তীতে ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং দেশে পুনর্দখল হয় রাজনৈতিক গণতন্ত্র।গণতান্ত্রিক রূপান্তর: এরশাদের পতনের পর দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে নির্বাচিত হয়ে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।৪. রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া ও স্মৃতিকথানূর হোসেনের আত্মত্যাগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় নেতৃবৃন্দ ও তাঁর পরিবার থেকে স্মরণীয় বক্তব্য এসেছে:শেখ হাসিনার স্মৃতিকথা: ১০ই নভেম্বরের স্মৃতিচারণ করে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা বলেন—"আমরা যখন মিছিল শুরু করছিলাম তখন নূর হোসেন আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি তাকে কাছে ডেকে বললাম যে গায়ের এই লেখার কারণে পুলিশ তাকে লক্ষ্য করে গুলি করবে। সে তার মাথা আমার গাড়ির জানালার কাছে এনে বলল, 'আপা, আপনি আমাকে দোয়া করুন, আমি গণতন্ত্র রক্ষায় আমার জীবন দিতে প্রস্তুত।'নূর হোসেনের পিতার আক্ষেপ (২০০৪): প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নূর হোসেনের বাবা মুজিবুর রহমান বলেন—"নূর হোসেন যা চেয়েছিল, তা তো হলো। স্বৈরতন্ত্র নিপাত হলো। কিন্তু এখনো দেশে এত হানাহানি, সন্ত্রাস—গণতন্ত্র তো মুক্তি পেল না।"এরশাদের ক্ষমা প্রার্থনা: ১৯৯৬ সালে তৎকালীন জাতীয় পার্টির প্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ জাতীয় সংসদে আনুষ্ঠানিকভাবে নূর হোসেনের মৃত্যুর জন্য জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। পরবর্তীতে তাঁর দল ১০ই নভেম্বরকে ‘গণতন্ত্র দিবস’ হিসেবে পালন করতে শুরু করে।৫. স্মৃতিরক্ষা ও সম্মাননাগণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে নূর হোসেনের আত্মত্যাগকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে:১. নূর হোসেন চত্বর: যে জিরো পয়েন্টে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়েছিলেন, সরকারের পক্ষ থেকে সেই স্থানের আনুষ্ঠানিক নামকরণ করা হয় ‘শহীদ নূর হোসেন চত্বর’। ২. শহীদ নূর হোসেন দিবস: প্রতি বছর ১০ই নভেম্বর বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিকভাবে ‘শহীদ নূর হোসেন দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। ৩. স্মারক ডাকটিকিট: ১৯৯১ সালে তাঁর ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ দুই টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। ৪. ভাস্কর্য ও মুরাল: ঢাকার ফুলার রোডের মোড়ে নূর হোসেনের স্মরণে ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর একটি বিশালাকার স্মারক মুরাল রয়েছে।

বিস্তারিত পড়ুন
আরও তথ্য লোড হচ্ছে...

বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থান সম্পর্কে

বাংলাদেশের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও গৌরবময়। প্রাচীনকালের মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন যুগ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের সুলতানি ও মুঘল আমল, ব্রিটিশ শাসন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ — সবই এই দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এই পেজে আপনি বাংলাদেশের সকল জেলার প্রাচীন রাজপ্রাসাদ, জমিদার বাড়ি, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, দুর্গ, মসজিদ, মন্দির এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থানের তালিকা পাবেন। যুগ, বিভাগ বা জেলা অনুসারে ফিল্টার করে সহজেই প্রয়োজনীয় স্থান খুঁজে নিতে পারবেন।

তথ্যবক্স থেকে নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্য নিয়ে বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।