ইতিহাস ও ঐতিহ্য

১৯৭১ এর ক্র্যাক প্লাটুন ও ঢাকার অদম্য গেরিলা যুদ্ধ

১১০

বিস্তারিত বিবরণ

১. মেলাঘর ক্যাম্প: প্রশিক্ষণ ও জীবনসংগ্রামের কঠিন বাস্তবতা

মুক্তিযুদ্ধের ২ নম্বর সেক্টরের সদর দপ্তর ছিল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মেলাঘর। ক্র্যাক প্লাটুনের বেশিরভাগ শহুরে তরুণ এই মেলাঘর ক্যাম্পেই গেরিলা যুদ্ধের কঠোর প্রশিক্ষণ নেন।

  1. কঠিন প্রাকৃতিক পরিবেশ: পাহাড়ি জঙ্গল ও কাদা-পানিতে ভরা মেলাঘরের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল। প্লাস্টিকের শিট টাঙিয়ে বানানো তাঁবুতে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আর মশার কামড়ের মধ্য দিয়েই প্রশিক্ষণার্থীরা দিন কাটাতেন। পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট ছিল প্রতিদিনের সঙ্গী।
  2. কঠোর ও দ্রুত প্রশিক্ষণ: সাধারণ গেরিলা ও কমান্ডোদের দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের সুযোগ না থাকায় সেখানে তরুণদের ৩ থেকে ৪ সপ্তাহের নিবিড় ও দ্রুতগতির প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। মেজর খালেদ মোশাররফ ও ক্যাপ্টেন এ.টি.এম হায়দারের অধীনে এখানে স্টেনগান, এসএলআর, রিভলভার চালনা এবং বিশেষ করে পিকে-২ (PK-2) ও সি-ফোর (C-4) প্লাস্টিক বিস্ফোরক ব্যবহারের মাধ্যমে 'ডিভোলুশন ও সাবোটেজ' (Devastation & Sabotage) অপারেশন পরিচালনা শেখানো হতো।
  3. মানসিক রূপান্তর: ঢাকা থেকে যাওয়া নটর ডেম কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের কোমল স্বভাবের ছাত্ররা অতি অল্প সময়ে শারীরিক ক্লান্তি ভুলে দক্ষ ও নির্মম গেরিলা যোদ্ধায় রূপান্তরিত হয়েছিলেন এই মেলাঘর ক্যাম্পেই।

২. শহীদ আজাদের মা: ত্যাগের এক অমর ইতিহাস

ক্র্যাক প্লাটুনের অন্যতম শহীদ যোদ্ধা ছিলেন মাগফার আহমেদ চৌধুরী আজাদ। ২৯শে আগস্ট রাতে তাঁকে তাঁর ইস্কাটনের বাড়ি থেকে পাকিস্তানি সেনারা গ্রেপ্তার করে ঢাকা ফ্ল্যাগ স্টাফ হাউজের টর্চার সেলে নিয়ে যায়।

  1. ছেলের প্রতি মায়ের শেষ কথা: বন্দী অবস্থায় আজাদের মা তাঁকে দেখতে যান। নির্মম নির্যাতনে আজাদের শরীর তখন রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। খাবার না পেয়ে আজাদ মাকে বলেন, "মা, ওরা আমাকে খুব মারে। খুব খিদে পেয়েছে, ভাত খেতে ইচ্ছে করছে।" আজাদকে মা শক্ত থাকার সাহস দিয়ে বলেছিলেন, "বাবা, সহ্য করো, কারো নাম বলবে না।"
  2. আজীবন ভাত না খাওয়া ও মাটিতে ঘুমানো: আজাদের আর কোনোদিন ফিরে আসা হয়নি—আগস্টের শেষেই তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। কিন্তু ছেলের সেই একমুঠো ভাতের আকুতি তাঁর মায়ের হৃদয়কে চিরতরে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। আজাদের মা প্রতিজ্ঞা করেন—যেদিন পর্যন্ত তাঁর ছেলে ফিরে না আসবে, তিনি আর কোনোদিন থালায় করে ভাত খাবেন না। তিনি আজীবন কেবল হাত থেকে ভাত খেতেন এবং ছেলে ঠাণ্ডা মেঝেতে শুয়ে কষ্ট পেয়েছে মনে করে জীবনে আর কখনো বিছানায় শুেননি—মাটিতেই ঘুমাতেন। আজাদের মা ১৯৯০ সালে মারা যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ ১৪ বছর এইভাবেই জীবনযাপন করেছিলেন।

৩. সেপ্টেম্বরের ক্র্যাকডাউন-পরবর্তী ঢাকার গেরিলা যুদ্ধ

২৯ ও ৩০শে আগস্ট রুমী, আজাদ, বদি, জুয়েলসহ প্রধান যোদ্ধারা গ্রেপ্তার হলেও ক্র্যাক প্লাটুনের ঢাকার অপারেশন স্তব্ধ হয়ে যায়নি।

  1. পুনর্গঠন ও নতুন নেতৃত্ব: আগস্টের শেষ সপ্তাহে মূল ধাক্কা খাওয়ার পর সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ অতি দ্রুত অবশিষ্ট ও নতুন প্রশিক্ষিত গেরিলাদের ঢাকায় পাঠান। এই দফায় ঢাকা শহরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব নেন শাহাদাত চৌধুরী এবং তাঁদের সাথে যুক্ত হন তরুণ গেরিলা যোদ্ধা চিত্রশিল্পী বীর প্রতীক কাজী শাহরিয়ার ইকবাল, রাইসুল ইসলাম আসাদ (পরবর্তীতে খ্যাতনামা অভিনেতা), ফতেহ আলী চৌধুরী প্রমুখ।
  2. অপারেশনের কৌশল পরিবর্তন: দ্বিতীয় পর্যায়ে সরাসরি খোলা জায়গায় বড় আক্রমণের চেয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা অচল করে দেওয়া এবং পেট্রোল পাম্প ও পাকিস্তানি অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলোতে বিস্ফোরণ ঘটানোর কৌশল নেওয়া হয়।
  3. চূড়ান্ত বিজয়ের পথ প্রস্তুত: সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত পুনরায় ঢাকাজুড়ে সিরিজ মাইন ও বোমা হামলা চালানো হয়। সিদ্ধিরগঞ্জ ও ডেমরার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ কেন্দ্র উড়িয়ে দেওয়া হয়। বিজয়ের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে অর্থাৎ ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলারা ঢাকায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যে, অবরুদ্ধ ঢাকা শহরের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ পাকিস্তানি বাহিনীর হাতছাড়া হয়ে যায় এবং যৌথবাহিনীর ঢাকায় প্রবেশের পথ সুগম হয়।


ঐতিহাসিক স্থান তালিকায় ফিরে যান

১৯৭১ এর ক্র্যাক প্লাটুন ও ঢাকার অদম্য গেরিলা যুদ্ধ সম্পর্কে

১৯৭১ এর ক্র্যাক প্লাটুন ও ঢাকার অদম্য গেরিলা যুদ্ধ হলো বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক স্থান।

১. মেলাঘর ক্যাম্প: প্রশিক্ষণ ও জীবনসংগ্রামের কঠিন বাস্তবতা মুক্তিযুদ্ধের ২ নম্বর সেক্টরের সদর দপ্তর ছিল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মেলাঘর । ক্র্যাক প্লাটুনের বেশিরভাগ শহুরে তরুণ এই মেলাঘর ক্যাম্পেই গেরিলা যুদ্ধের কঠোর প্রশিক্ষণ নেন। কঠিন প্রাকৃতিক পরিবেশ: পাহাড়ি জঙ্গল ও...

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১৯৭১ এর ক্র্যাক প্লাটুন ও ঢাকার অদম্য গেরিলা যুদ্ধ কী?
১. মেলাঘর ক্যাম্প: প্রশিক্ষণ ও জীবনসংগ্রামের কঠিন বাস্তবতা মুক্তিযুদ্ধের ২ নম্বর সেক্টরের সদর দপ্তর ছিল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মেলাঘর । ক্র্যাক প্লাটুনের বেশিরভাগ শহুরে তরুণ এই মেলাঘর ক্যাম্পেই গেরিলা যুদ্ধের কঠোর প্রশিক্ষণ নেন। কঠিন...
অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থান কোথায় দেখব?
ঐতিহাসিক স্থান তালিকায় ফিরে গিয়ে অন্যান্য স্থান দেখতে পারবেন।
১৯৭১ এর ক্র্যাক প্লাটুন ও ঢাকার অদম্য গেরিলা যুদ্ধ | বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থান | তথ্যবক্স | Totthobox