বাংলাদেশে সামরিক শাসনের সূচনা (১৯৭৫)
বিস্তারিত বিবরণ
বাংলাদেশে সামরিক শাসনের সূচনা (১৯৭৫):
১৯৭৫ সাল স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটময় আর কলঙ্কজনক বছর। ১৯৭১-এর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে গণতান্ত্রিক আর সাংবিধানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই বছরের রক্তাক্ত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে তা থমকে যায়। ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ড আর তার পরের কয়েকটি নাটকীয় সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে দীর্ঘ সামরিক শাসনের পথ খুলে যায়।
সামরিক বাহিনী সরাসরি রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার পেছনে কয়েকটি গভীর কারণ কাজ করেছিল। ১৯৭১-এর যুদ্ধের পর দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়া অবস্থায় ছিল। তার ওপর ১৯৭৪ সালের চুয়াত্তরের মন্বন্তর, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর সামাজিক অসন্তোষ আওয়ামী লীগ সরকারের ভাবমূর্তিকে চরম সংকটে ফেলে দেয়। আইনশৃঙ্খলার অবনতি, জাসদসহ বিভিন্ন চরমপন্থী বাম দলের সহিংসতা সামাল দিতে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা—বাকশাল চালু করা হয়। এর ফলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বিলুপ্ত হয়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। এতে রাজনৈতিক অসন্তোষ আরও বেড়ে যায়।
সেনাবাহিনীর ভেতরেও অসন্তোষ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠন, পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা অফিসারদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, পদোন্নতি আর সুযোগ-সুবিধার অভাব—এসব নিয়ে কিছু কর্মকর্তার মনে তীব্র ক্ষোভ জন্মায়।
এই পটভূমিতেই ১৫ আগস্ট ভোরে ঘটে যায় সেই ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। একদল বিপথগামী জুনিয়র সেনাসদস্য—মেজর ফারুক রহমান, মেজর রশিদ, মেজর শরিফুল হক ডালিমসহ কয়েকজন—ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে বর্বরোচিত হামলা চালায়। সেই আক্রমণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তিন পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল আর শিশু শেখ রাসেলসহ পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগ সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহকে সরিয়ে আগস্টের শেষভাগে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে নতুন সেনাপ্রধান নিয়োগ দেওয়া হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে মোশতাকের সরকার বেসামরিক হলেও পর্দার আড়ালে ক্ষমতার আসল নিয়ন্ত্রণ ছিল ১৫ আগস্টের খুনি মেজরদের হাতে। দেশে সামরিক আইন জারি করা হয়, জাতীয় সংসদ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ২৬ সেপ্টেম্বর মোশতাক সরকার ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে, যার মাধ্যমে ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের বিচারের আওতা থেকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়।
মোশতাক সরকারের অধীনে সেনা শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটে। বঙ্গভবন থেকে খুনি মেজরদের আদেশে সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে ৩ নভেম্বর এক পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে। ১৯৭১ সালের ঢাকা ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার বীর উত্তম ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ আর ৪ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্টের শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে এই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। উদ্দেশ্য ছিল সেনা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা আর খুনি মেজরদের বঙ্গভবন থেকে উৎখাত করা।
কিন্তু খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গভবনে থাকা খুনি মেজরদের নির্দেশে ৩ নভেম্বর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি চারজন জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হয়—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী আর এ এইচ এম কামারুজ্জামান। এই জেলহত্যা বাংলাদেশের ইতিহাসের আরও এক কলঙ্কজনক অধ্যায়।
অভ্যুত্থানের পর জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। খুনি মেজররা থাইল্যান্ডে পালিয়ে যায়। ৬ নভেম্বর বিচারপতি এ এস এম সায়েমকে নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেওয়া হয়। ৭ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেন।
কিন্তু খালেদ মোশাররফের ক্ষমতা মাত্র কয়েক দিনের জন্য স্থায়ী হয়। ৩ নভেম্বরের ঘটনাকে সাধারণ সৈনিকদের কাছে ভারতীয় প্রভাব বা ষড়যন্ত্র হিসেবে চিত্রিত করা হয়। জাসদের গোপন সামরিক সংগঠন ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’—যার নেপথ্যে ছিলেন কর্নেল আবু তাহের—ব্যারাকে জিয়াউর রহমানের পক্ষে আর খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে প্রচারপত্র ছড়ায়।
৬ নভেম্বর মধ্যরাতে, অর্থাৎ ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে, সিপাহীরা ঢাকা সেনানিবাসে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই বিদ্রোহে খালেদ মোশাররফ, খন্দকার নাজমুল হুদা আর এ টি এম হায়দার শহীদ হন। সিপাহীরা গৃহবন্দিত্ব থেকে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে। বিচারপতি সায়েম রাষ্ট্রপতির পদ ধরে রাখলেও, প্রকৃত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার চাবিকাঠি চলে যায় জিয়ার হাতে। পরে তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (সিএমএলএ) হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১৯৭৫ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এই কয়েক মাসের ঘটনাবলী বাংলাদেশের রাজনৈতিক আর সাংবিধানিক ইতিহাসের দিক পরিবর্তনকারী অধ্যায়। এই সংক্ষিপ্ত সময়ে সংঘটিত একাধিক হত্যাকাণ্ড আর অভ্যুত্থান এক সদ্য স্বাধীন দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তি ছিন্নভিন্ন করে দেয়। সামরিক শাসনের কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়, যা কাটিয়ে উঠে গণতন্ত্রে ফিরতে দেশকে বহু বছর সংগ্রাম করতে হয়েছিল।
বাংলাদেশে সামরিক শাসনের সূচনা (১৯৭৫) সম্পর্কে
বাংলাদেশে সামরিক শাসনের সূচনা (১৯৭৫) হলো বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক স্থান।
বাংলাদেশে সামরিক শাসনের সূচনা (১৯৭৫): ১৯৭৫ সাল স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটময় আর কলঙ্কজনক বছর। ১৯৭১-এর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে গণতান্ত্রিক আর সাংবিধানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই বছরের রক্তাক্ত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে তা থমকে যায়। ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস...