ইতিহাস ও ঐতিহ্য

ডিজিটাইজেশন, মেগা প্রজেক্ট ও আধুনিক বাংলাদেশের যাত্রা

১০২

বিস্তারিত বিবরণ

ডিজিটাইজেশন, মেগা প্রজেক্ট ও আধুনিক বাংলাদেশের যাত্রা

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতি আর অর্থনীতিতে বাংলাদেশ আজ এক অনন্য উচ্চতায় দাঁড়িয়েছে। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের পর যে দেশকে একসময় ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে কটাক্ষ করা হয়েছিল, আজ সেই বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশ। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর মেগা প্রজেক্ট, সর্বাত্মক ডিজিটাইজেশন আর দ্রুত সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ওপর ভর করে এক আধুনিক, স্বনির্ভর ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলার যাত্রা শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালে জাতিসংঘের চূড়ান্ত স্বীকৃতির মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশে ডিজিটাইজেশনের যাত্রা শুধু প্রযুক্তি গ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটা হয়ে উঠেছে সর্বস্তরের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন আর অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির প্রধান হাতিয়ার। এর সবচেয়ে দৃশ্যমান আর ফলপ্রসূ প্রভাব পড়েছে দেশের আর্থিক খাতে। বিকাশ, রকেট, নগদের মতো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস আর আধুনিক ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার কল্যাণে প্রান্তিক কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ আজ ব্যাংকিং সেবার আওতায় এসেছেন। প্রবাসী আয় আর গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন এখন মুহূর্তের মধ্যেই গ্রামে পরিজনদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব গতি সঞ্চার হয়েছে।

সরকারি অফিসের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনেও ডিজিটাইজেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ই-নামজারি, ডিজিটাল ভূমি জরিপ, অনলাইন পাসপোর্ট আবেদন, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেওয়া আর বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল পরিশোধের মতো সেবাগুলো এখন নাগরিকরা ঘরে বসেই মোবাইল বা কম্পিউটারের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে পারছেন। দেশের হাজার হাজার ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার আর ‘মাই গভ’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগণ সহজেই নাগরিক সেবা পাচ্ছে।

ডিজিটাইজেশনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল এক তরুণ ফ্রিল্যান্সার ও উদ্যোক্তা গোষ্ঠী। তথ্যপ্রযুক্তি আর আইটি-এনাবল্ড সার্ভিস রপ্তানি করে দেশ প্রতি বছর বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। স্টার্টআপ সংস্কৃতির প্রসার, ই-কমার্স, রাইড শেয়ারিং আর ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলো শহরাঞ্চলে লাখ লাখ তরুণের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে।

আধুনিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হলো উন্নত অবকাঠামো। অবকাঠামোগত ঘাটতি মেটাতে আর সংযোগ বৃদ্ধিতে গত এক যুগে বাংলাদেশে বাস্তবায়িত হয়েছে বেশ কিছু ঐতিহাসিক মেগা প্রজেক্ট, যা দেশের অর্থনৈতিক দৃশ্যপটকে চিরতরে বদলে দিয়েছে।

নিজের অর্থায়নে ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মাসেতু নির্মাণ কেবল একটি কারিগরি সাফল্য ছিল না। এটা ছিল বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের আত্মমর্যাদার প্রতীক। পদ্মাসেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলাকে সরাসরি রাজধানী ঢাকা আর দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর ফলে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হয়েছে, নতুন নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠছে এবং এটি সার্বিক জিডিপিতে প্রতি বছর আনুমানিক ১.২ থেকে ১.৫ শতাংশ অতিরিক্ত অবদান রাখছে।

রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসন আর গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়নে এমআরটি লাইন-৬ চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশ দ্রুতগতির পরিবেশবান্ধব নগর যাতায়াতের যুগে প্রবেশ করেছে। এতে কর্মঘণ্টা সাশ্রয়ের পাশাপাশি জ্বালানি নির্ভরতা আর পরিবেশ দূষণ কমেছে।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম তলদেশীয় টানেল। এটা চট্টগ্রাম শহরকে নদীর অপর পাড়ের আনোয়ারা আর কোস্টাল বেল্টের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর ফলে চট্টগ্রাম ‘এক নগরী দুই শহর’ মডেলে চীনের সাংহাইয়ের আদলে গড়ে উঠছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্ব পারমাণবিক ক্লাবে প্রবেশ করেছে। এটা পরিচ্ছন্ন আর টেকসই বেস-লোড বিদ্যুৎ নিশ্চিত করছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর আর পায়রা বন্দর বাংলাদেশের সমুদ্র বাণিজ্য অবকাঠামোকে বিশ্বমানে উন্নীত করছে। বড় মাদার ভেসেলগুলো এখন সরাসরি বাংলাদেশে নোঙর করতে পারছে, যা পণ্য আমদানি-রপ্তানির খরচ আর সময় নাটকীয়ভাবে কমিয়ে এনেছে।

অর্থনৈতিক আর অবকাঠামোগত প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশে সামাজিক রূপান্তরও ঘটেছে ব্যাপক হারে। তৈরি পোশাক শিল্পে লাখ লাখ নারীর অংশগ্রহণ আর গ্রামীণ ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার সফলতার কারণে নারীরা আজ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। শিক্ষায় লিঙ্গ সমতা অর্জনে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। স্বাস্থ্যসেবার আধুনিকায়ন, গড় আয়ু বৃদ্ধি (বর্তমানে প্রায় ৭৩ বছর), শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া আর সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বিস্তার মানুষকে দারিদ্র্যসীমা থেকে বের করে আনতে সাহায্য করেছে।

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আধুনিক বাংলাদেশের পথচলা যেমন সম্ভাবনাময়, তেমনই কিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জও রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করা, ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ কমিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। কেবল পোশাক শিল্পের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি, ফার্মাসিউটিক্যালস, চামড়াজাত পণ্য আর হালকা প্রকৌশল শিল্পকে বৈশ্বিক বাজারে জনপ্রিয় করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এজন্য পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি আর টেকসই অবকাঠামো গঠনে ‘ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’-এর মতো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

ডিজিটাইজেশনের সুবাতাস, বিশ্বমানের মেগা প্রজেক্ট আর সাধারণ মানুষের অদম্য পরিশ্রমের সমন্বয়ে গঠিত আজকের আধুনিক বাংলাদেশ। অতীত আর বর্তমানের এই রূপান্তর প্রমাণ করে যে সঠিক পরিকল্পনা, সুশাসন আর প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে যেকোনো চ্যালেঞ্জ জয় করা সম্ভব। সকল বাধা আর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা পেরিয়ে প্রযুক্তি-নির্ভর, বৈষম্যহীন আর জ্ঞানভিত্তিক আধুনিক বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে—এটাই আজকের জাতির মূল প্রত্যাশা।

ঐতিহাসিক স্থান তালিকায় ফিরে যান

ডিজিটাইজেশন, মেগা প্রজেক্ট ও আধুনিক বাংলাদেশের যাত্রা সম্পর্কে

ডিজিটাইজেশন, মেগা প্রজেক্ট ও আধুনিক বাংলাদেশের যাত্রা হলো বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক স্থান।

ডিজিটাইজেশন, মেগা প্রজেক্ট ও আধুনিক বাংলাদেশের যাত্রা একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতি আর অর্থনীতিতে বাংলাদেশ আজ এক অনন্য উচ্চতায় দাঁড়িয়েছে। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের পর যে দেশকে একসময় ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে কটাক্ষ করা হয়েছিল, আজ সেই বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির...

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

ডিজিটাইজেশন, মেগা প্রজেক্ট ও আধুনিক বাংলাদেশের যাত্রা কী?
ডিজিটাইজেশন, মেগা প্রজেক্ট ও আধুনিক বাংলাদেশের যাত্রা একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতি আর অর্থনীতিতে বাংলাদেশ আজ এক অনন্য উচ্চতায় দাঁড়িয়েছে। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের পর যে দেশকে একসময় ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে কটাক্ষ করা হয়েছিল, আজ সেই বাংলাদেশ বিশ্বের...
অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থান কোথায় দেখব?
ঐতিহাসিক স্থান তালিকায় ফিরে গিয়ে অন্যান্য স্থান দেখতে পারবেন।
ডিজিটাইজেশন, মেগা প্রজেক্ট ও আধুনিক বাংলাদেশের যাত্রা | বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থান | তথ্যবক্স | Totthobox