১৯৪৮ এর প্রথম ভাষা আন্দোলন ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ
বিস্তারিত বিবরণ
১৫ই মার্চ ১৯৪৮: মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ও সংগ্রাম পরিষদের ৮ দফা চুক্তি
১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকে দেশব্যাপী সফল ভাষা ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘট চলাকালে শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, শামসুল হকসহ বহু ছাত্রনেতা গ্রেপ্তার হন। আন্দোলনের তীব্রতা এবং শিক্ষার্থীদের টানা বিক্ষোভের মুখে তৎকালীন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন বাধ্য হয়ে সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সাথে আলোচনায় বসেন।
পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ১৯শে মার্চ ঢাকা সফরের আগেই পরিস্থিতি শান্ত করার লক্ষ্যে ১৫ই মার্চ খাজা নাজিমুদ্দিন এবং রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধি কামরুদ্দীন আহমদের মধ্যে ৮ দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
৮ দফা চুক্তির মূল শর্তাবলি:
১. গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি: ভাষা আন্দোলনের দায়ে ১৯৪৮ সালের ২৯শে ফেব্রুয়ারি থেকে গ্রেপ্তারকৃত সব বন্দিকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। ২. পুলিশি নির্যাতনের তদন্ত: আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ ও অন্যায় আচরণের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। ৩. সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলা: ১৯৪৮ সালের এপ্রিল মাসে পূর্ব বাংলা সরকারের আইন পরিষদে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার এবং এটিকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব উত্থাপন করতে হবে। ৪. সংবাদপত্রের স্বাধীনতা: ভাষা আন্দোলনের খবর প্রকাশের ওপর জারি করা সংবাদপত্রের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। ৫. আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া: আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-যুবক বা সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। ৬. ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার: আন্দোলনে জারি করা সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা বা ১৪৪ ধারা তুলে নিতে হবে। ৭. রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা: সরকারি চাকুরিতে নিয়োগ এবং সরকারি কাজে ইংরেজি উঠে গেলে সেখানে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ৮. আন্দোলনকারীদের দেশপ্রেম স্বীকৃতি: সংগ্রাম পরিষদ যে উদ্দেশ্যে আন্দোলন চালিয়েছে তা দেশপ্রেমের দ্বারা অনুপ্রাণিত—সরকারকে এই মর্মে একটি বিবৃতি দিতে হবে।
পরবর্তী পরিণতি: খাজা নাজিমুদ্দিন চুক্তি সই করলেও তা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন। জিন্নাহর ঢাকা সফরের পরই তিনি আবার উর্দুর পক্ষে অবস্থান নেন।
১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা ও কারাবরণ
১৯৪৮ সালের সূচনালগ্নে ভাষা আন্দোলনকে রাজপথে গণআন্দোলনে রূপ দিতে তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান (পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু) অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
- সংগ্রাম পরিষদ গঠনে অংশগ্রহণ: ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে তমদ্দুন মজলিশের উদ্যোগে গঠিত প্রথম 'রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' এবং পরবর্তীকালে ১৯৪৮ সালের ২রা মার্চ ফজলুল হক হলে গঠিত 'সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' তৈরিতে তিনি সরাসরি ভূমিকা রাখেন।
- জনমত সৃষ্টি ও লিফলেট প্রচার: ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঘুরে ছাত্রদের একত্রিত করেন এবং উর্দুর প্রভাবে বাংলার অবমূল্যায়নের বিরুদ্ধে লিফলেট বিতরণে অংশ নেন।
- ১১ই মার্চের ধর্মঘটে নেতৃত্ব ও কারাবরণ: ১১ই মার্চের সাধারণ ধর্মঘটের দিন সকালে শেখ মুজিবুর রহমান সচিবালয়ের ২ নম্বর গেটের সামনে পিকেটিং করছিলেন। এসময় পুলিশ এসে পিকেটিংকারীদের ওপর চড়াও হয়। শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, কাজী গোলাম মাহবুব, শামসুল হকসহ বহু নেতাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে।
- মুক্তির পর প্রতিক্রিয়া: বন্দি নেতাদের মুক্তির দাবিতে ১২ থেকে ১৫ই মার্চ টানা ছাত্র ধর্মঘট চলে। তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৫ই মার্চ সন্ধ্যায় অন্যান্য নেতাদের সাথে তিনি কারামুক্ত হন। জেল থেকে বেরিয়েই ১৬ই মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় অনুষ্ঠিত ছাত্রসভায় তিনি সভাপতিত্ব করেন। এই সভায় খাজা নাজিমুদ্দিনের চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা হয় এবং আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
১৯৫২ সালের চূড়ান্ত 'সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' পুনর্গঠন
১৯৪৮ সালের জিন্নাহর ঘোষণার পর কয়েক বছর আন্দোলন কিছুটা ঝিমিয়ে পড়লেও ১৯৫২ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ২৭শে জানুয়ারি পল্টন ময়দানে পুনরায় ঘোষণা দেন—"উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা"। এই ঘোষণার পর আন্দোলন দাবানলের মতো জ্বলে ওঠে।
আন্দোলনকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে ১৯৫২ সালের ৩১শে জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার লাইব্রেরি হলে কাজী গোলাম মাহবুবের সভাপতিত্বে এক সর্বদলীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় আগের কমিটিকে পুনর্গঠন করে 'সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' গঠন করা হয়।
নতুন পরিষদের রূপরেখা ও কার্যপদ্ধতি:
- আহ্বায়ক: কাজী গোলাম মাহবুব।
- গুরুত্বপূর্ণ সদস্যবৃন্দ: আতাউর রহমান খান, আবুল হাশিম, কামরুদ্দীন আহমদ, অলি আহাদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, মওলানা ভাসানী, খন্দকার মুশতাক আহমেদ, শামসুল হক, গাজীউল হকসহ তৎকালীন প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিগণ।
- রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য: যুবলীগ, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং খেলাফতে রব্বানী পার্টি এক ছাতার নিচে এসে কেন্দ্রীয় কমিটিতে যোগ দেয়।
- ২১শে ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি: এই পুনর্গঠিত সর্বদলীয় পরিষদই ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সারা দেশে সার্বাত্মক হরতাল, জনসভা ও বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেয়। পরবর্তীতে ২১শে ফেব্রুয়ারি সরকারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণে এই পরিষদের বিভিন্ন নেতার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য ও ঐতিহাসিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যা অবশেষে ভাষা শহীদদের রক্তে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শক্ত রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করে।
১৯৪৮ এর প্রথম ভাষা আন্দোলন ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ সম্পর্কে
১৯৪৮ এর প্রথম ভাষা আন্দোলন ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ হলো বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক স্থান।
১৫ই মার্চ ১৯৪৮: মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ও সংগ্রাম পরিষদের ৮ দফা চুক্তি ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকে দেশব্যাপী সফল ভাষা ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘট চলাকালে শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, শামসুল হকসহ বহু ছাত্রনেতা গ্রেপ্তার হন। আন্দোলনের তীব্রতা এবং শিক্ষার্থীদের টানা বিক্ষোভের মুখে...