১৯৬১ এর রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ
বিস্তারিত বিবরণ
১৯৬১ সালের রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী: আইয়ুবী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ
১৯৬১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন শুধু একটা সাহিত্যিক বা সাংস্কৃতিক আয়োজন ছিল না। এটা ছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু আর ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির প্রথম সংগঠিত সাংস্কৃতিক আন্দোলন। ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের চরম দমনপীড়নের মুখে দাঁড়িয়ে এই উৎসব পালন বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে। পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধিকার আর স্বাধীনতা সংগ্রামের সাংস্কৃতিক ভিত্তি রচনা করে এই আন্দোলন।
১৯৪৭ সালে ধর্মীয় দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই করাচি আর লাহোরকেন্দ্রিক শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের ওপর সাংস্কৃতিক আর রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা শুরু করে। ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করার পর এই দমনপীড়ন চরম রূপ নেয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী রবীন্দ্রনাথকে ভারতীয় আর হিন্দু সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে। তাদের দাবি ছিল—মুসলিমপ্রধান পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীত বা রবীন্দ্রচর্চা করা পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় চেতনার পরিপন্থী।
১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের শততম জন্মজয়ন্তী এগিয়ে আসতেই সরকার গণমাধ্যম, রেডিও আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে রবীন্দ্রচর্চার ওপর কঠোর নজরদারি শুরু করে। সরকারি আর আধা-সরকারি কর্মচারীদের রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটিতে যোগ না দেওয়ার জন্য লিখিত-অলিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়। আইএসআই আর পুলিশ প্রশাসন রবীন্দ্রপ্রেমী ও প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের ওপর নজরদারি বাড়িয়ে দেয়, যাতে কেউ প্রকাশ্যে শতবার্ষিকী পালন করতে না পারে। ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করার চেষ্টা চলে।
কিন্তু সরকারি নিষেধাজ্ঞা আর দমনপীড়নের মুখেও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিশীল শিক্ষক, শিল্পী, সাহিত্যিক আর সাংস্কৃতিক কর্মীরা মাথা নোয়াতে রাজি হননি। তাঁরা বুঝেছিলেন—এটা শুধু রবীন্দ্রনাথকে স্মরণের লড়াই নয়, এটা বাঙালির নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য আর সংস্কৃতি রক্ষার আত্মপরিচয়ের লড়াই।
১৯৬০ সালের শেষের দিকে বিচারপতি মাহবুব মুর্শেদকে সভাপতি করে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সমন্বয়ে ‘রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটি’ গঠন করা হয়। এই কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সন্জীদা খাতুন, ওয়াহিদুল হক আর ড. আনিসুজ্জামান—যাঁরা গান শেখানো, অনুষ্ঠান পরিকল্পনা আর ছাত্র-শিক্ষকদের সংগঠিত করার মূল কাজ করেন। ড. কাজী মোতাহার হোসেন আর ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষাবিদ হিসেবে আন্দোলনের বুদ্ধিভিত্তিক দিক পরিচালনা করেন। প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী আর ছাত্রনেতারাও যুক্ত হয়ে এই আয়োজনকে এক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের রূপ দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এই বাধার মুখে সবচেয়ে সাহসিকতার পরিচয় দেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ আর কার্জন হল এলাকা হয়ে ওঠে এই আয়োজনের অন্যতম কেন্দ্রস্থল।
সব ভয়-ভীতি আর হুমকি উপেক্ষা করে ১৯৬১ সালের মে মাসে, ২৫শে বৈশাখ ১৩৬৮ বঙ্গাব্দে, সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপিত হয়। বিশেষ করে ঢাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের পাশে অবস্থিত ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে সপ্তাহব্যাপী মূল উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি বাধা সত্ত্বেও হলরুম কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় হাজার হাজার উৎসুক বাঙালির উপস্থিতিতে।
সন্জীদা খাতুন, কলিম শরাফী, ওয়াহিদুল হক, ফাহমিদা খাতুন প্রমুখের কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত আর রবীন্দ্রনাটকের মঞ্চায়ন উপস্থিত জনতাকে উদ্বেলিত করে তোলে। পরিবেশিত গানের প্রতিটি লাইন যেন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এক একটি প্রতিবাদী শ্লোগান হয়ে ওঠে। কেবল ঢাকায় সীমাবদ্ধ না থেকে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, যশোর আর ময়মনসিংহেও স্থানীয় প্রগতিশীল সংগঠন আর তরুণরা গোপনে-প্রকাশে আলোচনা সভা আর গান-বাজনার আয়োজন করে।
এই জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের পরপরই উপলব্ধি হয় যে, সরকারের তোয়াক্কা না করে বাঙালি সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে একটি স্থায়ী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন। এর ফলশ্রুতিতেই ১৯৬১ সালেই জন্ম নেয় বিখ্যাত সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’। ছায়ানট পরবর্তীতে পয়লা বৈশাখ পালন আর সংগীত বিদ্যায়তনের মাধ্যমে রবীন্দ্র ও বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ ঘটায়।
১৯৬১-এর সফলতার ধারাবাহিকতাতেই ১৯৬৭ সালে যখন তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন রেডিও ও টিভিতে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন, তখন পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনতা আর শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীরা রাজপথে তীব্র প্রতিবাদ জানান। সরকারের সেই নিষেধাজ্ঞা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায়।
১৯৬১ সালে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ হিসেবে যা শুরু হয়েছিল, তা দ্রুত রাজনৈতিক রূপ লাভ করে। রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর মাধ্যমেই বাঙালি বুঝতে পারে—ধর্মের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও ভাষা আর সাহিত্যের প্রশ্নে সকল বাঙালি এক। এই আত্মপরিচয়ের বোধই পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান আর ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণা জুগিয়েছিল।
১৯৬১ সালের রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী কেবল কবিপ্রণাম ছিল না। এটা ছিল আইয়ুব খানের সামরিক স্বৈরাচারের মুখে বাঙালির এক অদম্য চ্যালেঞ্জ। বন্দুক আর সামরিক পরোয়ানা দিয়ে একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি আর চেতনাকে দমন করা যায় না—১৯৬১ সালের মে মাসে বাঙালি জাতি তা প্রমাণ করে দিয়েছিল। সেই সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের মশাল ধরেই পরবর্তীতে জন্ম নেয় স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।
১৯৬১ এর রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ সম্পর্কে
১৯৬১ এর রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ হলো বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক স্থান।
১৯৬১ সালের রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী: আইয়ুবী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ ১৯৬১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন শুধু একটা সাহিত্যিক বা সাংস্কৃতিক আয়োজন ছিল না। এটা ছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু আর ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির প্রথম সংগঠিত...