ইতিহাস ও ঐতিহ্য

১৯৭৪ এর মন্বন্তর ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি

৯৬

বিস্তারিত বিবরণ

১৯৭৪ সালের মন্বন্তর: সামাজিক-অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু সেই স্বাধীনতা শুধু মানচিত্রে একটি নতুন দেশের জন্ম দেয়নি। যুদ্ধ শেষে দেশ ছিল ধ্বংসস্তূপের মতো। সেতু, বন্দর, রাস্তাঘাট, কৃষিজমি—সবকিছুই ছিন্নভিন্ন। মানুষ অনাহারে কাতর, অর্থনীতি ভেঙে পড়া। স্বাধীনতার মাত্র তিন বছর পর, ১৯৭৪ সালে সেই ক্ষত আরও গভীর হয়ে ওঠে। মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলা চুয়াত্তরের মন্বন্তর শুধু লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বরং সদ্য স্বাধীন দেশটির অর্থনীতি, সমাজ ও রাজনীতিকে একেবারে অন্য মোড়ে ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

এই দুর্ভিক্ষ কোনো একটা আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটা ছিল যুদ্ধের ক্ষত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আন্তর্জাতিক রাজনীতি আর অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতার এক বিষাক্ত মিশ্রণ।

যুদ্ধের পর দেশের পরিবহন ব্যবস্থা, গুদাম, কৃষিজমি—সবই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। অর্থনীতি পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছিল। ঠিক তখনই ১৯৭৪ সালের এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকায় শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ বন্যা আসে। দেশের বিশাল অংশের আমন আর আউশ ধানের ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে যায়। কৃষিনির্ভর একটা দেশের জন্য এটা ছিল মরণকামড়ের মতো।

দুর্ভিক্ষের সময় বৈদেশিক খাদ্য সাহায্য ছিল প্রাণরক্ষার শেষ অবলম্বন। কিন্তু শীতল যুদ্ধের রাজনীতি বাংলাদেশকে চরম সংকটে ফেলে দেয়। কিউবা তখন মার্কিন অবরোধের মুখে। বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য কিউবায় পাট আর পাটের ছালা রপ্তানি করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মার্কিন প্রশাসন, বিশেষ করে হেনরি কিসিঞ্জারের পররাষ্ট্র বিভাগ, পিএল-৪৮০-এর অধীনে বাংলাদেশে পাঠানো গম ও চালের জাহাজ মাঝপথে আটকে দেয়। শর্ত ছিল পরিষ্কার—কিউবার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন না করলে খাদ্য সাহায্য পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত কিউবায় পাট রপ্তানি বন্ধ করে, কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। যখন সাহায্য পৌঁছায়, ততক্ষণে হাজার হাজার মানুষ অনাহারে মারা গেছে।

খাদ্য সংকটের সুযোগ নেয় একশ্রেণীর মজুদদার, ব্যবসায়ী আর প্রভাবশালী মহল। চালের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম আকাশচুম্বী করে তোলা হয়। অন্যদিকে, ভারতীয় রুপির তুলনায় বাংলাদেশি টাকার মান কমে যাওয়ায় সীমান্ত দিয়ে চাল, গমসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ব্যাপক চোরাচালান চলতে থাকে। রেশন ব্যবস্থা প্রায় ভেস্তে যায়। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ক্যাবিনেট বৈঠকে মজুদদারদের সিন্ডিকেট আর বাজার নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর বিখ্যাত গবেষণায় দেখিয়েছেন—১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে মোট খাদ্য উৎপাদন একেবারে শূন্যে নেমে আসেনি। সংকটটা ছিল অন্য জায়গায়। তিনি যাকে বলেছেন ‘এন্টাইটেলমেন্ট ফেইলিয়ার’—মানুষের খাদ্য কেনার ক্ষমতা হারিয়ে যাওয়া। বন্যায় গ্রামের ভূমিহীন কৃষক, দিনমজুররা কাজ হারায়। আয় বন্ধ হয়ে যায়। বাজারে চাল থাকলেও সাধারণ মানুষের তা কেনার সামর্থ্য ছিল না। বণ্টন ব্যবস্থার ধস আর বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এই সংকটকে আরও গভীর করে তোলে।

মধ্য ১৯৭৪-এর দিকে গ্রামে গ্রামে মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়। কুড়িগ্রাম, রংপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ আর সিলেট সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা প্রায় ২৭ হাজার বলা হলেও আন্তর্জাতিক ও বেসরকারি গবেষণায় এই সংখ্যা এক লাখ থেকে কয়েক লাখ পর্যন্ত বলা হয়। গ্রামের ক্ষুধার্ত মানুষ একটু ফ্যান আর ভাতের আশায় দলে দলে ঢাকায় ছুটতে থাকে। সরকার শত শত লঙ্গরখানা খোলে, কিন্তু সেগুলো প্রয়োজনের তুলনায় একেবারে অপ্রতুল ছিল। ডাস্টবিনে মানুষের সঙ্গে কুকুরের খাবারের লড়াইয়ের দৃশ্য তখনকার সংবাদপত্রে উঠে আসে। অনাহারের পাশাপাশি ডায়রিয়া, কলেরা, গুটিবসন্তের মতো রোগ মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসা আর অপুষ্টির অভাবে মৃত্যুর মিছিল দিন দিন লম্বা হতে থাকে।

এই দুর্ভিক্ষ শুধু মানবিক ট্র্যাজেডি ছিল না। এটা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারকে গভীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটের মুখে দাঁড় করায়। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নাগালের বাইরে চলে যায়। মূল্যস্ফীতি আর মুদ্রার অবমূল্যায়নে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। রপ্তানি আয় তলানিতে ঠেকে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় শূন্য হয়ে যায়।

এই অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে বিরোধী দলগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে জাসদ আর তার সশস্ত্র শাখা গণবাহিনী, এবং অন্যান্য চরমপন্থী বাম দল সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে। ব্যাংক ডাকাতি, পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা, জনপ্রতিনিধিদের ওপর আক্রমণ, সরকারি কর্মকর্তা হত্যা—এসব ঘটনা বেড়েই চলে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকে।

এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার আমূল পরিবর্তনের পথে হাঁটে। ২৮ ডিসেম্বর ১৯৭৪-এ সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। মৌলিক অধিকার স্থগিত হয়, সামরিক বাহিনীকে অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নামানো হয়।

এরপর ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫-এ সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস হয়। সংসদীয় পদ্ধতি বাতিল করে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়। সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে “বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ” বা বাকশাল নামে একক জাতীয় দল গঠন করা হয়।

জুন মাসে আরও এক ধাপ এগিয়ে চারটি সরকারি পত্রিকা—দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ অবজারভার, দৈনিক ইত্তেফাক আর বাংলাদেশ টাইমস ছাড়া বাকি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাকস্বাধীনতা আর গণমাধ্যমের ওপর সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।

দুর্ভিক্ষের ফলে সৃষ্ট জনরোষ, অর্থনৈতিক মন্দা, বিরোধী দল দমন আর বাকশাল গঠনের ফলে দেশে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সরকারের মিত্র কমে আসে। এই অস্থিরতার সুযোগ নেয় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা একদল ষড়যন্ত্রকারী কর্মকর্তা। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর ভোরে তারা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে নৃশংস আক্রমণ চালিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করে।

এর পর থেকে বাংলাদেশে দীর্ঘ সামরিক শাসন আর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার অন্ধকার অধ্যায় শুরু হয়। গণতান্ত্রিক ধারা ব্যাহত হয়। একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থান আর পাল্টা অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটতে থাকে।

চুয়াত্তরের মন্বন্তর শুধু একটা খাদ্য সংকট ছিল না। এটা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান অনুঘটক। যুদ্ধের ক্ষত, আন্তর্জাতিক খাদ্য কূটনীতি, অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মিলিত আঘাত সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রটিকে চরম পরীক্ষা আর ট্র্যাজেডির দিকে ঠেলে দিয়েছিল।


ঐতিহাসিক স্থান তালিকায় ফিরে যান

১৯৭৪ এর মন্বন্তর ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে

১৯৭৪ এর মন্বন্তর ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি হলো বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক স্থান।

১৯৭৪ সালের মন্বন্তর: সামাজিক-অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু সেই স্বাধীনতা শুধু মানচিত্রে একটি নতুন দেশের জন্ম দেয়নি। যুদ্ধ শেষে দেশ ছিল ধ্বংসস্তূপের মতো। সেতু, বন্দর, রাস্তাঘাট, কৃষিজমি—সবকিছুই ছিন্নভিন্ন। মানুষ অনাহারে কাতর, অর্থনীতি ভেঙে পড়া।...

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১৯৭৪ এর মন্বন্তর ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী?
১৯৭৪ সালের মন্বন্তর: সামাজিক-অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু সেই স্বাধীনতা শুধু মানচিত্রে একটি নতুন দেশের জন্ম দেয়নি। যুদ্ধ শেষে দেশ ছিল ধ্বংসস্তূপের মতো। সেতু, বন্দর, রাস্তাঘাট, কৃষিজমি—সবকিছুই ছিন্নভিন্ন। মানুষ...
অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থান কোথায় দেখব?
ঐতিহাসিক স্থান তালিকায় ফিরে গিয়ে অন্যান্য স্থান দেখতে পারবেন।
১৯৭৪ এর মন্বন্তর ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি | বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থান | তথ্যবক্স | Totthobox