বৈসাবি: পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ও নববর্ষ উৎসব
ছুটির ক্যালেন্ডার · বিস্তারিত তথ্য
তারিখ ও বার
13 April, 2026
সোমবার



বিস্তারিত বিবরণ
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান তিন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী—চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাদের সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে আনন্দঘন ঐতিহ্যবাহী উৎসব হলো ‘বৈসাবি’। বর্ষবরণ ও বর্ষবিদায়কে কেন্দ্র করে চৈত্র সংক্রান্তির শেষ দুই দিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিনে এই উৎসব উদযাপিত হয়।
‘বৈসাবি’ শব্দটি মূলত তিনটি প্রধান নৃগোষ্ঠীর উৎসবের নামের প্রথম অক্ষর নিয়ে গঠিত একটি সমন্বিত রূপ:
- বৈ: ত্রিপুরাদের ‘বৈসু’ (Baisu)
- সা: মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ (Sangrai)
- বি: চাকমাদের ‘বিজু’ (Biju) বা ‘বিঝু’
১. উৎসবের প্রধান তিন দিন ও আচার-অনুষ্ঠান
সাধারণত টানা তিন দিন ধরে এই আনন্দ উৎসব পালন করা হয়। দিনভেদে উৎসবের নাম ও আচার-অনুষ্ঠানে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়:
ক. প্রথম দিন: ফুল বিজু / ফুল বৈসু (৩০ চৈত্র)
উৎসবের প্রথম দিনটি সৌন্দর্য ও পবিত্রতার প্রতীক।
- ফুল সংগ্রহ ও ঘর সাজানো: ভোরের আলো ফোটার আগেই তরুণ-তরুণী ও শিশুরা বুনো ফুল কুড়িয়ে আনে। ঘরবাড়ি ফুল দিয়ে নান্দনিকভাবে সাজানো হয়।
- নদীতে ফুল ভাসানো: নদী, ছড়া বা হ্রদের জলে ফুল ও প্রদীপ ভাসিয়ে গঙ্গা দেবীর কাছে বিগত বছরের সকল পাপ ও গ্লানি ক্ষমার প্রার্থনা করা হয় এবং নতুন বছরের সমৃদ্ধি কামনা করা হয়।
খ. দ্বিতীয় দিন: মূল বিজু / মূল বৈসু / সাংগ্রাইয়ের প্রধান দিন (চৈত্র সংক্রান্তি)
এটি উৎসবের সবচেয়ে প্রাণবন্ত ও মূল আনুষ্ঠানিকতার দিন।
- ‘পাচন’ রান্না: এই দিনে প্রতিটি পাহাড়ি ঘরে ঘরে বিশেষ ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘পাচন’ রান্না করা হয়। এটি মূলত কচি বাঁশের কোড়ল (বাঁশ কড়ুল), পাহাড়ি লতাপাতা, শুঁটকি ও নানা পদের সবজি (কমপক্ষে ৭ থেকে ৩২ পদের) দিয়ে তৈরি একটি বিশেষ মিশ্র ব্যাঞ্জন।
- অতিথি আপ্যায়ন: ঘরে ঘরে পাচন, পিঠা-পুলি ও পাহাড়ি ঐতিহ্যবাহী পানীয় দিয়ে অতিথি ও বন্ধুদের আপ্যায়ন করা হয়। প্রবীণদের স্নান করিয়ে তাঁদের পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ গ্রহণ করা হয়।
গ. তৃতীয় দিন: গোজ্যাপোজ্যা দিন / নববর্ষের দিন (১ বৈশাখ)
নতুন বছরের প্রথম দিনটি আধ্যাত্মিকতা ও শান্তিময় পরিবেশে কাটে।
- বিহারে প্রার্থনা: এই দিনে সবাই নতুন ও ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করে স্থানীয় বৌদ্ধ বিহারে (ক্যায়াং) যান। বুদ্ধের পূজা প্রদান, প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, ভিক্ষুসংঘকে অন্নদান এবং বিশ্বশান্তি কামনায় প্রার্থনা করা হয়।
২. ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি
বৈসাবির মূল চেতনা এক হলেও জাতিভেদে কিছু নিজস্ব বর্ণিল আচার রয়েছে:
| নৃগোষ্ঠী | উৎসবের নাম | বিশেষ সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য |
| চাকমা | বিজু বা বিঝু | ফুল বিজু, মূল বিজু ও গোজ্যাপোজ্যা দিন। ঘরে ঘরে পাচন রান্না, 'ঘিলে খেলা' ও লোকজ উৎসব। |
| মারমা | সাংগ্রাই | ‘রিলংপোয়ে’ (Relongpoi) বা ওয়াটার ফেস্টিভ্যাল (পানি খেলা)। বিশুদ্ধ পানি ছিটিয়ে একে অপরের অতীত দুঃখ মুছে ফেলার প্রতীকী উৎসব। |
| ত্রিপুরা | বৈসু | ‘গরয়া নৃত্য’ (Goraia Dance)। বাড়ি বাড়ি গিয়ে দলবদ্ধভাবে গরয়া নৃত্য পরিবেশন এবং দেবতাকে সন্তুষ্ট করে আশীর্বাদ প্রার্থনা। |
৩. সাংগ্রাইয়ের ‘রিলংপোয়ে’ বা পানি খেলা
মারমা সম্প্রদায়ের ‘সাংগ্রাই’ উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষন হলো পানি খেলা।
- নতুন বছরের সূচনায় তরুণ-তরুণীরা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একে অপরের গায়ে সুবাসিত পানি ছিটিয়ে দেয়।
- এই পানি খেলার মূল দর্শন হলো—জল যেমন সবকিছু ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে, তেমনি জল ছিটিয়ে পুরোনো বছরের দুঃখ, পাপ, কলুষতা ও গ্লানি ধুয়ে ফেলে নতুন বছরকে বিশুদ্ধ চিত্তে বরণ করে নেওয়া।
৪. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
বৈসাবি কেবল একটি উৎসব নয়; এটি পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়িয়া ও বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যকার সম্প্রীতি, সংস্কৃতি ও সৌহার্দ্যের মেলবন্ধন। এটি প্রকৃতির সাথে মানুষের গভীর আত্মিক সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দেয়। নতুন বছরের শুরুতে সকল ভেদাভেদ ভুলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়াই এই উৎসবের মূল বার্তা।
বৈসাবি: পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ও নববর্ষ উৎসব সম্পর্কে
বৈসাবি: পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ও নববর্ষ উৎসব হলো বাংলাদেশের Executive ছুটি। তারিখ: 13 April, 2026 (সোমবার)।