বৈসাবি উৎসবের দ্বিতীয় দিন
ছুটির ক্যালেন্ডার · বিস্তারিত তথ্য
তারিখ ও বার
15 April, 2026
বুধবার



বিস্তারিত বিবরণ
‘বৈসাবি’ পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের (বিশেষ করে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা) সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে বর্ণিল সামাজিক ও ঐতিহ্যবাহী নববর্ষ উৎসব। চৈত্র সংক্রান্তি ও নতুন বছরকে কেন্দ্র করে প্রধানত টানা তিন দিনব্যাপী এই আনন্দ উৎসব পালিত হয়।
তিন দিনের এই উৎসবের দ্বিতীয় দিনটিকে (চৈত্র সংক্রান্তির দিন/৩০ চৈত্র) বলা হয় ‘মূল বিজু’ (চাকমা), ‘মূল বৈসু’ (ত্রিপুরা) বা ‘সাংগ্রাইয়ের মূল দিন’ (মারমা)। এটিই বৈসাবি উৎসবের সবচেয়ে আনন্দঘন, প্রাণবন্ত এবং মূল আনুষ্ঠানিকতার দিন।
১. প্রধান প্রধান সামাজিক আচার ও সংস্কৃতি
উৎসবের প্রথম দিন অর্থাৎ ‘ফুল বিজু’র শুভ সূচনার পর দ্বিতীয় দিনে এসে বৈসাবির সার্বিক আনন্দ ও উৎসবমুখরতা চরম শিখরে পৌঁছায়:
- পাচন (Pachon) রান্না ও ঐতিহ্যবাহী আপ্যায়ন: মূল বিজুর দিন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি ঘরে ঘরে তৈরি হয় বিশেষ ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘পাচন’। এটি মূলত বিভিন্ন ধরনের সবজি, কচি বাঁশের কোড়ল (বাঁশ কড়ুল), মাশরুম, পাহাড়ি লতাপাতা ও শুঁটকি দিয়ে তৈরি করা একটি বিশেষ মিশ্র সবজি তরকারি। বিশ্বাস করা হয়, অন্তত ৭ থেকে ৩২ রকমের বা তারও বেশি ভিন্ন ভিন্ন সবজি বা উপাদান দিয়ে তৈরি এই পাচন খেলে রোগব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া যায় এবং বছরে সমৃদ্ধি আসে।
- বাড়ি বাড়ি যাতায়াত ও অতিথি আপ্যায়ন: এই দিনে পাহাড়ি পল্লীগুলোতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একে অপরের বাড়িতে ঘুরতে যান। তরুণ-তরুণীরা দল বেঁধে বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের ঘরে যান। মেহমানদের ঘরে তৈরি পাচন, পিঠা-পুলি, পাহাড়ি পানীয় (জাগরা বা কাঞ্জি) এবং বিভিন্ন মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়।
- প্রবীণদের সম্মান প্রদর্শন: মূল বিজুর দিনে বয়োজ্যেষ্ঠ ও প্রবীণ মানুষদের স্নান করিয়ে তাঁদের পা ছুঁয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং আশীর্বাদ গ্রহণ করা হয়।
- গৃহপালিত পশুপাখির যত্ন: এই দিনে গৃহপালিত পশুপাখি ও গবাদিপশুকে গোসল করানো হয়, গায়ে ফুল দিয়ে সাজানো হয় এবং তাদের ভালো খাবার দেওয়া হয়।
২. নৃগোষ্ঠীভেদে দ্বিতীয় দিনের উদযাপন রূপরেখা
পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মাঝে এই দ্বিতীয় দিনটির বিশেষ বিশেষ নাম ও গুরুত্ব রয়েছে:
| নৃগোষ্ঠী | দ্বিতীয় দিনের নাম | বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও অনুষঙ্গ |
| চাকমা | মূল বিজু | ঘরে ঘরে পাচন ও পাজন রান্না, মিষ্টি ও পিঠা তৈরি, অতিথি আপ্যায়ন এবং আড্ডা। |
| ত্রিপুরা | মূল বৈসু | ঐতিহ্যবাহী পিঠা তৈরি, তরুণ-তরুণীদের ঘরমুখী উৎসব এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। |
| মারমা | সাংগ্রাই (প্রধান দিন) | বুদ্ধ মূর্তি স্নান, প্রবীণদের স্নান করানো এবং ওয়াটার ফেস্টিভ্যাল বা পানি খেলার প্রস্তুতি। |
৩. ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন
মূল বিজুর দিন বিকেল থেকে পাহাড়ি গ্রামগুলোতে ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন লোকজ খেলাধুলার ধুম পড়ে।
- চাকমা সম্প্রদায়ের মধ্যে ‘ঘিলে খেলা’ (এক ধরণের বিশেষ ফল বা বিচি দিয়ে খেলা), ‘নাদি খেলা’ এবং পোর খেলা বেশ জনপ্রিয়।
- তরুণ-তরুণী ও শিশুরা নতুন ও ঐতিহ্যবাহী পোশাক (যেমন: চাকমাদের পিনোন-হাদি, মারমাদের থামি-আঙ্গি) পরিধান করে আনন্দে মেতে ওঠে।
- রাতে গ্রামজুড়ে বসে সাংস্কৃতিক আড্ডা, ঐতিহ্যবাহী গান ও নাচের অনুষ্ঠান।
৪. সামাজিক ও মানবিক তাৎপর্য
বৈসাবি উৎসবের দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ মূল বিজুর মূল বার্তা হলো সামাজিক মেলবন্ধন ও ভাতৃত্ববোধ। পুরনো বছরের সব দুঃখ, কষ্ট, হিংসা ও অমঙ্গল মুছে ফেলে পরম আনন্দে একে অপরকে আপন করে নেওয়াই এই দিনের প্রধান শিক্ষা। পাহাড়ি ও বাঙালি নির্বিশেষে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে খাবারের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে পর্বতঘেরা এই অঞ্চলে এক অনন্য সম্প্রীতির চিত্র ফুটে ওঠে।
বৈসাবি উৎসবের দ্বিতীয় দিন সম্পর্কে
বৈসাবি উৎসবের দ্বিতীয় দিন হলো বাংলাদেশের Executive ছুটি। তারিখ: 15 April, 2026 (বুধবার)।