চৈত্র সংক্রান্তি
ছুটির ক্যালেন্ডার · বিস্তারিত তথ্য
তারিখ ও বার
13 April, 2026
সোমবার


বিস্তারিত বিবরণ
চৈত্র সংক্রান্তি হলো বাংলা বছরের শেষ দিন (৩০ চৈত্র)। ‘সংক্রান্তি’ শব্দটি সংস্কৃত শব্দ থেকে এসেছে, যার আক্ষরিক অর্থ ‘সংক্রমণ’ বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন। জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরিভাষায়, সূর্য যখন এক রাশির থেকে অন্য রাশিতে গমন বা অতিক্রম করে, তাকে সংক্রান্তি বলা হয়। চৈত্র মাসে সূর্য মীন রাশি থেকে মেষ রাশিতে প্রবেশ করে। তাই চৈত্র মাসের শেষ দিনটিকে চৈত্র সংক্রান্তি হিসেবে পালিত হয়। এটি বর্ষবিদায়ের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এক লোকজ উৎসব।
চৈত্র সংক্রান্তির পৌরাণিক ও সামাজিক তাৎপর্য
সনাতন শাস্ত্রীয় বিশ্বাস এবং প্রথা অনুযায়ী, চৈত্র সংক্রান্তি হলো বিগত বছরের হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত হওয়ার দিন।
- অশুভ শক্তি বিনাশ: মনে করা হয়, বিগত সনের যাবতীয় জরা, দুঃখ-কষ্ট, অমঙ্গল ও পাপকে ধুয়ে-মুছে বিদায় জানানোর মধ্য দিয়েই নতুন জীবনের শুভ সূচনা ঘটে।
- ঋতু পরিবর্তন ও কৃষি সংযোগ: চৈত্র সংক্রান্তির সাথে বাংলার কৃষি ব্যবস্থা এবং ঋতু পরিবর্তনের গভীর যোগসূত্র রয়েছে। চৈত্রের তীব্র দাবদাহ শেষে বর্ষার নতুন পলি আসার পূর্বে কৃषक সমাজ চাষবাসের জন্য জমিও প্রস্তুতি এবং ভালো ফলনের আশায় বিশেষ ব্রত পালন করে।
প্রধান প্রধান লোকজ আচার ও উৎসব
চৈত্র সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে গ্রামবাংলা ও পার্বত্য অঞ্চলে হরেক রকমের ঐতিহ্যবাহী মেলা এবং লোকজ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়:
১. চড়ক পূজা ও গাজন উৎসব
চৈত্র সংক্রান্তির প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক আকর্ষণ হলো চড়ক পূজা এবং গাজন উৎসব। মূলত শিব ও পার্বতীর কৃপা লাভের আশায় সনাতন ধর্মাবলম্বী সন্ন্যাসীরা পুরো চৈত্র মাসজুড়ে কৃচ্ছ্রসাধন ও ভক্তিমূলক আচার পালন করেন।
- চড়ক ঘোরা: চৈত্র সংক্রান্তির দিনে চড়ক গাছে সন্ন্যাসীরা পিঠে বড় বড় বড়শি ফুটিয়ে কৃচ্ছ্রসাধন প্রদর্শন করেন।
- গাজনের মেলা: শিবের মহিমা গেয়ে গান করা, মুখের ভেতরের অংশ বা জিহ্বায় লোহার শলাকা ফোঁড়ানো, নীল পূজা এবং ভূত-প্রেতের সাজ সেজে লোকজ নৃত্যের মাধ্যমে গাজন পালিত হয়।
২. শাকান্ন ও চোদ্দ শাক খাওয়ার প্রথা
চৈত্র সংক্রান্তিতে গ্রামবাংলায় ঐতিহ্যবাহী ‘শাকান্ন’ বা ‘চোদ্দ শাক’ খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে।
- বিশ্বাস করা হয়, গ্রীষ্মের তীব্র তাপে সুস্থ থাকতে এবং রোগব্যাধি থেকে মুক্ত থাকতে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া গিমা শাক, হেলেঞ্চা, নিম পাতা, কলমি, পলতা ইত্যাদি চোট্টা বা চোদ্দ পদের কুড়োনো তেতো ও ঔষধি শাক দিয়ে রান্না করা খাবার এই দিনে খেতে হয়।
৩. চৈত্র সংক্রান্তির মেলা
দেশের বিভিন্ন স্থানে সংক্রান্তি উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী লোকজ মেলা বসে। মেলায় বাঁশ ও কাঠের তৈরি হস্তশিল্প, মাটির হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল, মিষ্টি-মণ্ডা (যেমন: খৈ, মুড়ি, বাতাসা, কদমা) এবং নাগরদোলার আয়োজন করা হয়।
৪. হালখাতার প্রস্তুতি
ব্যবসায়ীরা চৈত্র সংক্রান্তির দিন তাঁদের পুরোনো বছরের দেনা-পাওনা পরিশোধ বা আদায় করে হালখাতার প্রস্তুতি নেন। হিসাবের খাতা বন্ধ করার এই দিনে গ্রাহকদের বকেয়া পরিশোধের তাগাদা দেওয়া হয়, যাতে পহেলা বৈশাখে নতুন খাতা খোলা যায়।
পার্বত্য অঞ্চলে চৈত্র সংক্রান্তি: ফুল বিজু ও উৎসবের সূচনা
পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর (চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ইত্যাদি) কাছে চৈত্র সংক্রান্তি অত্যন্ত পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ।
- ফুল বিজু / ফুল বৈসু: চৈত্র সংক্রান্তির দিনটিকে চাকমারা ‘ফুল বিজু’ এবং ত্রিপুরা সম্প্রদায় ‘ফুল বৈসু’ বলে থাকে।
- আচার: এই দিনে সূর্যোদয়ের পূর্বে তরুণ-তরুণী ও শিশুরা বন থেকে নানা রঙের ফুল কুড়িয়ে আনে। সেই ফুল দিয়ে ঘরবাড়ি সুন্দর করে সাজানো হয়, কাপ্তাই রদ বা নদীতে প্রদীপ ও ফুল ভাসিয়ে দিয়ে ঈশ্বর এবং নদীর দেবতার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ও সুখ-শান্তি চাওয়া হয়। এর মাধ্যমেই শুরু হয় পাহাড়িদের তিন দিনব্যাপী ‘বৈসাবি’ উৎসব।
চৈত্র সংক্রান্তির সারসংক্ষেপ (এক নজরে)
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিবরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ |
| তাৎপর্য | বাংলা বছরের শেষ দিন ও বর্ষবিদায়ের পরম মুহূর্ত |
| প্রধান উৎসব | চড়ক পূজা, গাজন উৎসব, নীল পূজা ও চৈত্র সংক্রান্তির মেলা |
| ঐতিহ্যবাহী খাবার | চোদ্দ শাক/শাকান্ন, তেতো খাবার এবং মুড়ি-বাতাসা-খৈ |
| ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অনুষ্ঠান | ফুল বিজু / ফুল বৈসু (নদীতে ফুল ও প্রদীপ ভাসানো) |
সামাজিক ও মানবিক বার্তা
চৈত্র সংক্রান্তি মূলত আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ ও রূপান্তরের প্রতীক। এটি আমাদের শেখায় যে, নতুন কিছু লাভ করতে হলে পুরোনো দুঃখ, গ্লানি ও ক্ষোভকে সানন্দে বিদায় জানাতে হয়। বছরের শেষ দিনটিকে অত্যন্ত আনন্দের সাথে বিদায় জানিয়েই বাঙালি সমাজ মেতে ওঠে পহেলা বৈশাখের নতুন আবাহনে।
চৈত্র সংক্রান্তি সম্পর্কে
চৈত্র সংক্রান্তি হলো বাংলাদেশের Executive ছুটি। তারিখ: 13 April, 2026 (সোমবার)।