দোলযাত্রা
ছুটির ক্যালেন্ডার · বিস্তারিত তথ্য
তারিখ ও বার
03 March, 2026
মঙ্গলবার



বিস্তারিত বিবরণ
দোলযাত্রা বা ‘দোল পূর্ণিমা’ হলো বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান, রঙিন ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ বৈষ্ণব উৎসব। বাংলা ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে ঋতুরাজ বসন্তের আবাহনে এই উৎসব উদযাপিত হয়। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে এই উৎসবকে ‘হোলি’ (Holi) বা ‘ফাগুয়া’ হিসেবে পালন করা হলেও, বঙ্গীয় সংস্কৃতি ও বৈষ্ণব ঐতিহ্যে এর একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক ও শৈল্পিক মাত্রা রয়েছে। মূলত রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পবিত্র আবির্ভাবকে কেন্দ্র করেই দোলযাত্রার আনুষ্ঠানিকতা আবর্তিত হয়।
ধর্মীয় ও পৌরাণিক পটভূমি
দোলযাত্রার সাথে বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্ব এবং সনাতন পৌরাণিক কাহিনীর গভীর যোগসূত্র রয়েছে:
- রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা: বৈষ্ণব শাস্ত্র অনুযায়ী, বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ ও রাধারাণী তাঁদের সখী গোপীদের সাথে ফাল্গুনী পূর্ণিমার এই দিনে নানা রঙের আবীর ও ফাগ খেলে বসন্ত উৎসব উদ্যাপন করেছিলেন। এই লীলা স্মরণে রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহ সুসজ্জিত দোলায় (ঝুলনে) বসিয়ে পুষ্প ও আবীর নিবেদনের মাধ্যমে দোল উৎসব পালন করা হয়।
- শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মতিথি (গৌর পূর্ণিমা): ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দের ফাল্গুনী পূর্ণিমার শুভ তিথিতেই পশ্চিমবঙ্গে নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন যুগাবতার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (শ্রীগৌরাঙ্গ)। তাই বৈষ্ণব সমাজে এই দিনটি ‘গৌর পূর্ণিমা’ নামে অত্যন্ত পবিত্রতার সাথে উদযাপিত হয়। ভক্তগণ দিনব্যাপী উপবাস, হরিনাম কীর্তন ও মহাপ্রভুর পূজা-অர்ச்சনা করেন।
- নেড়াপোড়া বা হোলিকাদহন: দোলের আগের দিন সন্ধ্যায় গ্রামবাংলায় ‘নেড়াপোড়া’ বা ‘চাঁচর’ এবং উত্তর ভারতে ‘হোলিকাদহন’ অনুষ্ঠিত হয়। পৌরাণিক কাহিনী মতে, ভক্ত প্রহ্লাদকে বিনাশ করতে গিয়ে অসুররাজ হিরণ্যকশিপুর বোন হোলিকা নিজেই আগুনে ভস্মীভূত হয়। এটি অসত্য ও অশুভ শক্তির পরাজয় এবং সত্য ও শুভ শক্তির বিজয়ের স্মারক।
দোলযাত্রার প্রধান প্রধান আচার ও সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ
দোলযাত্রাকে কেন্দ্র করে শহর থেকে গ্রামবাংলাজুড়ে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়:
১. আবীর ও রঙের খেলা
দোলের দিন সকালে গৃহদেবতা এবং শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণের পায়ে আবীর অর্পণ করে পূজার সূচনা হয়। এরপর কনিষ্ঠরা জ্যেষ্ঠদের পায়ে আবীর দিয়ে প্রণাম করে আশীর্বাদ গ্রহণ করে এবং সমবয়সীরা একে অপরের মুখে সুবাসিত আবীর ও রঙ মেখে শুভেচ্ছা জানায়।
২. বিগ্রহ নিয়ে দোল পরিক্রমা
মন্দির ও বাড়িতে রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহ দোলায় বসিয়ে ঢাক, ঢোল ও খোল-করতালের সাথে ‘হরি নাম’ গাইতে গাইতে শোভাযাত্রা বের করা হয়। ভক্তরা দোলায় রশি টেনে বিগ্রহকে দোলা দেন এবং সকলের মাঝে প্রসাদ ও মিষ্টি বিতরণ করেন।
৩. শান্তিনিকেতনের ‘বসন্ত উৎসব’
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯২০-এর দশকে ‘বসন্ত উৎসব’-এর সূচনা করেন। হলুদ পোশাক পরে শিক্ষার্থীরা রবীন্দ্রসঙ্গীত, নাচ ও আবীর খেলার মধ্য দিয়ে ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করে নেন। শান্তিনিকেতনের এই বসন্ত উৎসব আজ বিশ্বমানের এক সাংস্কৃতিক আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
এক নজরে দোলযাত্রা
| বিষয়ের ক্ষেত্র | ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিবরণ |
| তারিখ/তিথি | ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথি (বসন্ত ঋতু) |
| অন্যান্য নাম | দোল পূর্ণিমা, গৌর পূর্ণিমা, ফাগুয়া, হোলি (সর্বভারতীয় রূপ) |
| প্রধান দেব-দেবী | শ্রীশ্রী রাধা-কৃষ্ণ এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু |
| প্রধান আচার | নেড়াপোড়া, আবীর ও রঙ খেলা, বিগ্রহের দোল যাত্রা, বসন্ত উৎসব |
| ঐতিহ্যবাহী খাবার | মালপোয়া, ক্ষীর, জিলিপি, নাড়ু ও নানা পদের মিষ্টি |
সামাজিক ও মানবিক তাৎপর্য
দোলযাত্রা কেবল রঙের খেলা বা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সামাজিক বার্তাও সুদূরপ্রসারী। আবীরের রঙে যেমন জাত-পাত, বয়স ও ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ মুছে যায়, তেমনি এই উৎসব মানুষের ভেতরের হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকার দূর করে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বন্ধনে সবাইকে একসূত্রে গেঁথে দেয়।
দোলযাত্রা সম্পর্কে
দোলযাত্রা হলো বাংলাদেশের Executive ছুটি। তারিখ: 03 March, 2026 (মঙ্গলবার)।