ঈদুল আযহা
ছুটির ক্যালেন্ডার · বিস্তারিত তথ্য
তারিখ ও বার
28 May, 2026
বৃহস্পতিবার



বিস্তারিত বিবরণ
ঈদুল আযহা বা কোরবানির ঈদ ইসলাম ধর্মের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। হিজরি বর্ষপঞ্জির দ্বাদশ ও শেষ মাস ‘জিলহজ’-এর ১০ তারিখে এই ঈদ উদযাপিত হয়। ‘আযহা’ (الأضحى) শব্দের অর্থ কোরবানি, ত্যাগ বা উৎসর্গ। এই ঈদ মূলত মহান আল্লাহর প্রতি পরম আনুগত্য, আত্মসমর্পণ এবং সর্বোচ্চ ত্যাগের স্মারক।
ঐতিহাসিক পটভূমি
ঈদুল আযহা এবং কোরবানির ইতিহাস জড়িয়ে আছে জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর তনয় হযরত ইসমাইল (আ.)-এর মহিমান্বিত পরীক্ষার সাথে।
- ঐশী পরীক্ষা: হযরত ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্নে আদিষ্ট হন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু মহান আল্লাহর নামে উৎসর্গ করার জন্য। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে তিনি তাঁর বৃদ্ধ বয়সের একমাত্র প্রিয় সন্তান হযরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
- অনুপম আত্মোৎসর্গ: পিতা যখন সন্তানকে কোরবানির বিষয়টি জানান, সন্তান ইসমাইল (আ.) বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সানন্দে আল্লাহর আদেশ পালনে সম্মতি প্রকাশ করেন।
- ঐশ্বরিক অলৌকিকতা: ইব্রাহিম (আ.) যখন চোখ বেঁধে নিজের প্রাণপ্রিয় পুত্রকে কোরবানি করতে উদ্যত হন, তখন মহান আল্লাহ তাঁদের এই চরম আনুগত্য ও ত্যাগে সন্তুষ্ট হন। আল্লাহর হুকুমে অলৌকিকভাবে ইসমাইল (আ.)-এর স্থানে একটি দুম্বা বা ভেড়া কোরবানি হয়ে যায় এবং ইসমাইল (আ.) সম্পূর্ণ অলৌকিকভাবে রক্ষা পান।
পিতা-পুত্রের এই অনুপম ইমানি পরীক্ষা ও ত্যাগের স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে মহান আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর কোরবানিকে ওয়াজিব বা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।
হজের সাথে সম্পৃক্ততা
ঈদুল আযহার সাথে ইসলাম ধর্মের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ‘হজ’-এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
- জিলহজ মাসের ৮ থেকে১২ তারিখের মধ্যে বিশ্বের লাখ লাখ মুসলিম পবিত্র মক্কা ও মিনায় সমবেত হয়ে হজ সম্পাদন করেন।
- ৯ জিলহজ ‘আরাফাতের ময়দানে’ অবস্থান করার পর ১০ জিলহজ শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ এবং পশু কোরবানির মাধ্যমে হাজিগণ তাঁদের হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। বিশ্বজুড়ে সাধারণ মুসলিমরা একই দিনে ঈদের নামাজ আদায় করে কোরবানি দেন।
কোরবানির প্রধান নিয়মাবলী ও বিধান
কোরবানি কেবল পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এর পেছনে ইসলামি শরিয়তের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে:
১. কোরবানি করার সময়সীমা
জিলহজ মাসের ১০ তারিখ ঈদের নামাজের পর থেকে শুরু করে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী) কোরবানি করার বৈধ সময়।
২. পশুর যোগ্যতা
কোরবানির জন্য নির্দিষ্ট গবাদিপশু (গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, ডুম্বা ও উট) হতে হয়। পশুগুলোকে সম্পূর্ণ সুস্থ, নিখুঁত এবং নির্দিষ্ট বয়সের হতে হয়। রোগাক্রান্ত, অন্ধ বা খোঁড়া পশু কোরবানি দেওয়া নিষিদ্ধ।
৩. গোশত বন্টনের নিয়ম
ইসলামিক অনুশাসন অনুযায়ী কোরবানির গোশতকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়:
- ১ম ভাগ: নিজের ও নিজের পরিবারের জন্য।
- ২য় ভাগ: আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের জন্য।
- ৩য় ভাগ: গরিব, এতিম ও দুস্থদের মাঝে বিতরণের জন্য।
ঈদুল আযহার প্রধান ধর্মীয় আমল
| আমল / নিয়ম | বিশদ বিবরণ |
| ঈদের নামাজ | ১০ জিলহজ সকালে খোলা ময়দান বা মসজিদে দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করা হয়। |
| পানাহার স্থগিত রাখা | ঈদের দিন সকালে কিছু না খেয়ে খালি পেটে ঈদের নামাজে যাওয়া এবং নামাজের পর কোরবানির গোশত দিয়ে প্রথম আহার করা সুন্নাত। |
| তাকবীরে তাশরীক | ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রতিটি ফরজ নামাজের পর উচ্চস্বরে ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু واللهু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ’ পাঠ করা ওয়াজিব। |
সামাজিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য
ঈদুল আযহা কেবল ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী:
- বঞ্চনা দূরীকরণ: সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা তাঁদের সম্পদের একটি অংশ পশুর আকারে কোরবানি দিয়ে তার গোশত গরিব-দুঃখীদের মাঝে ছড়িয়ে দেন। ফলে বছরের এই দিনে সমাজের অসহায় মানুষগুলোও পুষ্টিকর খাবারের স্বাদ পায়।
- ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহানুভূতি: উঁচু-নিচু, ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ ভুলে সকলে একসাথে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেয়।
- অর্থনৈতিক গতিশীলতা: ঈদকে কেন্দ্র করে পশুপালন খামার, চামড়া শিল্প, পরিবহন এবং পশুর হাটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক লেনদেন ঘটে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।
মূল শিক্ষা
ঈদুল আযহার প্রকৃত বার্তা হলো মনের ভেতরের সকল অহংকার, হিংসা, লোভ ও পশুত্বকে বিসর্জন দেওয়া। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে—“আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (পরহেজগারি)।” (সূরা হজ: ৩৭)। লোকদেখানো পশু কোরবানি নয়, বরং আল্লাহর ভয়ে আত্মশুদ্ধি অর্জন ও মানবেতিহাসের সেবায় আত্মনিয়োগ করাই ঈদুল আযহার মূল শিক্ষা।
ঈদুল আযহা সম্পর্কে
ঈদুল আযহা হলো বাংলাদেশের Public ছুটি। তারিখ: 28 May, 2026 (বৃহস্পতিবার)।