ঈদুল ফিতর
ছুটির ক্যালেন্ডার · বিস্তারিত তথ্য
তারিখ ও বার
21 March, 2026
শনিবার



বিস্তারিত বিবরণ
ঈদুল ফিতর (عيد الفطر) হলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি মুসলিমের সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে আনন্দঘন ধর্মীয় উৎসব। দীর্ঘ এক মাস আত্মসংযম, সিয়াম সাধনা (রোজা), ইবাদত-বন্দেগি ও ত্যাগের মাস ‘রমজান’ পার করার পর জিলহজ্ব পঞ্জিকার পর হিজরি শাওয়াল মাসের প্রথম দিন (১ শাওয়াল) এই ঈদ উদযাপিত হয়। ‘ঈদ’ শব্দের অর্থ আনন্দ, উৎসব বা বারবার ফিরে আসা এবং ‘ফিতর’ শব্দের অর্থ রোজা ভঙ্গ করা বা স্বাভাবিক আহারে ফিরে যাওয়া। সেই অর্থে ‘ঈদুল ফিতর’ হলো এক মাসের রোজা সমাপ্তির পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার উৎসব।
ঐতিহাসিক পটভূমি
ইসলামি ইতিহাস অনুযায়ী, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে (দ্বিতীয় হিজরিতে) প্রথম ঈদুল ফিতর পালিত হয়।
হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, হিজরতের পর আল্লাহর রাসূল (সা.) দেখতে পান যে মদিনার অধিবাসীরা ‘নওরোজ’ ও ‘মেহেরজান’ নামে দুটি বাৎসরিক উৎসবে মেতে উঠত, যেখানে খেলাধুলা ও আমোদ-প্রমোদ করা হতো। তখন মহানবী (সা.) প্রজ্ঞাপূর্ণ ঘোষণা দিয়ে বলেন:
“আল্লাহ তাআলা তোমাদের এই দুটি দিনের পরিবর্তে আরও উত্তম দুটি দিন দান করেছেন; একটি হলো ‘ঈদুল ফিতর’ এবং অপরটি হলো ‘ঈদুল আযহা’।” (আবু দাউদ)।
সেই থেকে তাওহীদের বিশ্বাস, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং সার্বজনীন মানবকল্যাণের নীতিতে ভিত্তি করে মুসলমানদের এই ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়ে আসছে।
প্রধান ধর্মীয় বিধান ও আমল
ঈদুল ফিতর কেবল আনন্দের দিন নয়, বরং এর প্রতিটি পরতে রয়েছে আল্লাহর ইবাদত ও শুকরিয়া আদায়ের সুনির্দিষ্ট বিধান:
১. ছাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা প্রদান
ঈদের সালাত আদায়ের আগেই সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের ওপর নির্দিষ্ট পরিমাণ ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। ফিতরার মূল উদ্দেশ্য হলো দরিদ্র ও অসহায় মানুষ যেন ঈদের দিন না খেয়ে না থাকে এবং ধনী-দরিদ্র সবাই মিলে একসাথে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে। পাশাপাশি এটি রমজানের রোজার ভুলত্রুটির কাফফারা বা পরিশুদ্ধি হিসেবে কাজ করে।
২. ঈদের ওয়াজিব নামাজ
১ শাওয়াল সকালে সুবহে সাদেকের পর খোলা ময়দানে (ঈদগাহ) বা জামে মসজিদে অতিরিক্ত ছয় তাকবীরের সাথে দুই রাকাত ঈদুল ফিতরের ওয়াজিব নামাজ আদায় করতে হয়। নামাজের পর খতিব বিশেষ খুতবা প্রদান করেন।
৩. ১ শাওয়ালে রোজা রাখা নিষিদ্ধ
ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, ঈদুল ফিতরের দিনে (১ শাওয়াল) রোজা রাখা সম্পূর্ণ হারাম বা নিষিদ্ধ। এই দিনটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য বিশেষ মেহমানদারির দিন।
৪. মাসনুন সুন্নাতসমূহ
ঈদের দিন সকালে বেশ কিছু সুন্নাত আমল পালন করা উত্তম:
- মিছওয়াক করা ও গোসল করা।
- সাধ্যমতো সুগন্ধি ব্যবহার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন (সম্ভব হলে নতুন) পোশাক পরিধান করা।
- ঈদের মাঠে যাওয়ার আগে বেজোড় সংখ্যক খেজুর বা মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়া।
- ঈদগাহে যাওয়ার সময় নিচু স্বরে বা নীরবে তাকবীর বলা: “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু واللهু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।”
- ঈদগাহে এক পথে যাওয়া এবং অন্য পথে ফিরে আসা।
এক নজরে ঈদুল ফিতর
| বিষয়ের ক্ষেত্র | ধর্মীয় ও সামাজিক বিবরণ |
| তারিখ | ১ শাওয়াল (হিজরি সন) |
| মূল বার্তা | আত্মসংযমের পর আল্লাহর শুকরিয়া ও আত্মশুদ্ধির আনন্দ |
| ওয়াজিব বিধান | ছাদাকাতুল ফিতর (ফিতরা) ও দুই রাকাত ঈদের নামাজ |
| বিশেষ নিয়ম | এই দিনে রোজা রাখা সম্পূর্ণ হারাম বা নিষিদ্ধ |
সামাজিক ও সংস্কৃতিতে ঈদুল ফিতর
বাংলাদেশে এবং বিশ্বজুড়ে ঈদুল ফিতরের সামাজিক আবেদন অপরিসীম:
- সেমাই ও মিষ্টিমুখ: ঈদুল ফিতরকে গ্রামবাংলায় ‘মিষ্টি ঈদ’ নামেও আখ্যায়িত করা হয়। ঈদের দিন ঘরে ঘরে সেমাই, পায়েস, হালুয়া, ফিরনি ও জর্দা ইত্যাদি ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি খাবার তৈরি করা হয়।
- সালামি ও উপহার: ছোটরা বড়দের পা ছুঁয়ে বা সালাম করে দোয়া নেয় এবং বড়রা ছোটদের ‘সালামি’ বা ‘ঈদি’ হিসেবে অর্থ বা উপহার দিয়ে থাকেন।
- পারিবারিক মেলবন্ধন: কর্মব্যস্ত জীবনের মাঝে ঈদের ছুটিতে নাড়ির টানে মানুষ গ্রামে স্বজনদের কাছে ফিরে যায়, যা পারিবারিক সৌহার্দ্য ও মেলবন্ধনকে সুদৃঢ় করে।
- কোলাকুলি ও শত্রুতা দূরীকরণ: ঈদের নামাজের পর ধনী-দরিদ্র, চেনা-অচেনা সকলে বুকে বুক মিলিয়ে কোলাকুলি করে। এটি হিংসা, বিদ্বেষ ও পুরোনো সব ক্ষোভ ভুলে সাম্যের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার প্রতীক।
সামাজিক ও মানবিক তাৎপর্য
ঈদুল ফিতরের মূল শিক্ষাই হলো সাম্য, সহানুভূতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ। রমজান মাসের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার উপলব্ধি মানুষকে গরিব-দুঃখীর কষ্ট বুঝতে শেখায়, আর ঈদুল ফিতর ফিতরা ও সদকার মাধ্যমে তাদের মুখে হাসি ফোটানোর সুযোগ করে দেয়। সব ভেদাভেদ ভুলে একটি সুন্দর, শান্তিময় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলাই ঈদুল ফিতরের প্রকৃত শিক্ষা।
ঈদুল ফিতর সম্পর্কে
ঈদুল ফিতর হলো বাংলাদেশের Public ছুটি। তারিখ: 21 March, 2026 (শনিবার)।