Religious

পবিত্র আশুরা

ছুটির ক্যালেন্ডার · বিস্তারিত তথ্য

১৩৬
Jun26

তারিখ ও বার

26 June, 2026

শুক্রবার

বিস্তারিত বিবরণ

‘আশুরা’ ইসলাম ধর্মের একটি অত্যন্ত পবিত্র, ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। আরবি শব্দ ‘আশারাতুন’ (عَشَرَة) থেকে ‘আশুরা’ শব্দের উৎপত্তি, যার আক্ষরিক অর্থ ‘দশম’ বা ‘দশমি’। হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখকে ‘আশুরা’ বলা হয়। সৃষ্টির শুরু থেকে এই দিনে নানা অলৌকিক ও ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। বিশেষ করে হযরত মুসা (আ.)-এর ফেরাউনের হাত থেকে মুক্তি এবং কারবালার প্রান্তরে হযরত ইমাম হোসেন (রা.)-এর সপরিবারে শাহাদাতবরণের ঘটনা এই দিনটিকে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর কাছে গভীর ভাবগাম্ভীর্য ও শোকের প্রতীক হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে।

ঐতিহাসিক পটভূমি ও আম্বিয়ায়ে কেরামের স্মৃতি

ইসলামি ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুযায়ী, আশুরার দিনটি সৃষ্টির শুরু থেকেই অত্যন্ত বরকতময়। এই দিনে বেশ কয়েকজন পয়গম্বরের জীবনে অলৌকিক ও ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছিল:

  1. হযরত আদম (আ.)-এর তওবা কবুল: ইসলামি বর্ণনানুযায়ী, এই পবিত্র দিনেই প্রথম মানব হযরত আদম (আ.)-এর তওবা কবুল হয়েছিল।
  2. হযরত নূহ (আ.)-এর প্লাবন থেকে মুক্তি: মহাপ্লাবনের পর হযরত নূহ (আ.)-এর কিশতী (নৌকা) আশুরার দিনে ‘জুদি’ পর্বতে গিয়ে নিরাপদে অবতরণ করেছিল।
  3. হযরত মুসা (আ.) ও ফেরাউনের পতন: আশুরার দিনে মহান আল্লাহর হুকুমে লোহিত সাগর দ্বিখণ্ডিত হয়ে হযরত মুসা (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায় ‘বনি ইসরাইল’ ফেরাউনের চরম অত্যাচার থেকে মুক্তি পায়। অন্যদিকে, অত্যাচারী শাসক ফেরাউন তার সৈন্যদলসহ সাগরে ডুবে ধ্বংস হয়।
  4. অন্যান্য নবীদের ঘটনা: এছাড়া হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে রক্ষা পাওয়া, হযরত ইউনুস (আ.)-এর মাছের পেট থেকে উদ্ধার পাওয়া এবং হযরত ইউসুফ (আ.)-এর দীর্ঘদিন পর পিতা ইয়াকুব (আ.)-এর সাথে পুনর্মিলনের ঘটনাও এই আশুরার দিনে সংঘটিত হয়েছিল বলে ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্বাস করা হয়।

কারবালার শোকাবহ ট্র্যাজেডি

হিজরি ৬১ সনের ১০ মহররম (৬৮০ খ্রিস্টাব্দ) ইরাকের কারবালা প্রান্তরে ঘটে যাওয়া হৃদয়বিদারক ঘটনা আশুরাকে এক বিষাদময় ও ঐতিহাসিক নতুন মাত্রা দান করে।

  1. পটভূমি: তৎকালীন শাসক ইয়াজিদের অন্যায় শাসন, স্বৈরাচারী মনোভাব এবং ইসলামি নীতির বিচ্যুতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রা.)। তিনি সত্য ও ত্যাগের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ইয়াজিদের আনুগত্য স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানান।
  2. শাহাদাতবরণ: কারবালার উত্তপ্ত প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর নির্মম অবরুদ্ধকরণ ও পানির তীব্র সংকটের মাঝেও ইমাম হোসেন (রা.) মাথা নত করেননি। ১০ মহররমের দিনে শত্রু বাহিনীর অসম যুদ্ধে তিনি তাঁর পরিবারের নারী, শিশু ও ৭২ জন অনুসারীসহ নির্মমভাবে শহীদ হন।
  3. তাৎপর্য: কারবালার এই ঘটনা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়, অসত্যের বিরুদ্ধে সত্য এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ঈমানি শক্তির দৃঢ়তার এক চিরন্তন প্রতীক হিসেবে ইতিহাসে ভাস্বর হয়ে আছে।

আশুরার প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক আচারসমূহ

বিশ্বজুড়ে মুসলিম সম্প্রদায় ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক রীতির মাধ্যমে পবিত্র আশুরা পালন করে থাকে:

১. আশুরার নফল রোজা

সুন্নি ইসলামি চিন্তাধারা অনুযায়ী, আশুরার প্রধান ইবাদত হলো রোজা (সিয়াম) রাখা।

  1. হাদিসের নির্দেশ: মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর দেখেন যে ইহুদিরা হযরত মুসা (আ.)-এর মুক্তিস্মরণে আশুরার দিনে রোজা রাখছে। তখন রাসূল (সা.) বলেন, "মুসা (আ.)-এর স্মৃতি পালনে আমাদের অধিকার তাদের চেয়ে বেশি।" তিনি নিজে রোজা রাখেন এবং উম্মতকে রোজা রাখার নির্দেশ দেন।
  2. পদ্ধতি: ইহুদিদের সাথে সাদৃশ্য এড়াতে আশুরার দিনের (১০ মহররম) পাশাপাশি তার আগের দিন (৯ মহররম) অথবা পরের দিন (১১ মহররম)—মোট দুটি রোজা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

২. তাজিয়া মিছিল ও শোক পালন

শিয়া মুসলিমদের কাছে আশুরা মূলত কারবালার শোক পালনের দিন।

  1. তাজিয়া মিছিল: এই দিনে কাঠ, কাগজ ও কাপড়ের তৈরি ‘তাজিয়া’ (ইমাম হোসেনের মাজারের প্রতিকৃতি) নিয়ে শোক মিছিল বের করা হয়।
  2. মর্সিয়া ও মাতম: ভক্তরা কালো পোশাক পরিধান করে, শোকগাঁথা (মর্সিয়া) পাঠ করে এবং বুক চাপড়ে ‘হাই হোসেন, হায় হোসেন’ ধ্বনিতে ইমাম হোসেন (রা.) ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও শোক প্রকাশ করেন।

৩. দান-ছদকা ও দোয়া মাহফিল

বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আশুরা উপলক্ষে বিশেষ ওয়াজ মাহফিল, কোরআন খানি, মিলাদ এবং তাবাররুক (বিশেষ করে খিচুড়ি বা হালুয়া) বিতরণের আয়োজন করা হয়। পরিবারে ভালো খাবারের আয়োজন করা এবং এতিম-দুস্থদের দান-ছদকা করার বিশেষ ঐতিহ্যও বাংলায় প্রচলিত।

আশুরার ঐতিহাসিক ঘটনাবলী (এক নজরে)

সময়কাল / প্রেক্ষাপটঘটনাপ্রধান শিক্ষা / তাৎপর্য
প্রাচীন কাল (হযরত মুসা আ.)লোহিত সাগর দ্বিখণ্ডিত হওয়া ও ফেরাউনের পতনঅত্যাচারীর পতন ও ঈমানদারদের চূড়ান্ত মুক্তি
প্রাচীন কাল (হযরত নূহ আ.)মহাপ্লাবন শেষে জুদি পর্বতে কিশতীর অবতরণআল্লাহর ওপর ধৈর্য ও ভরসার জাঁকজমকপূর্ণ ফল
হিজরি ৬১ সন (কারবালা)হযরত ইমাম হোসেন (রা.)-এর শাহাদাতঅন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা ও সত্যের জয়গান
নবীজি (সা.)-এর সুন্নাহ৯ ও ১০ মহররম নফল রোজা পালনআত্মশুদ্ধি ও পূর্ববর্তী বছরের গুনাহ মাফ

বাংলাদেশে পবিত্র আশুরা

বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে আশুরা একটি বিশেষ ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ দিন। এই দিন উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় ছুটি থাকে। পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক ‘হোসাইনী দালান’ থেকে শিয়া সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী বিশাল তাজিয়া মিছিল বের হয়। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ দেশের প্রতিটি মসজিদে বিশেষ খুতবা, আলোচনা ও দোয়ার আয়োজন করা হয়। সংবাদপত্রগুলোতে বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ করা হয় এবং রেডিও-টেলিভিশনে প্রচার করা হয় বিশেষ অনুষ্ঠানমালা।

সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষা

পবিত্র আশুরা কেবল অতীতের কোনো ঘটনাকে স্মরণ করার দিন নয়, বরং এটি মানবজাতিকে বেশ কিছু মৌলিক নীতি ও শিক্ষার আলো দেখায়:

  1. সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা: নিজের জীবন দিয়ে হলেও অসত্য ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করার চরম শিক্ষা দেয় কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসেন (রা.)-এর ত্যাগ।
  2. ধৈর্য ও আত্মত্যাগ: চরম বিপদ ও পরীক্ষার মুখে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রেখে ধৈর্য ধারণ করার বার্তা দেয় এই দিনটি।
  3. পাপমুক্তির সুযোগ: আশুরার রোজা পালনের মাধ্যমে বিগত এক বছরের ছোটখাটো গুনাহ ক্ষমা পাওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়, যা আত্মশুদ্ধির বড় এক মাধ্যম।

আশুরা তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রাম, ত্যাগের মহিমা এবং আল্লাহর অশেষ রহমতের এক মহা স্মারক।

পবিত্র আশুরা সম্পর্কে

পবিত্র আশুরা হলো বাংলাদেশের Religious ছুটি। তারিখ: 26 June, 2026 (শুক্রবার)।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

পবিত্র আশুরা কী?
উপরের “বিস্তারিত বিবরণ” সেকশনে এই ছুটির পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা লেখা আছে।
অন্যান্য ছুটি কোথায় পাব?
ছুটির ক্যালেন্ডার তালিকায় ফিরে গিয়ে অন্যান্য ছুটি দেখতে পারবেন।
পবিত্র আশুরা – 26 June 2026 | ছুটির ক্যালেন্ডার | Totthobox