মহাসপ্তমী
ছুটির ক্যালেন্ডার · বিস্তারিত তথ্য
তারিখ ও বার
19 October, 2026
সোমবার

বিস্তারিত বিবরণ
মহাসপ্তমী: শারদীয় দুর্গাপূজার দ্বিতীয় দিন, নবপত্রিকা স্নান, ধর্মীয় তাৎপর্য ও বাঙালির ঐতিহ্য
ভূমিকা
মহাসপ্তমী শারদীয় দুর্গাপূজার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তিথি। মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার বোধন ও পূজার আনুষ্ঠানিক সূচনা হওয়ার পর মহাসপ্তমীতে দেবীর আরাধনা বিশেষ ধর্মীয় গুরুত্ব লাভ করে। বাংলার হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে এই দিনটি ভক্তি, আধ্যাত্মিকতা, প্রাচীন ঐতিহ্য এবং উৎসবের আনন্দে পরিপূর্ণ। পূজামণ্ডপে ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, ধূপের সুগন্ধ, ফুলের সাজসজ্জা এবং ভক্তদের প্রার্থনার মধ্য দিয়ে মহাসপ্তমীর পরিবেশ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
শারদীয় দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, শিল্পকলা, লোকাচার, পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক সম্প্রীতির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। মহাসপ্তমী সেই বৃহত্তর উৎসবের এমন একটি দিন, যেদিন পূজার বিভিন্ন আচার আরও বিস্তৃতভাবে সম্পন্ন হয়। বিশেষ করে নবপত্রিকা স্নান, নবপত্রিকা স্থাপন এবং সপ্তমীর পূজা বাংলার প্রচলিত দুর্গাপূজার উল্লেখযোগ্য অংশ।
বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাভাষী বিভিন্ন অঞ্চলে মহাসপ্তমী ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে পালিত হয়। অঞ্চলভেদে পূজার পদ্ধতি, সময় এবং কিছু আচার-অনুষ্ঠানে পার্থক্য থাকলেও দেবী দুর্গার প্রতি শ্রদ্ধা ও শুভশক্তির প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা এই দিনের মূল ভাবনাকে একসূত্রে আবদ্ধ করে।
মহাসপ্তমী কী?
মহাসপ্তমী হলো আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের সপ্তম তিথি, যা শারদীয় দুর্গাপূজার প্রধান তিথিগুলোর একটি। চন্দ্রপঞ্জিকা অনুসারে তিথি নির্ধারিত হয় বলে ইংরেজি ক্যালেন্ডারে মহাসপ্তমীর তারিখ প্রতিবছর পরিবর্তিত হয়। কোনো কোনো বছরে পঞ্জিকার হিসাব ও তিথির সময় অনুযায়ী পূজার বিভিন্ন আচার নির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন করতে হয়।
মহাষষ্ঠীতে প্রচলিত পূজাপদ্ধতি অনুসারে দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মতো আচার পালিত হয়। এরপর মহাসপ্তমীতে দেবীর পূজা নির্ধারিত বিধি অনুযায়ী সম্পন্ন করা হয়। এই দিনের সঙ্গে নবপত্রিকার আচার বিশেষভাবে যুক্ত।
মহাসপ্তমীর ধর্মীয় তাৎপর্য বোঝার জন্য মনে রাখতে হবে, দুর্গাপূজার প্রতিটি তিথির নিজস্ব পূজাবিধি ও প্রতীকী অর্থ রয়েছে। মহাসপ্তমী সেই ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব, যেখানে ভক্তরা দেবীর কাছে শান্তি, মঙ্গল, শক্তি এবং কল্যাণ কামনা করেন।
মহাসপ্তমীর পৌরাণিক ও ধর্মীয় পটভূমি
দেবী দুর্গার মাহাত্ম্য হিন্দুধর্মের শাক্ত ঐতিহ্য, পুরাণ এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আখ্যানে বর্ণিত হয়েছে। দেবী মাহাত্ম্যম্ বা শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দেবীকে মহিষাসুরসহ বিভিন্ন অশুভ শক্তির বিনাশকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই আখ্যানের কেন্দ্রীয় ভাব হলো, শুভশক্তি অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিজয়ী হতে পারে।
বাংলার শারদীয় দুর্গাপূজার সঙ্গে অকালবোধনের কাহিনিও গভীরভাবে সম্পর্কিত। কৃত্তিবাসী রামায়ণের প্রচলিত আখ্যানে শ্রীরামচন্দ্র রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আগে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। শরৎকালে এই পূজা করার কাহিনিকে অকালবোধনের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
মহাসপ্তমীর পূজাকে এই বৃহত্তর ধর্মীয় ঐতিহ্যের ধারাবাহিক অংশ হিসেবে দেখা যায়। তবে মহাসপ্তমীর প্রতিটি আচারের ব্যাখ্যা সব ধর্মীয় গ্রন্থে একইভাবে বর্ণিত হয়েছে—এমন দাবি করা ঠিক নয়। পূজার অনেক রীতি দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত আঞ্চলিক প্রথা ও শাক্ত উপাসনার ধারায় বিকশিত হয়েছে।
ভক্তদের বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা শক্তি, সাহস, ন্যায় এবং কল্যাণের প্রতীক। তাঁর আরাধনার মধ্য দিয়ে মানুষ জীবনের বাধা অতিক্রম করার মানসিক শক্তি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা লাভ করেন।
মহাসপ্তমীর প্রধান আচার-অনুষ্ঠান
১. নবপত্রিকা স্নান
মহাসপ্তমীর অন্যতম পরিচিত আচার হলো নবপত্রিকা স্নান। বাংলার প্রচলিত দুর্গাপূজায় নবপত্রিকা প্রস্তুত করে নির্দিষ্ট বিধি অনুসারে স্নান করানো হয়। অনেক স্থানে ভোরে এই আচার সম্পন্ন করা হয়।
‘নবপত্রিকা’ শব্দের অর্থ নয়টি পাতা বা উদ্ভিদকে নিয়ে গঠিত একটি ধর্মীয় প্রতীক। প্রচলিত রীতিতে নয়টি উদ্ভিদকে একত্র করে নবপত্রিকা প্রস্তুত করা হয়। এর সঙ্গে দেবী আরাধনা, প্রকৃতির উর্বরতা এবং কৃষিজীবনের ঐতিহ্যগত সম্পর্ক রয়েছে।
অনেক পূজাপদ্ধতিতে নবপত্রিকাকে কলাগাছের সঙ্গে অন্যান্য উদ্ভিদ যুক্ত করে সাজানো হয়। এরপর নির্দিষ্ট মন্ত্র ও বিধি অনুসারে স্নান করিয়ে পূজাস্থানে নিয়ে আসা হয়। এই আচারকে অনেকে ‘কলাবউ স্নান’ বলেও পরিচিত করেন, যদিও কলাবউ ও নবপত্রিকার ধর্মীয় ব্যাখ্যা নিয়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক রীতি ও ব্যাখ্যা রয়েছে।
নবপত্রিকা স্নানকে শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কাজ হিসেবে দেখলে এর সাংস্কৃতিক তাৎপর্য সম্পূর্ণ বোঝা যায় না। এর মধ্যে প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা, উদ্ভিদের জীবনদায়ী ভূমিকার স্বীকৃতি এবং মানুষের কৃষিনির্ভর ঐতিহ্যের স্মৃতি নিহিত রয়েছে।
২. নবপত্রিকার নয়টি উদ্ভিদ
বাংলার প্রচলিত দুর্গাপূজার রীতিতে নবপত্রিকার সঙ্গে সাধারণত নিম্নলিখিত নয়টি উদ্ভিদের সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়:
১. কদলী বা কলাগাছ: উর্বরতা, পুষ্টি ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
২. কচু: বাংলার পরিচিত খাদ্য ও উদ্ভিদজগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৩. হরিদ্রা বা হলুদ: পবিত্রতা এবং মঙ্গলজনক ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
৪. জয়ন্তী: নবপত্রিকার সঙ্গে যুক্ত একটি উদ্ভিদ; এর পরিচয় ও ব্যবহারে আঞ্চলিক পার্থক্য থাকতে পারে।
৫. বিল্ব বা বেল: হিন্দু ধর্মীয় আচার, বিশেষ করে শিবপূজায় বিল্বপত্রের ব্যবহারের জন্য পরিচিত।
৬. দাড়িম বা ডালিম: ফলদায়ক উদ্ভিদ হিসেবে নবপত্রিকার প্রচলিত তালিকায় স্থান পেয়েছে।
৭. অশোক: ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিচিত একটি বৃক্ষ।
৮. মান বা মানকচু: নবপত্রিকার প্রচলিত উপাদানগুলোর একটি; বিভিন্ন অঞ্চলে উদ্ভিদের পরিচিত নামের ব্যবহারে পার্থক্য দেখা যায়।
৯. ধান: বাংলার কৃষি, খাদ্য ও জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি উদ্ভিদ।
এই নয়টি উদ্ভিদকে একত্র করে নবপত্রিকা প্রস্তুত করা হয়। কিছু ধর্মীয় ব্যাখ্যায় এগুলোকে দেবীর বিভিন্ন শক্তি বা রূপের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে নির্দিষ্ট উদ্ভিদের নাম, স্থানীয় পরিচয় এবং প্রতীকী ব্যাখ্যা পূজাপদ্ধতি অনুসারে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
নবপত্রিকার সঙ্গে কৃষি ও প্রকৃতির সম্পর্ক বাংলার সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ধান, কলা, হলুদ ও অন্যান্য উদ্ভিদ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, খাদ্যাভ্যাস এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই নবপত্রিকা আচারকে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি বাংলার প্রকৃতি ও কৃষিভিত্তিক ঐতিহ্যের প্রতিফলন হিসেবেও দেখা যায়।
৩. কলাবউ ও নবপত্রিকার তাৎপর্য
দুর্গাপূজার সময় কলাগাছকে শাড়ি পরিয়ে সাজানো নবপত্রিকা অনেকের কাছে ‘কলাবউ’ নামে পরিচিত। এই রীতি বিশেষভাবে বাংলার দুর্গাপূজার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।
কলাবউকে অনেকে গণেশের স্ত্রী হিসেবে লোকপ্রচলিত ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেন। তবে এটি সর্বজনস্বীকৃত শাস্ত্রীয় পরিচয় নয়। প্রচলিত পূজাপদ্ধতিতে কলাবউ মূলত নবপত্রিকার সঙ্গে যুক্ত একটি ধর্মীয় প্রতীক। তাই কলাবউ সম্পর্কে কোনো একক লোককথাকে সর্বত্র স্বীকৃত ধর্মীয় সত্য হিসেবে উপস্থাপন না করাই যথাযথ।
নবপত্রিকার বিভিন্ন উদ্ভিদ প্রকৃতি, উর্বরতা ও জীবনধারণের উপকরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই আচার
মহাসপ্তমী সম্পর্কে
মহাসপ্তমী হলো বাংলাদেশের Religious ছুটি। তারিখ: 19 October, 2026 (সোমবার)।