মহালয়া
ছুটির ক্যালেন্ডার · বিস্তারিত তথ্য
তারিখ ও বার
10 October, 2026
শনিবার

বিস্তারিত বিবরণ
মহালয়া হলো বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভ আগমনী বার্তা। হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী, আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যা তিথিতে মহালয়া পালিত হয়। এটি একদিকে যেমন ১৫ দিনব্যাপী 'পিতৃপক্ষ'-এর সমাপ্তি নির্দেশ করে, অন্যদিকে তেমনি শুভ 'দেবীপক্ষ'-এর সূচনা ঘটায়। মহালয়ার পর থেকেই শুরু হয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক উল্টো গণনা।
'মহালয়া' শব্দের অর্থ ও উৎপত্তির ইতিহাস
শব্দগতভাবে 'মহা' এবং 'আলয়'—এই দুটি শব্দ যোগ করে 'মহালয়' বা 'মহালয়া' শব্দের সৃষ্টি। আলয় শব্দের অর্থ বাসস্থান বা আশ্রয়। সেই অর্থে 'মহালয়' বলতে বোঝায় পরমাত্মা বা পরমেশ্বরের মহান আশ্রয়স্থল।
- দেবী দুর্গার আগমন: সনাতন বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়ার দিনেই কৈলাশ ছেড়ে মর্ত্যধামে দেবী দুর্গার আগমন ঘটে। দেবী হলেন সকল শক্তির আধার বা পরম আলয়, তাই তাঁর আবাহনের এই বিশেষ তিথিকে 'মহালয়া' বলা হয়।
- পিতৃলোকের মিলনক্ষেত্র: অন্য এক মতে, মহালয়া হলো পিতৃলোক এবং মর্ত্যলোকের মিলনক্ষেত্র। এই বিশেষ দিনে প্রয়াত পূর্বপুরুষেরা বংশধরদের দেওয়া শ্রদ্ধা ও তর্পণ গ্রহণ করার জন্য মর্ত্যের কাছাকাছি আগমন করেন।
পৌরাণিক প্রেক্ষাপট
মহালয়া তিথির সাথে প্রধানত দুটি পৌরাণিক উপাখ্যান গভীরভাবে যুক্ত রয়েছে:
১. মহিষাসুর বধের প্রস্তুতি ও দেবীর আবাহন
পৌরাণিক বর্ণনা অনুযায়ী, অসুররাজ মহিষাসুর বরপ্রাপ্ত হয়ে স্বর্গরাজ্য অধিকার করে এবং দেবতাদের বিতাড়িত করে। দেবতাদের আকুল প্রার্থনায় ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের সম্মিলিত তেজ থেকে দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটে। দেবতারা দেবী দুর্গাকে নিজ নিজ অস্ত্র প্রদান করে সজ্জিত করেন। মহালয়ার এই শুভ তিথিতেই দেবতারা প্রথম পরম ভক্তিভরে দেবী দুর্গাকে আবাহন জানিয়েছিলেন এবং অসুর বিনাশের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন।
২. দানবীর কর্ণ ও পিতৃপক্ষের সূচনা
মহাভারতের মহাকাব্যিক কাহিনীর সাথে মহালয়ার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে বীর কর্ণের মৃত্যুর পর তাঁর আত্মা স্বর্গে গমন করলে তাঁকে খাদ্যের পরিবর্তে সোনা ও রত্ন পরিবেশন করা হয়। বিস্মিত কর্ণ কারণ জানতে চাইলে দেবরাজ ইন্দ্র জানান যে, কর্ণ জীবদ্দশায় প্রচুর সোনা-দানা দান করলেও কখনো নিজের পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে জল বা অন্ন দান (তর্পণ) করেননি। কর্ণ জানান যে তিনি তাঁর আসল পিতৃপরিচয় সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিলেন। এরপর ইন্দ্রের অনুমতিতে কর্ণকে ১৬ দিনের জন্য মর্ত্যে ফিরে আসার অনুমতি দেওয়া হয়, যাতে তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল দান করতে পারেন। এই ১৬ দিনই শাস্ত্রে ‘পিতৃপক্ষ’ নামে পরিচিত এবং এর শেষ দিনটিই হলো মহালয়া।
মহালয়ার প্রধান প্রধান আচার ও প্রথা
মহালয়ার দিনটি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আচার ও ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়:
১. পিতৃতর্পণ (Pitri Tarpana)
মহালয়ার সকালে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে নদ-নদী বা জলাশয়ের ঘাটে তিল, জল ও তুলসী পাতা দিয়ে পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তির উদ্দেশ্যে তর্পণ করা হয়। স্নান সেরে বস্ত্র পরিধান করে তর্পণকামী মানুষ অঞ্জলি ভরে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে জল অর্পণ করেন। বিশ্বাস করা হয়, এর মাধ্যমে প্রয়াত আত্মারা তৃপ্ত হন এবং বংশধরদের আশীর্বাদ করেন।
২. প্রতিমার চক্ষুদান (Chokkhu Dan)
মৃৎশিল্পীদের কাছে মহালয়া একটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। দুর্গার মৃন্ময়ী প্রতিমা তৈরির কাজ আগে থেকেই শেষ করা হলেও মহালয়ার শুভ তিথিতেই শিল্পী তুলির সূক্ষ্ম টানে দেবী প্রতিমার চোখ আঁকেন, যাকে ‘চক্ষুদান’ বলা হয়। এই চক্ষুদান প্রথার মাধ্যমেই প্রতিমায় প্রতীকী প্রাণসঞ্চার ঘটে বলে বিশ্বাস করা হয়।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য: বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ও 'মহিষাসুরমর্দিনী'
বাঙালির কাছে মহালয়ার ভোর মানেই রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কালজয়ী বাণীতে 'মহিষাসুরমর্দিনী' শ্রবণ। ১৯৩১ সালে তৎকালীন 'অল ইন্ডিয়া রেডিও' (আকাশবাণী) থেকে প্রথম সম্প্রচারিত হওয়া এই গীতিনকশাটি যুগ যুগ ধরে মহালয়ার এক অপরিহার্য সাংস্কৃতিক অংশ হয়ে উঠেছে।
- সংগীত ও চণ্ডীপাঠের মেলবন্ধন: বাণীকুমার রচিত এবং পঙ্কজ কুমার মল্লিকের সুরারোপিত এই অনুষ্ঠানে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কণ্ঠের শ্লোক উচ্চারণ, চণ্ডীপাঠ এবং শাস্ত্রীয় সংগীতের সুর প্রতিটি বাঙালিকে দুর্গোৎসবের আবেগে আপ্লুত করে তোলে।
- ভোরের ঐতিহ্য: মহালয়ার দিন ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে পরিবারের সকলে মিলে আকাশবাণীতে 'মহিষাসুরমর্দিনী' শোনার এই ঐতিহ্য প্রকাংশ্য উৎসবের সূচনার প্রতীক।
মহালয়ার মূল অনুষঙ্গসমূহের এক নজরে সারসংক্ষেপ
| অনুষঙ্গের নাম | সময়কাল / ধরণ | প্রধান বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব |
| পিতৃপক্ষ | প্রতিপদ থেকে অমাবস্যা (১৫ দিন) | প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানানোর সময়কাল। |
| পিতৃতর্পণ | মহালয়ার প্রাতঃকাল | নদী বা জলাশয়ে তিল ও জল দিয়ে তর্পণ করা। |
| দেবীপক্ষ | মহালয়ার পরদিন থেকে পূর্ণিমা | দুর্গোৎসবের শুভ সূচনা ও শক্তির আরাধনার দিনসমূহ। |
| মহিষাসুরমর্দিনী | মহালয়ার ভোর ৪:০০ টা | বাণীকুমার, পঙ্কজ মল্লিক ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কালজয়ী রেডিও আলেখ্য। |
সামাজিক ও মানবিক তাৎপর্য
মহালয়া কেবল একটি ধর্মীয় তিথি বা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের ভেতরের কৃতজ্ঞতাবোধ এবং শিকড়ের সাথে সংযোগ স্থাপন করার বার্তা দেয়। নিজের পিতামাতা ও অতীত প্রজন্মের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো (তর্পণ) এবং সংসারের সকল অশুভ শক্তি দূর করে শুভ শক্তির আবাহন করাই মহালয়ার মূল দর্শন। মহালয়ার আলো-আঁধারি ভোরের শাঁখের ধ্বনি আর চণ্ডীপাঠের সুর সমগ্র বাঙালি জাতিকে একসূত্রে গেঁথে দেবী দুর্গার আগমনের আনন্দে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
মহালয়া সম্পর্কে
মহালয়া হলো বাংলাদেশের Religious ছুটি। তারিখ: 10 October, 2026 (শনিবার)।