শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস
ছুটির ক্যালেন্ডার · বিস্তারিত তথ্য
তারিখ ও বার
21 February, 2026
শনিবার



বিস্তারিত বিবরণ
প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে ‘শহীদ দিবস’ এবং বিশ্বজুড়ে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পরম শ্রদ্ধা ও আত্মমর্যাদার সাথে উদযাপিত হয়। ১৯৫২ সালের এই দিনে বাংলা ভাষাকে তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ গুলি চালালে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ অনেকে শহীদ হন। মাতৃভাষার অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় বুকের রক্ত ঢেলে দেওয়ার এই অভূতপূর্ব ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।
১. ঐতিহাসিক পটভূমি ও ভাষা আন্দোলন (১৯৪৮-১৯৫২)
১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ওপর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক শোষণের রূপরেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
- উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত: তৎকালীন পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশের বেশি মানুষের ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী একমাত্র ‘উর্দু’ ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করে। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় ঘোষণা দেন—"Urdu and Urdu alone shall be the state language of Pakistan" (উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা)।
- বাঙালির প্রতিরোধ: এই অসংগত ঘোষণার বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তৎকালীন সচেতন সমাজ তীব্র প্রতিবাদ জানায়। গড়ে ওঠে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’।
- ২১শে ফেব্রুয়ারির তুঙ্গ মুহূর্ত: ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি (৮ই ফাল্গুন ১৩৫৮ বঙ্গাব্দ) তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল বের করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে মিছিল পৌঁছালে পুলিশ টিয়ারগ্যাস ছাড়ে এবং একপর্যায়ে নির্বিচারে গুলি চালায়।
- শহীদের রক্তে বিজয়: পুলিশের গুলিতে রফিকউদ্দিন আহমেদ, আবুল বরকত, আবদুস সালাম, আব্দুল জব্বার এবং পরের দিন ২২শে ফেব্রুয়ারি শফিউর রহমানসহ অনেকেই শাহাদাত বরণ করেন। ভাষা শহীদের এই আত্মত্যাগের তীব্র দাবানলে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার এবং ১৯৫৬ সালে প্রণীত পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
২. আন্তর্জাতিক ইউনেস্কো স্বীকৃতি
বাঙালির এই ত্যাগের মহিমা ও আত্মমর্যাদার লড়াই বিশ্বমঞ্চে অমরতা পায় ১৯৯৯ সালে।
- উদ্যোগ ও আবেদন: কানাডা প্রবাসী দুই বাঙালি রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালামের প্রাথমিক উদ্যোগ ও প্রবাসী বাঙালিদের গঠিত ‘মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লভার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ সংগঠনের প্রচেষ্টায় তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ইউনেস্কোর কাছে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব পাঠায়।
- ইউনেস্কোর ঐতিহাসিক ঘোষণা: ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ অধিবেশনে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
- প্রথম উদযাপন ও পরবর্তী মর্যাদা: ২০০০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি থেকে জাতিসংঘের ১৮৮টি সদস্য রাষ্ট্রে একযোগে প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতি বছর এই দিবসটি পালনের আহ্বান জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করে।
৩. প্রধান প্রধান আচার ও উদযাপন
২১শে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে পরম আবেগ ও মর্যাদায় নানা আচার পালিত হয়:
ক. প্রভাতফেরি ও শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ
২১শে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে (রাত ১২:০১ মিনিটে) এবং পরদিন প্রত্যুষে খালি পায়ে ‘প্রভাতফেরি’ করে সর্বস্তরের মানুষ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ দেশের সকল শহীদ মিনারে যান। সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়।
খ. কালজয়ী গান
প্রভাতফেরির সময় গীত হয় আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী রচিত এবং আলতাফ মাহমুদ সুরারোপিত চিরন্তন গান:
"আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি..."
গ. অমর একুশে বইমেলা
ভাষা আন্দোলনের স্মরণে পুরো ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হয় বাঙালির ঐতিহ্যবাহী প্রাণের মেলা ‘অমর একুশে বইমেলা’।
৪. এক নজরে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস
| অনুষঙ্গ | ঐতিহাসিক তথ্য ও বিবরণ |
| মূল তারিখ | ২১শে ফেব্রুয়ারি (বাংলা: ৮ই ফাল্গুন) |
| প্রধান ভাষা শহীদগণ | সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর রহমান |
| ইউনেস্কো স্বীকৃতির তারিখ | ১৭ই নভেম্বর, ১৯৯৯ |
| প্রথম বৈশ্বিক উদযাপন | ২০০০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি |
| কালজয়ী গান | "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি" |
৫. জাতীয় ও আন্তর্জাতিক তাৎপর্য
শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস কেবল একটি ঐতিহাসিক স্মারক নয়; এটি বিশ্বজুড়ে ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য রক্ষার এক মহান স্তম্ভ।
- বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের ভিত্তি: ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনই ছিল বাঙালির জাতীয়তাবোধের প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই ৬৬-র ছয় দফা, ৬৯-র গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
- বিশ্বের সকল বিপন্ন ভাষার সুরক্ষার অঙ্গীকার: আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশ্বের যেকোনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও জনগোষ্ঠীর নিজস্ব মাতৃভাষা বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা, মাতৃভাষায় শিক্ষাদান এবং ভাষাগত বৈচিত্র্য উদযাপনের বৈশ্বিক তাগিদ সৃষ্টি করে।
ভাষা শহীদদের এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করে যে, নিজের ভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াই আসলে মানুষের নিজস্ব পরিচয় ও আত্মসম্মান টিকিয়ে রাখারই লড়াই।
শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সম্পর্কে
শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হলো বাংলাদেশের Public ছুটি। তারিখ: 21 February, 2026 (শনিবার)।