পুণ্য বৃহস্পতিবার
ছুটির ক্যালেন্ডার · বিস্তারিত তথ্য
তারিখ ও বার
02 April, 2026
বৃহস্পতিবার
বিস্তারিত বিবরণ
‘পুণ্য বৃহস্পতিবার’ বা ‘পবিত্র বৃহস্পতিবার’ (Maundy Thursday / Holy Thursday) খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র, অর্থবহ এবং আধ্যাত্মিক তাৎপর্যমণ্ডিত একটি দিন। এটি খ্রিষ্টীয় ‘মহাসপ্তাহ’ (Holy Week)-এর অংশ, যা ‘গুড ফ্রাইডে’ (পবিত্র শুক্রবার)-এর ঠিক আগের দিন উদযাপিত হয়। ধর্মীয় ইতিহাস অনুযায়ী, প্রভু যিশু খ্রিষ্ট তাঁর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার আগের রাতে শিষ্যদের সাথে শেষ নৈশভোজ বা ‘দ্য লাস্ট সাপার’ (The Last Supper) গ্রহণ করেছিলেন এবং পরম নম্রতার নিদর্শন হিসেবে শিষ্যদের পা ধুইয়ে দিয়েছিলেন। এই ঐতিহাসিক ও মহিমান্বিত ঘটনাগুলোকে স্মরণ করতেই বিশ্বজুড়ে পুণ্য বৃহস্পতিবার পালিত হয়।
নামকরণের পটভূমি: ‘মন্ডি থার্সডে’
ইংরেজি ‘Maundy’ (মন্ডি) শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ Mandatum থেকে, যার অর্থ ‘আদেশ’ বা ‘হুকুম’।
ঐ রাতে যিশু তাঁর শিষ্যদের উদ্দেশ্যে একটি নতুন প্রেমের আদেশ দিয়ে বলেছিলেন:
“আমি তোমাদের এক নতুন আদেশ দিচ্ছি: তোমরা একে অপরকে প্রেম করো। যেমন আমি তোমাদের ভালোবেসেছি, তোমরাও তেমনি একে অপরকে ভালোবেসো।” (যোহন ১৩:৩৪)
এই ‘নতুন আদেশ’ বা Mandatum থেকেই এই দিনটিকে ‘মন্ডি থার্সডে’ বা পুণ্য বৃহস্পতিবার বলা হয়।
পৌরাণিক ও ধর্মীয় তাৎপর্য
পুণ্য বৃহস্পতিবারের সাথে খ্রিষ্টীয় ধর্মতত্ত্ব ও বিশ্বাসের প্রধান কয়েকটি স্তম্ভ সরাসরি জড়িত:
১. পদপ্রক্ষালন বা শিষ্যদের পা ধোওয়া
শেষ নৈশভোজের পূর্বে যিশু খ্রিষ্ট তোয়ালে দিয়ে নিজের কোমর বেঁধে বাটিতে জল নিয়ে পরম অনুগত ভঙ্গিতে তাঁর ১২ জন শিষ্যের পা ধুইয়ে দেন এবং তা মুছে দেন। তখনকার সংস্কৃতিতে কেবল সাধারণ দাসেরা মনিবের পা ধুইয়ে দিত। কিন্তু যিশু মালিক বা প্রভু হয়েও শিষ্যদের পা ধুইয়ে দিয়ে শিখিয়েছিলেন যে, প্রকৃত নেতৃত্ব হলো নম্রতা এবং সেবার মাধ্যমে অর্জিত হয়।
২. শেষ নৈশভোজ (The Last Supper) ও 'ইউক্যারিস্ট' সূচনা
এই রাতেই যিশু তাঁর শিষ্যদের সাথে শেষ নৈশভোজ গ্রহণ করেন। ভোজের সময় তিনি রুটি ভেঙে শিষ্যদের দিয়ে বলেন, “এটি আমার শরীর, যা তোমাদের জন্য দেওয়া হচ্ছে।” এরপর দ্রাক্ষারসের পেয়ালা তুলে নিয়ে বলেন, “এই পেয়ালা আমার রক্তে নতুন নিয়ম, যা তোমাদের জন্য ঢেলে দেওয়া হচ্ছে।”
খ্রিষ্টান ধর্মে পবিত্র ‘ইউক্যারিস্ট’ (Eucharist), ‘প্রভুর ভোজ’ বা ‘পবিত্র পরমপ্রসাদ’ (Holy Communion) নামক যে প্রধান ধর্মীয় আচার রয়েছে, যিশু এই পুণ্য বৃহস্পতিবারের রাতেই তার শুভ সূচনা করেছিলেন।
৩. গেথসেমানে বাগানে যিশুর ব্যাকুল প্রার্থনা
নৈশভোজ শেষে যিশু ও তাঁর শিষ্যরা গেথসেমানে (Gethsemane) নামক বাগানে যান। সেখানে যিশু চরম মানসিক যন্ত্রণা ও ভাবাবেগে ঈশ্বরের কাছে সানন্দে আত্মনিবেদনের প্রার্থনা করেন। সেই রাতেই শিষ্য ঈস্কারিয়োত যহুমার (Judas) বিশ্বাসঘাতকতায় রোমান প্রহরীরা যিশুকে বন্দী করে নিয়ে যায়।
প্রধান প্রধান ধর্মীয় আচার ও অনুশাসন
পুণ্য বৃহস্পতিবার উদযাপনে বিশ্বজুড়ে ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট গির্জাগুলোতে (চার্চ) বিশেষ বিশেষ আচার পালিত হয়:
| অনুষঙ্গ / আচার | বিশদ বিবরণ |
| পদপ্রক্ষালন অনুষ্ঠান | চার্চের প্রধান পুরোহিত (পাদ্রি বা পোপ) যিশুর অনুকরণে ১২ জন সাধারণ খ্রিষ্টান বা ভক্তের পা ধুইয়ে দেন ও চুম্বন করেন। |
| পবিত্র পরমপ্রসাদ গ্রহণ | যিশুর শেষ নৈশভোজের স্মরণে বিশেষ মাস (Mass) বা বিশ্বজনীন প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং পরমপ্রসাদ বিতরণ করা হয়। |
| বেদি বা আলটার খালি করা | প্রার্থনার শেষভাগে চার্চের আলটার (বেদি) থেকে সব সাজসজ্জা, মোমবাতি ও কাপড় সরিয়ে নেওয়া হয়, যা যিশুর একাকীত্ব ও বন্দী হওয়াকে নির্দেশ করে। |
| প্রার্থনার প্রহর (Holy Hour) | শেষ রাতে গেথসেমানে বাগানে যিশুর নিঃসঙ্গতা ও ব্যাকুল প্রার্থনার স্মরণে অনেক ভক্ত মধ্যরাত পর্যন্ত চার্চে নীরব প্রার্থনায় প্রহর কাটান। |
সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষা
পুণ্য বৃহস্পতিবার কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণ নয়; এটি মানবজাতিকে গভীর কিছু মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়:
- সেবাব্রত ও নম্রতা: কোনো পদমর্যাদা বা ক্ষমতা অহংকারের মাধ্যম নয়, বরং তা অন্যের সেবায় আত্মনিয়োগের মাধ্যম—যিশুর পা ধোওয়ার ঘটনা আমাদের এই শিক্ষা দেয়।
- পারস্পরিক ভালোবাসা: শত্রু-মিত্র ভেদাভেদ ভুলে একে অপরকে ভালোবাসার চরম নিদর্শন স্থাপন করে এই পুণ্যময় দিনটি।
পুণ্য বৃহস্পতিবারের পর থেকেই শুরু হয় খ্রিষ্টান ধর্মের সবচেয়ে গম্ভীর ও ত্যাগের সময়—যা পুণ্য শুক্রবারের ক্রুশবিদ্ধকরণ এবং ইস্টার সানডের পুনরুত্থানের দিকে মানবজাতিকে নিয়ে যায়।
পুণ্য বৃহস্পতিবার সম্পর্কে
পুণ্য বৃহস্পতিবার হলো বাংলাদেশের Religious ছুটি। তারিখ: 02 April, 2026 (বৃহস্পতিবার)।