সরস্বতী পূজা
ছুটির ক্যালেন্ডার · বিস্তারিত তথ্য
তারিখ ও বার
23 January, 2026
শুক্রবার



বিস্তারিত বিবরণ
সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান এবং আনন্দমুখর উৎসব হলো সরস্বতী পূজা। বিদ্যা, বাণী, সুর ও শিল্পের দেবী সরস্বতীর আরাধনার উদ্দেশ্যে প্রতি বছর মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমীতে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। তিথিটি ‘বসন্ত পঞ্চমী’ বা ‘শ্রীপঞ্চমী’ নামেও পরিচিত। অবিদ্যা ও অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করে জ্ঞান ও আলোর সন্ধানে শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত ভক্তি ও নিষ্ঠার সাথে দেশব্যাপী এই দিনটি উদযাপন করে।
দেবী সরস্বতীর পরিচয় ও রূপতত্ত্ব
শ্বেতপদ্মে আসীনা, শ্বেতবস্ত্র পরিহিতা দেবী সরস্বতী পবিত্রতা, শুদ্ধতা ও শান্তির প্রতীক। তাঁর রূপ ও ধারণ করা বস্তুগুলো গভীর তাৎপর্য বহন করে:
- শ্বেতবস্ত্র ও শ্বেতপদ্ম: এগুলো নিষ্কলুষ চরিত্র এবং মনের পবিত্রতার প্রতীক। জ্ঞান অর্জনের জন্য সর্বপ্রথম মনের শুদ্ধতা প্রয়োজন।
- বীণা ও পুস্তক: দেবীর এক হাতে থাকে বেদ বা পুস্তক, যা অনন্ত জ্ঞানের প্রতীক; অন্য হাতে থাকে বীণা, যা শিল্প, সাহিত্য ও সংগীতের প্রতীক।
- স্ফটিকের জপমালা: এটি একাগ্রতা এবং আধ্যাত্মিক সাধনার নির্দেশক।
- দেবীর বাহন: সরস্বতীর বাহন শ্বেতহংস। হংসকে ‘নীর-ক্ষীর বিবেক’-এর প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। হংস যেমন জল ও দুধের মিশ্রণ থেকে কেবল দুধটুকু গ্রহণ করে এবং জলটুকু ফেলে দেয়, ঠিক তেমনি একজন জ্ঞানপিপাসু মানুষ জগতের সমস্ত অকল্যাণ ও অসত্য পরিহার করে কেবল শুদ্ধ জ্ঞানটুকু আহরণ করবে।
ঐতিহাসিক পটভূমি ও পৌরাণিক উপাখ্যান
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ঋগ্বেদে সরস্বতী মূলত একটি প্রবহমান ও পবিত্র নদীর নাম, যাকে 'নদীতমা' (নদীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ) বলা হতো। বৈদিক যুগে এই নদীর তীরেই আর্যদের সভ্যতা, সাহিত্য ও বেদের বিকাশ ঘটেছিল। পরবর্তীতে নদী শুকিয়ে গেলেও, সেই নদীরূপিনী দেবী কালক্রমে বিদ্যা ও জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবীতে রূপান্তরিত হন।
পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, দেবী সরস্বতীর উৎপত্তি ব্রহ্মার মুখমণ্ডল থেকে। তিনি বাকদেবী বা বাগদেবী নামেও পরিচিত, কারণ তিনি বাকশক্তি বা কথা বলার ক্ষমতার অধিকারী। মহাভারত এবং বিভিন্ন স্কন্দ ও মৎস্য পুরাণেও দেবী সরস্বতীর মহিমা বিস্তারিতভাবে কীর্তিত হয়েছে।
প্রধান আচার ও পূজাবিধি
সরস্বতী পূজা মূলত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের উৎসব। এর প্রধান আচারগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- পুষ্পাঞ্জলি প্রদান: পূজার দিন সকালে স্নান শেষে উপবাস থেকে শিক্ষার্থীরা দেবীর চরণে ফুল, বেলপাতা ও তুলসী দিয়ে অঞ্জলি প্রদান করে এবং বিদ্যার জন্য প্রার্থনা করে।
- বই ও বাদ্যযন্ত্র সমর্পণ: পূজার দিন শিক্ষার্থীরা তাদের পাঠ্যপুস্তক, খাতা, কলম এবং সংগীতশিল্পীরা তাদের বাদ্যযন্ত্র দেবীর বেদিতে নিবেদন করেন। পূজার দিন প্রথাগত লেখাপড়া করা নিষেধ থাকে; দিনটি কেবল জ্ঞানদেবীর আরাধনার জন্য নির্ধারিত।
- বিদ্যারম্ভ বা হাতেখড়ি: শিশুদের শিক্ষার জগতে প্রথম প্রবেশের জন্য এটি একটি অত্যন্ত শুভ দিন বলে বিবেচিত হয়। পুরোহিত বা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের মাধ্যমে শিশুদের স্লেটে বা কাগজে খড়িমাটি দিয়ে 'অ' কিংবা 'ওঁ' লিখিয়ে হাতেখড়ি দেওয়া হয়।
- প্রসাদ বিতরণ: কুল, আপেল, কমলাসহ বিভিন্ন ফল এবং খাগড়াই, মুড়কি ইত্যাদি প্রসাদ হিসেবে বিতরণ করা হয়। বিশেষ করে 'কুল' বা বরই খাওয়া নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে একটি লোকজ বিশ্বাস রয়েছে যে, পূজার অঞ্জলি দেওয়ার আগে কুল খেতে নেই।
বসন্ত পঞ্চমী ও সামাজিক প্রভাব
সরস্বতী পূজা মূলত শীতের রুক্ষতা শেষে ঋতুরাজ বসন্তের আগমনের বার্তা দেয়। এই দিন প্রকৃতি যেন নতুন রূপ ধারণ করে। উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হলো পোশাক। প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে এই দিন পূজামণ্ডপে আগত পুণ্যার্থীরা, বিশেষ করে ছাত্র-ছাত্রীরা, হলুদ বা বাসন্তী রঙের শাড়ি ও পাঞ্জাবি পরিধান করে।
স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে পাড়ায় পাড়ায় এবং ঘরে ঘরে এই পূজার আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিমা স্থাপন, আলপনা আঁকা এবং মণ্ডপ সজ্জার কাজ শিক্ষার্থীরা নিজেরাই আনন্দের সাথে করে থাকে, যা সমাজে এক মিলনমেলার সৃষ্টি করে। ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে এটি একটি সর্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক উৎসবের রূপ লাভ করেছে।
জ্ঞান ছাড়া মানুষের জীবন অন্ধকারের তুল্য। সরস্বতী পূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি মূলত শিক্ষার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন এবং আজীবন জ্ঞানচর্চার পথে ব্রতী হওয়ার অঙ্গীকার। অবিদ্যা, কুসংস্কার ও সংকীর্ণতা মুক্ত হয়ে একটি আলোকিত ও মানবিক সমাজ গড়ার অনুপ্রেরণা জোগায় শ্রীপঞ্চমীর এই পবিত্র তিথি।
সরস্বতী পূজা সম্পর্কে
সরস্বতী পূজা হলো বাংলাদেশের ঐচ্ছিক ছুটি (হিন্দু) ছুটি। তারিখ: 23 January, 2026 (শুক্রবার)।