শ্যামা পূজা
ছুটির ক্যালেন্ডার · বিস্তারিত তথ্য
তারিখ ও বার
08 November, 2026
রবিবার
বিস্তারিত বিবরণ
শ্যামা পূজা, যা সর্বজনীনভাবে ‘কালী পূজা’ নামে পরিচিত, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ও আনন্দঘন ধর্মীয় উৎসব। বাংলা কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে পরম ভক্তি ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। দেবী কালীকে ‘শ্যামা’ (কৃষ্ণবর্ণা বা কালো গায়ের রঙ), আদ্যাশক্তি, মহাকালী কিংবা পরমেশ্বরী রূপে আরাধনা করা হয়। এটি মূলত ‘দীপাবলি’ বা ‘দেওয়ালি’ উৎসবের রাতেই পালিত হয় বলে একে ‘দীপান্বিতা শ্যামা পূজা’ও বলা হয়ে থাকে।
ইতিহাস ও উৎপত্তি
দেবী কালীর উল্লেখ প্রাচীন বৈদিক সাহিত্য, দেবীমাহাত্ম্য (শ্রীশ্রীচণ্ডী) এবং বিভিন্ন পুরাণ ও তন্ত্রশাস্ত্রে পাওয়া গেলেও একটি নির্দিষ্ট বার্ষিক সামাজিক উৎসবে রূপ নিয়ে শ্যামা পূজার প্রচলন তুলনামূলকভাবে মধ্যযুগে শুরু হয়।
- কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের অবদান: ষোড়শ শতাব্দীতে নবদ্বীপের বিখ্যাত তান্ত্রিক পণ্ডিত কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ প্রথম বাংলায় মাটির প্রতিমা গড়িয়ে শ্যামা পূজার সূচনা করেন বলে ইতিহাস ও লোকশ্রুতির মাধ্যমে জানা যায়। তাঁর রচিত বিখ্যাত ‘তন্ত্রসার’ গ্রন্থে কালী পূজার বিস্তারিত রূপরেখা বর্ণিত রয়েছে।
- রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতা: পরবর্তীতে অষ্টাদশ শতাব্দীতে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় এই পূজাকে রাজকীয় ও সামাজিক মর্যাদা প্রদান করেন। তিনি তাঁর সমগ্র রাজ্যে ব্যাপকভাবে শ্যামা পূজার আয়োজন করার নির্দেশ দেন।
- সর্বজনীন রূপ: উনিশ শতকে কলকাতার ধনী জমিদারদের মাধ্যমে এবং বিশ শতকে বিভিন্ন বারোয়ারি (সর্বজনীন) পূজা কমিটির উদ্যোগে শ্যামা পূজা তৎকালীন সমগ্র বাংলা, ত্রিপুরা ও আসাম অঞ্চলে ঘরে ঘরে এবং মণ্ডপে মণ্ডপে ছড়িয়ে পড়ে।
ধর্মীয় ও পৌরাণিক তাৎপর্য
পৌরাণিক উপাখ্যান অনুযায়ী, মহাবিশ্বে আসুরিক শক্তির তাণ্ডব বৃদ্ধি পেলে এবং অন্যায়ের বিনাশ ঘটানোর প্রয়োজন হলে দেবী দুর্গার ললাট থেকে দেবী কালীর আবির্ভাব ঘটে।
- অসুর বধ ও শক্তির বিকাশ: শুম্ভ-নিশুম্ভ এবং রক্তবীজের মতো শক্তিশালী অসুরদের বধ করতে দেবী রণচণ্ডী রূপ ধারণ করেন। বিশেষ করে রক্তবীজের রক্ত মাটিতে পড়লে নতুন অসুরের জন্ম হতো বলে দেবী কালী তার সকল রক্ত পান করে তাকে বিনাশ করেন।
- রূপের গূঢ় অর্থ: দেবী কালীর রূপ অত্যন্ত ভয়াল হলেও আধ্যাত্মিক বিচারে তিনি পরম করুণাময়ী মাতা। দেবীর কালো গায়ের রঙ অনন্ত আকাশ ও মহাশূন্যের প্রতীক, যেখানে সমস্ত সৃষ্টি বিলীন হয়ে যায়। দেবীর এলোকেশ মুক্ত আত্মার প্রতীক। দেবীর পদতলে মহাদেব শিবের অবস্থান নির্দেশ করে যে, পরম শিব বা শান্ত শক্তির ওপরই পরম আদ্যাশক্তির মহাজাগতিক লীলা পরিচালিত হয়। দেবীর চার হাতে থাকে খড়্গ, কাটা মুণ্ডু এবং অভয় ও বরদ মুদ্রা—যা একাধারে দুষ্কৃতীদের দমন এবং ভক্তদের সুরক্ষার প্রতীক।
পূজার সময়কাল ও আচার-অনুষ্ঠান
শ্যামা পূজা সাধারণত রাতের বেলা, বিশেষ করে অমাবস্যার ‘মহানিশা’ বা নিশীথ কালে অনুষ্ঠিত হয়।
| পূজার প্রধান অনুষঙ্গ | বিশদ বিবরণ |
| মূল সময় | কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথির গভীর রাত (মহানিশা) |
| উপচার ও নৈবেদ্য | রক্তজবা ফুল, লাল চন্দন, চাল, ফলমূল, খিচুড়ি ভোগ এবং মিষ্টি |
| আলোকসজ্জা (দীপাবলি) | অমাবস্যার গাঢ় অন্ধকার দূর করতে বাড়িঘর ও মণ্ডপে হাজারো প্রদীপ (দীপাবলী) ও মোমবাতি জ্বালানো হয় |
| বলিদান প্রথা | প্রাচীনকালে পশুবলির ব্যাপক প্রচলন থাকলেও বর্তমানে অধিকাংশ স্থানে চালকুমড়ো, আখ বা ছাঁচিকোড়ার প্রতীকী বলি দেওয়া হয় |
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরাসহ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় অত্যন্ত আনন্দের সাথে শ্যামা পূজা উদযাপন করে থাকেন।
- দীপাবলির আলো: পূজার আগের দিন বা পূজার দিন সন্ধ্যায় বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মাটির প্রদীপ বা আধুনিক বাতি দিয়ে আলোকসজ্জা করা হয়। অন্ধকার দূর করে আলোর আগমন নিশ্চিত করাই এর মূল ভাবধারা।
- পিতৃপুরুষকে স্মরণ: শ্যামা পূজার দিন বিকেলে '১৪ প্রদীপ' জ্বালিয়ে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে পথ দেখানোর প্রাচীন লোকজ ঐতিহ্য পালিত হয়।
- সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: বিভিন্ন সর্বজনীন মণ্ডপগুলোতে বর্ণিল আলোকসজ্জা, আতশবাজি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যেখানে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন।
শ্যামা পূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি শক্তি, সত্য এবং অন্ধকারের ওপর আলোর বিজয়ের প্রতীক। মানব অন্তরের কাম, ক্রোধ, হিংসা ও অহংকার রূপ অন্ধকারকে বিনাশ করে সেখানে জ্ঞান, প্রেম ও আলোর প্রতিষ্ঠা করাই শ্যামা পূজার মূল দর্শন।
শ্যামা পূজা সম্পর্কে
শ্যামা পূজা হলো বাংলাদেশের Public ছুটি। তারিখ: 08 November, 2026 (রবিবার)।