বাইতুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ
পল্টন • ঢাকা জেলা • ঢাকা



বিস্তারিত বিবরণ
বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ: বাংলাদেশের জাতীয় স্তম্ভ ও ইসলামিক স্থাপত্যের অনুপম প্রতীক
বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ এবং বিশ্বের অন্যতম সুপরিচিত ও বৃহত্তম সামাজিক-ধর্মীয় স্থাপত্যকেন্দ্র। রাজধানী ঢাকার বাণিজ্যিক ও ঐতিহাসিক হৃদপিণ্ড পল্টনে সুবিশাল এলাকা জুড়ে মসজিদটি অবস্থিত। এটি কেবল বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের প্রধান প্রার্থনাস্থলই নয়, বরং রাজধানী ঢাকার নগর পরিকল্পনা, স্থাপত্যশৈলী এবং ইসলামিক ইতিহাসের এক সুমহান লাইটহাউস হিসেবে বিবেচিত হয়।
পবিত্র মক্কা শরীফের কাবা গৃহের ঘনক্ষেত্রীয় (Cube) আদলে নির্মিত এই মসজিদটি তার অনবদ্য ও আধুনিক স্থাপত্যকলার জন্য বিশ্বে অনন্য। ১৯৮২ সাল থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক পরিচালিত এই মসজিদে প্রতিদিন হাজার হাজার এবং জুমার নামাজসহ প্রধান ঈদগুলোতে চল্লিশ হাজারেরও বেশি মুসল্লি একসাথে সালাত আদায় করেন।
প্রতিষ্ঠা ও ঐতিহাসিক রূপরেখা
বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ নির্মাণের পটভূমি ও ধারাবাহিক অগ্রগতি ছিল একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া:
উদ্যোগ ও কমিটি গঠন
১৯৫৯
তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম শিল্পপতি আব্দুল লতিফ ইব্রাহিম বাওয়ানি এবং তাঁর ভাতিজা ইয়াহিয়া বাওয়ানির দূরদর্শী উদ্যোগে ঢাকায় একটি সুবিশাল জাতীয় মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা গৃহীত হয়। 'বায়তুল মুকাররম মসজিদ সোসাইটি' গঠন করে পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থল পল্টনের ৮.৩০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও নির্মাণ শুরু
২৭ জানুয়ারি ১৯৬০
'পল্টন পুকুর' নামে পরিচিত বিশাল জলাশয় ভরাট করে পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান আনুষ্ঠানিকভাবে এর নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সিন্ধুর খ্যাতনামা স্থপতি আব্দুল হুসেন থারিয়ানিকে মসজিদ কমপ্লেক্সটির মাস্টারপ্ল্যান তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়।
প্রথম জুমার সালাত আদায়
২৫ জানুয়ারি ১৯৬৩
নির্মাণকাজের প্রধান ধাপসমূহ সম্পন্ন হওয়ার পর ১৯৬৩ সালের ২৫শে জানুয়ারি প্রথমবারের মতো বায়তুল মোকাররম মসজিদে জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়, যা ঢাকায় এক নতুন ধর্মীয় অধ্যায়ের সূচনা করে।
জাতীয়করণ ও সম্প্রসারণ
১৯৭৫ - ২০০৮
১৯৭৫ সালের ২৮শে মার্চ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের ইসলামিক ফাউন্ডেশন বায়তুল মোকাররমের সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করে। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে সৌদি সরকারের বিশেষ অর্থায়নে উঁচুতলার সম্প্রসারণ কাজ সম্পন্ন করে ধারণক্ষমতা ৪০ হাজারে উন্নীত করা হয়।
স্থাপত্যশৈলী ও প্রধান ফিচারসমূহ
বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের নকশায় ঐতিহ্যবাহী মুঘল স্থাপত্যের পাশাপাশি আধুনিক জ্যামিতিক অলংকরণের যুগান্তকারী সংমিশ্রণ ঘটেছে:
১. পবিত্র কাবার আদলে ঘনক্ষেত্র নকশা
বায়তুল মোকাররমের মূল ভবনের প্রধান আকৃতি ঐতিহ্যবাহী গম্বুজের পরিবর্তে পবিত্র কাবা শরীফের কিউব বা ঘনক্ষেত্রের আদলে তৈরি। মাটি থেকে ৯৯ ফুট (৩০.১৮ মিটার) উঁচুতে অবস্থিত এই সাদা রঙের প্রধান ভবনটিকে বাংলাদেশের অন্যান্য সকল মসজিদ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা পরিচয় এনে দিয়েছে।
২. প্রবেশপথ ও সাহান
মসজিদের প্রধান ভবনটি আটতলা বিশিষ্ট। পূর্ব দিকে রয়েছে বিশাল সাহান (খোলা প্রাঙ্গণ) যার আয়তন ২৬৯৪.১৯ বর্গমিটার। উত্তর ও দক্ষিণ দিকের প্রবেশদ্বারগুলোতে ঐতিহ্যবাহী অশ্বখুরাকৃতি খিলান এবং সুন্দর গম্বুজযুক্ত বারান্দা রয়েছে, যা মূল ভবনের ওপর গম্বুজ না থাকার ঘাটতি পূরণ করে সুষম ভারসাম্য তৈরি করেছে।
৩. অভ্যন্তরীণ বিন্যাস ও শয্যা
- নিচতলা: সুবিশাল বিপণিবিতান, গ্রন্থাকারে সমৃদ্ধ ইসলামিক মার্কেট কমপ্লেক্স এবং প্রশাসনিক দপ্তর।
- দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ তলা: মূল নামাজের হলঘরসমূহ। দোতলা থেকে ষষ্ঠ তলা জুড়ে মূল সালাত আদায় করা হয়। মহিলাদের জন্য তিনতলার উত্তর পাশে পৃথক প্রবেশপথ ও প্রার্থনাকক্ষ (৬,৩৮২ বর্গফুট) সুনির্দিষ্ট রয়েছে।
- খোলা আঙিনা ও ওজুখানা: আলো-বাতাস চলাচলের জন্য উন্মুক্ত আঙিনা এবং কয়েক হাজার মুসল্লির একসাথে ওজু করার উপযোগী সুবিশাল ওজুখানা কমপ্লেক্স (পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা)।
সাংস্কৃতিক ও জাতীয় গুরুত্ব
- জাতীয় ধর্মীয় অনুষ্ঠান: শবে কদর, শবে মিরাজ, ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহাসহ দেশের প্রধান প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠানে জাতীয় পর্যায়ে প্রধান জামাত বায়তুল মোকাররমেই অনুষ্ঠিত হয়।
- আন্তর্জাতিক বইমেলা ও সম্মেলন: প্রতি বছর ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে মসজিদ প্রাঙ্গণে মাসব্যাপী আন্তর্জাতিক ইসলামিক বইমেলা, তাফসীর মাহফিল এবং কিরাত প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।
- পর্যটন ও ঐতিহ্য: প্রতিদিন দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক ও দর্শনার্থী এই জাতীয় স্থাপত্য সৌন্দর্য ও মুঘল বাগান উপভোগ করতে প্রাঙ্গণে আগমন করেন।
বাইতুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ সম্পর্কে
বাইতুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ হলো বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা/প্রতিষ্ঠান।
উপরের বিবরণ থেকে বিস্তারিত জানুন। তথ্যবক্স থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজেই পেয়ে যান।