জাতীয় সংসদ ভবন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইনসভা

ঢাকা জেলা • ঢাকা

৭৬
জাতীয় সংসদ ভবন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইনসভা
জাতীয় সংসদ ভবন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইনসভা
জাতীয় সংসদ ভবন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইনসভা
+ ২ টি

বিস্তারিত বিবরণ

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ: গঠন, ইতিহাস, ক্ষমতা ও সংস্কারের আলোচনা

জাতীয় সংসদ বাংলাদেশের গণতন্ত্রের হৃদয়। এটি দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা—এককক্ষ বিশিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে মোট ৩৫০ জন সংসদ সদস্য বসেন। এর মধ্যে ৩০০ জন জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ পদ্ধতিতে। বাকি ৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত, যা বিজয়ী ৩০০ সদস্যের অনুপাতিক ভোটে নির্ধারিত হয়। সংবিধান অনুযায়ী একটি সংসদের মেয়াদ সাধারণত পাঁচ বছর।

সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দ্বিতীয় সর্বাধিক আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। প্রথমবারের মতো জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)ও সংসদে প্রতিনিধিত্ব লাভ করে। এই নির্বাচন নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

সংসদ ভবন ও তার স্থাপত্য সৌন্দর্য

বাংলাদেশের প্রথম ও দ্বিতীয় সংসদের অধিবেশনগুলো হতো পুরোনো সংসদ ভবনে, যা এখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বর্তমান জাতীয় সংসদ ভবনটি বিশ্বের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন আইনসভা ভবন হিসেবে পরিচিত। এটি ঢাকার শেরেবাংলা নগরে ২১৫ একর বিস্তৃত সুবিশাল প্রাঙ্গণে অবস্থিত।

মার্কিন স্থপতি লুই আই কান এই কালজয়ী নকশা তৈরি করেন। ১৯৬১ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং নানা বাধাবিপত্তি পেরিয়ে ১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। পুরো এলাকাটি প্রধান ভবন, দক্ষিণ প্লাজা ও প্রেসিডেন্সিয়াল প্লাজা—এই তিন ভাগে বিভক্ত। চারপাশে সবুজ গাছপালা, খোলা চত্বর এবং পেছনে ‘ক্রিসেন্ট লেক’ নামের মনোরম জলাধার রয়েছে। এই ভবন শুধু ইট-পাথরের কাঠামো নয়—এটি গণতন্ত্রের এক দৃশ্যমান প্রতীক।

মূল মিলনায়তনে ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের আসন ছাড়াও বিশেষ অতিথিদের জন্য ৫৬টি, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ৪১টি, সাংবাদিকদের জন্য ৮০টি এবং সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য ৪৩০টি আসন সংরক্ষিত রয়েছে। সাধারণ মানুষও এখানে এসে গণতন্ত্রের কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করতে পারেন—এটাই এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।

সদস্যপদ ও যোগ্যতার শর্ত

সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্য হতে হলে প্রার্থীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং বয়স ন্যূনতম ২৫ বছর হতে হবে। আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ বা দেউলিয়া ঘোষিত ব্যক্তি এবং দ্বৈত নাগরিকত্বধারীরা যোগ্য নন। প্রার্থীরা দলীয় প্রতীক নিয়ে কিংবা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। নির্বাচিত হলে তাঁরা পাঁচ বছরের জন্য নিজ এলাকার মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন।

সংসদের মূল ক্ষমতা ও দায়িত্ব

রাষ্ট্রপতি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। মন্ত্রিসভার কমপক্ষে ৯০ শতাংশ সদস্যকে সংসদ সদস্য হতে হয়। মন্ত্রিসভা তাদের সব কর্মকাণ্ডের জন্য সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য।

সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সাধারণত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রার্থীই নির্বাচিত হন। সংসদ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করার ক্ষমতাও রাখে।

সরকারি নীতি পর্যালোচনা, বিল যাচাই এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তদন্তের জন্য স্থায়ী কমিটিগুলো কাজ করে। এগুলো সরকারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

তবে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সদস্য নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে বা দল থেকে পদত্যাগ করলে তাঁর সদস্যপদ বাতিল হয়ে যায়। অনেকে মনে করেন, এটি সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশের পথে বাধা তৈরি করে এবং নির্বাহী বিভাগকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেয়।

সংসদ অধিবেশনে সদস্যদের দেওয়া বক্তব্যের জন্য তাঁদের আদালতে জবাবদিহি করতে হয় না। এছাড়া জাতীয় স্বার্থে কাউকে আইনি দায়মুক্তি দেওয়ার ক্ষমতাও সংসদের হাতে রয়েছে।

দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদের প্রস্তাব ও সংস্কার আলোচনা

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের আইনসভাকে এককক্ষ থেকে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট ব্যবস্থায় রূপান্তরের কথা বলা হচ্ছে। প্রস্তাবিত মডেলে—

  1. জাতীয় পরিষদ (নিম্নকক্ষ) হবে ৪০০ আসনবিশিষ্ট। এর মধ্যে ৩০০ আসনে সরাসরি নির্বাচন, ১০০টি সংরক্ষিত নারী আসন এবং যুবকদের জন্য ১০ শতাংশ কোটার প্রস্তাব রয়েছে।
  2. সিনেট (উচ্চকক্ষ) হবে ১০৫ আসনবিশিষ্ট। এর মধ্যে ১০০ জন সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবেন এবং ৫ জন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত হবেন।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা শেষে ৫০৫ থেকে ৫৫৫ আসনবিশিষ্ট দ্বিকক্ষ আইনসভার খসড়া তৈরি করেছে। এই মডেলে উচ্চকক্ষ বিল পর্যালোচনা ও সংশোধনের প্রস্তাব দিতে পারবে, কিন্তু চূড়ান্ত আইন প্রণয়ন বা অর্থবিল আটকানোর ক্ষমতা থাকবে না। কোনো বিল এক মাসের বেশি আটকে থাকলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত বলে গণ্য হবে।

অনেকে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ধারণাকে স্বাগতম জানালেও আসন বণ্টন পদ্ধতি নিয়ে কিছু দলের ভিন্নমত রয়েছে।


জাতীয় সংসদ শুধু আইন তৈরির জায়গা নয়। এটি দেশের গণতান্ত্রিক চেতনা, সামাজিক অগ্রগতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রধান চালিকাশক্তি। সময়ের সাথে সাথে সংসদীয় ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার প্রস্তাবনা বাস্তবায়িত হলে এটি আরও বেশি প্রতিনিধিত্বমূলক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা যেন এই ভবনের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়—সেটাই গণতন্ত্রের আসল সৌন্দর্য।

স্থাপনা তালিকায় ফিরে যান

জাতীয় সংসদ ভবন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইনসভা সম্পর্কে

জাতীয় সংসদ ভবন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইনসভা হলো বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা/প্রতিষ্ঠান।

উপরের বিবরণ থেকে বিস্তারিত জানুন। তথ্যবক্স থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজেই পেয়ে যান।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

জাতীয় সংসদ ভবন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইনসভা কী?
উপরের “বিস্তারিত বিবরণ” সেকশনে এই স্থাপনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য লেখা আছে।
অন্যান্য স্থাপনা কোথায় দেখব?
স্থাপনাসমূহ তালিকায় ফিরে গিয়ে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান দেখতে পারবেন।