জাতীয় স্মৃতিসৌধ

সাভার উপজেলা • গাজীপুর জেলা • চট্টগ্রাম

১৭৯
জাতীয় স্মৃতিসৌধ
জাতীয় স্মৃতিসৌধ
জাতীয় স্মৃতিসৌধ
+ ৩ টি

বিস্তারিত বিবরণ

বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের অমর স্মারক ও গৌরব

ঢাকা থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে সাভারের নবীনগরে অবস্থিত ‘জাতীয় স্মৃতিসৌধ’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর শহীদদের অসামান্য ত্যাগ ও বীরত্বের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত দেশের প্রধান স্মারক স্থাপনা। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যেসব বীর সন্তান নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের প্রতি জাতির গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার প্রতীক হিসেবে এই সৌধটি দাঁড়িয়ে আছে। এটি কেবল একটি স্থাপনা নয়, বরং বাঙালির দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ও আত্মত্যাগের এক অনন্য দলিল।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

স্বাধীনতার ঠিক পরপরই ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর, প্রথম বিজয় দিবসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাভারে এই জাতীয় স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সাভারের এই নির্দিষ্ট জায়গাটি বেছে নেওয়ার পেছনে ঐতিহাসিক কারণ ছিল, কারণ এখানে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধের বেশ কিছু বধ্যভূমি ও গণকবর রয়েছে।

পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে সরকার এক জাতীয় প্রতিযোগিতার মাধ্যমে স্মৃতিসৌধের একটি আধুনিক ও অর্থবহ নকশা আহ্বান করে। দেশের খ্যাতনামা স্থপতি ও শিল্পীদের জমা দেওয়া মোট ৫৭টি নকশার মধ্যে তরুণ স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন-এর নকশাটি সর্বসম্মতভাবে নির্বাচিত হয়। ১৯৭৯ সালে এর মূল নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং বিভিন্ন ধাপে কাজ শেষে ১৯৮২ সালের ডিসেম্বরে এর নির্মাণকাজ সম্পূর্ণরূপে সমাপ্ত হয়।

স্থাপত্যশৈলী ও প্রতীকী তাৎপর্য

জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থাপত্য নকশা অত্যন্ত সুগভীর ও প্রতীকসমৃদ্ধ। এর মূল কাঠামোটি কংক্রিটের তৈরি হলেও এর চারপাশের চত্বর ও পথঘাট নির্মাণে লাল ইট ব্যবহার করা হয়েছে, যা রক্তের লাল জমিতে অর্জিত স্বাধীনতার স্বতন্ত্র উন্মেষকে নির্দেশ করে।

  1. সাত জোড়া প্রাচীর: স্মৃতিসৌধের মূল কাঠামোটি সাত জোড়া ত্রিভুজাকৃতির দেয়াল নিয়ে গঠিত। এই দেয়ালগুলো ছোট থেকে বড়—এই ক্রমানুসারে সাজানো হয়েছে। এই সাতটি দেওয়াল বা স্তম্ভ বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের সাতটি ঐতিহাসিক ও গৌরবময় পর্যায়কে নির্দেশ করে:
  2. ১. ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন
  3. ২. ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন
  4. ৩. ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র আন্দোলন
  5. ৪. ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন
  6. ৫. ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন
  7. ৬. ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান
  8. ৭. ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ
  9. উচ্চতা ও বিন্যাস: মধ্যবর্তী দেয়ালটি দৈর্ঘ্যে সবচেয়ে ছোট হলেও উচ্চতায় সবচেয়ে বেশি। এর সর্বোচ্চ চূড়া বা শিখর ভূমি থেকে প্রায় ১৫০ ফুট (৪৬ মিটার) উঁচুতে অবস্থিত। ভিন্ন ভিন্ন কোণ থেকে এই সৌধটিকে ভিন্ন রূপের বলে মনে হয়, যা এক গতিময় ও জাদুকরী স্থাপত্যশৈলীর পরিচয় দেয়।

সৌধ চত্বর ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য

৩৪ হেক্টর বা প্রায় ৮৪ একর জমির ওপর বিশাল এই স্মৃতিসৌধ কমপ্লেক্সটি গড়ে উঠেছে। এর চারপাশের বাকি অংশে রয়েছে আরও সুবৃত সবুজ ঘাসের বেষ্টনী, যা স্বাধীন বাংলাদেশের সবুজ প্রকৃতির প্রতীক।

স্মৃতিসৌধের মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করে মূল বেদিতে পৌঁছানোর পথটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। দর্শনার্থীদের বেশ কিছু উঁচু-নিচু চত্বর ও সিঁড়ি পার হয়ে এগোতে হয়, যা বোঝায় যে স্বাধীনতা অর্জন করতে বাঙালি জাতিকে কত চড়াই-উতরাই ও সংগ্রাম পার করতে হয়েছে। পথের দুপাশে রয়েছে শহীদদের দশটি গণকবর, যা দর্শনার্থীদের মনে শ্রদ্ধাবনত ভাব এনে দেয়। এছাড়া মূল কাঠামোর সামনে রয়েছে একটি কৃত্রিম জলাশয়, যেখানে সৌধের প্রতিচ্ছবি এবং জাতীয় পতাকার আবহ ফুটে ওঠে।

রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব ও বর্তমান অবস্থা

রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী, বাংলাদেশে আগত বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান ও অতিথিরা সরকারিভাবে এই স্মৃতিসৌধে এসে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং স্মৃতিসৌধ চত্বরে স্মারক বৃক্ষরোপণ করেন। প্রতি বছর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে রাষ্ট্রপতি, প্রধানন্ত্রীসহ সর্বস্তরের লাখো মানুষ এখানে ফুল দিয়ে শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।

জাতীয় স্মৃতিসৌধ কেবল ইট-পাথরের কোনো কাঠামো নয়; এটি স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব, আত্মত্যাগ এবং বীরত্বের অবিনশ্বর প্রতীক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এটি বাঙালি জাতিকে তাদের শেকড় ও বিজয়ের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়।

স্থাপনা তালিকায় ফিরে যান

জাতীয় স্মৃতিসৌধ সম্পর্কে

জাতীয় স্মৃতিসৌধ হলো বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা/প্রতিষ্ঠান।

উপরের বিবরণ থেকে বিস্তারিত জানুন। তথ্যবক্স থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজেই পেয়ে যান।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

জাতীয় স্মৃতিসৌধ কী?
উপরের “বিস্তারিত বিবরণ” সেকশনে এই স্থাপনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য লেখা আছে।
অন্যান্য স্থাপনা কোথায় দেখব?
স্থাপনাসমূহ তালিকায় ফিরে গিয়ে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান দেখতে পারবেন।