মহাস্থানগড়

শিবগঞ্জ • বগুড়া • রাজশাহী

৮০
মহাস্থানগড়
মহাস্থানগড়
মহাস্থানগড়
+ ৩ টি

বিস্তারিত বিবরণ

মহাস্থানগড়: ইতিহাস, ঐতিহ্য আর প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এমন অনেক প্রাচীন স্থান আছে, কিন্তু মহাস্থানগড়ের মতো প্রাচীন আর ঐতিহাসিক জায়গা খুব কমই পাওয়া যায়। একসময় এটাকে বলা হতো পুণ্ড্রনগর বা পুণ্ড্রবর্ধন। প্রাচীন বাংলার অন্যতম সমৃদ্ধ রাজধানী ছিল এই শহর। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ বলছে, যিশুর জন্মের প্রায় সাতশো বছর আগেই এখানে জনবসতি গড়ে উঠেছিল। মৌর্য, গুপ্ত, গৌড়, পাল আর সেন—প্রায় সব বড় রাজবংশের সময়েই এটা প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ২০১৬ সালে সার্ক এটাকে সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতিও দিয়েছে।

ভৌগোলিক অবস্থান

মহাস্থানগড় বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত। বগুড়া শহর থেকে উত্তরে প্রায় ১৩ থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে, বগুড়া-রংপুর মহাসড়কের পাশেই পড়ে। পুরোনো করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে বসে আছে এই নগরী। বরেন্দ্র অঞ্চলের লাল মাটিতে গড়া জায়গাটা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৬ মিটার উঁচু। চারপাশের পলিমাটির সমভূমি থেকে ১৫-২০ মিটার উঁচু হওয়ায় প্রাচীনকালেও বন্যা থেকে রক্ষা পেত আর প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা হিসেবেও কাজ করত। ভৌগোলিক অবস্থান ২৪°৫৭′৪০″ উত্তর অক্ষাংশ আর ৮৯°২০′৩৪″ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ।

নামকরণের গল্প

‘মহাস্থান’ নামটা কোথা থেকে এলো, সে নিয়ে অনেক কাহিনি আছে। হিন্দু ধর্মগ্রন্থ স্কন্দপুরাণ অনুসারে, বিষ্ণুর অবতার পরশুরাম এই নিরিবিলি জায়গাটাকে তপস্যার জন্য বেছে নিয়েছিলেন। তপস্যায় সিদ্ধিলাভ করার পর তিনিই নাম দিয়েছিলেন ‘মহাস্থান’। পরে যখন এটা পুণ্ড্র রাজ্যের রাজধানী হয়, তখন পুণ্ড্রনগর বা পুণ্ড্রবর্ধন নামে পরিচিত হয়।

৬৪০ খ্রিস্টাব্দে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ কামরূপ থেকে এখানে এসেছিলেন। তাঁর ভ্রমণ বিবরণীতে করতোয়া নদীকে অনেক প্রশস্ত বলে উল্লেখ করেছেন এবং নাম দিয়েছেন ‘ক-লো-তু’।

ইতিহাসের পাতায় মহাস্থানগড়

মহাস্থানগড় শুধু রাজনৈতিক কেন্দ্রই ছিল না, শিক্ষারও একটা আন্তর্জাতিক কেন্দ্র ছিল। চীন আর তিব্বত থেকে অনেক বৌদ্ধ ভিক্ষু আর গবেষক এখানে পড়তে আসতেন। পরে তাঁরা দক্ষিণ আর পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বৌদ্ধ ধর্মের বাণী ছড়িয়ে দিতেন।

মৌর্য সম্রাট অশোক গৌতম বুদ্ধের স্মরণে এখানে একটা বড় স্তূপ বানিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম হিউয়েন সাঙয়ের বিবরণীর ভিত্তিতে সেই স্তূপটা শনাক্ত করেছিলেন।

সেন আমলের পর ১৪শ শতকে হযরত শাহ সুলতান মাহমুদ বলখী (রহ.) এখানে ধর্ম প্রচার করতে আসেন। কিংবদন্তি আছে, তিনি একটা বিশাল মাছের আকৃতির নৌকায় চড়ে করতোয়া নদী পার হয়ে পুণ্ড্রনগরে প্রবেশ করেছিলেন। সেই থেকে তাঁকে ‘মাহিসাওয়ার’ও বলা হয়।

প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার

মহাস্থানগড়ের গুরুত্ব উন্মোচনে কয়েকজন গবেষকের অবদান অনেক বড়:

  1. ১৮০৮ সালে ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিলটন প্রথম ধ্বংসাবশেষ চিহ্নিত করেন।
  2. ১৮৭৯ সালে স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম প্রমাণ করেন যে এটাই প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধনের রাজধানী।
  3. ১৯৩১ সালের খননে একটা ব্রাহ্মী শিলালিপি পাওয়া যায়। তাতে ‘পুন্ড্রনগথ’ অর্থাৎ পুণ্ড্রনগরের উল্লেখ আছে। আরও বলা আছে—দুর্ভিক্ষপীড়িত প্রজাদের রাজভাণ্ডার থেকে খাদ্য দিতে হবে। এটা মৌর্য আমলের উপস্থিতি স্পষ্ট করে দেয়।

দুর্গ আর নগরের কাঠামো

মহাস্থানগড়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো তার বিশাল প্রাচীরবেষ্টিত দুর্গ। উপর থেকে দেখলে প্রায় আয়তাকার। উত্তর-দক্ষিণে ১.৫২৩ কিলোমিটার আর পূর্ব-পশ্চিমে ১.৩৭১ কিলোমিটার। মোট আয়তন প্রায় ১৮৫ হেক্টর।

চারপাশে ১১ থেকে ১৩ মিটার উঁচু মাটি আর ইটের প্রাচীর ছিল। প্রবেশের জন্য কয়েকটা সুরক্ষিত তোরণ ছিল—উত্তরে কাটা দুয়ার, পূর্বে দোরাব শাহ তোরণ, দক্ষিণে বুড়ির ফটক আর পশ্চিমে তাম্র দরজা।

দুর্গের ভেতরে অনেক পুরাকীর্তির ধ্বংসাবশেষ আছে। এর মধ্যে জিয়ৎ কুণ্ড, মানকালীর ধাপ, পরশুরামের প্রাসাদ, বৈরাগীর ভিটা, খোদার পাথর ভিটা আর মুনির ঘোন অন্যতম।

খননকাজ আর সাতটি যুগ

১৯২৮-২৯ সালে কে. এন. দীক্ষিতের নেতৃত্বে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক খনন শুরু হয়। পরে ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ-ফ্রান্স যৌথ দল ১৮টা স্তর আর সাতটা প্রধান যুগ চিহ্নিত করে:

১. প্রাক-মৌর্য পর্ব — খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতকের উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র, মাটির ঘর, উনুন আর প্রাচীন টালি। ২. মৌর্য পর্ব — ব্রোঞ্জের প্রদীপ, রূপার ছাঁচঢালা মুদ্রা, পোড়ামাটির ফলকচিত্র আর ব্রোঞ্জের আয়না। ৩. শুঙ্গ-কুষাণ পর্ব — ইটের স্থাপত্য, সুর্মা লাগানোর দণ্ড, ছাপাঙ্কিত রৌপ্য মুদ্রা আর পোড়ামাটির মন্দিরের চূড়া। ৪. কুষাণ-গুপ্ত পর্ব — নকশা করা হাতলওয়ালা পাত্র, পোড়ামাটির সিলমোহর, গ্লাস আর পাথরের পুঁতি। ৫. গুপ্ত ও গুপ্তোত্তর পর্ব — গোবিন্দ ভিটার বিশাল ইটের কাঠামো, শহরের রাস্তা আর উন্নত ইটের ঘরবাড়ি (৩৬১–৫৯৪ খ্রিস্টাব্দ)। ৬. পাল পর্ব — সবচেয়ে সমৃদ্ধ সময়। দুর্গের ভেতরে-বাইরে অনেক বৌদ্ধ বিহার, আশ্রম আর মন্দির তৈরি হয়। ৭. মুসলিম পর্ব — মানকালীর কুণ্ডের কাছে ১৫ গম্বুজবিশিষ্ট সুফি আমলের মসজিদ আর সুলতানি-মুঘল যুগের রঙিন মৃৎপাত্র।

দেখার মতো জায়গাগুলো

দুর্গের ভেতরে-বাইরে প্রায় শতাধিক ঢিবি আর পুরাকীর্তি ছড়িয়ে আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

  1. শাহ সুলতান বলখী (রহ.)-এর মাজার — দুর্গের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে।
  2. গোবিন্দ ভিটা — উত্তর-পূর্ব কোণে করতোয়া নদীর তীরে মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ।
  3. গোকুল মেধ — মূল গড় থেকে ৩ কিলোমিটার দক্ষিণে। লোকমুখে বেহুলা-লখিন্দরের বাসরঘর নামে পরিচিত।
  4. ভাসু বিহার — তোতারাম পণ্ডিতের ধাপের কাছে প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ।
  5. মহাস্থানগড় প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর — এখানে খননে পাওয়া স্বর্ণ, রূপা, কালো পাথরের মূর্তি, অলঙ্কৃত ইট, মুদ্রা আর শিলালিপি রাখা আছে।

মহাস্থানগড় শুধু মাটির ঢিবি বা ভাঙা প্রাচীরের স্তূপ নয়। এটা দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন নগরায়ণ আর বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস-সংস্কৃতির জীবন্ত সাক্ষী। প্রতিটা শিলালিপি, পুরোনো ইট আর মৃৎপাত্র ইতিহাসের উত্থান-পতনের গল্প বলে। এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটাকে সংরক্ষণ করা আর এর গল্প ছড়িয়ে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব—যাতে আগামী প্রজন্মও বাংলার গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে চিনতে পারে।


স্থাপনা তালিকায় ফিরে যান

মহাস্থানগড় সম্পর্কে

মহাস্থানগড় হলো বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা/প্রতিষ্ঠান।

উপরের বিবরণ থেকে বিস্তারিত জানুন। তথ্যবক্স থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজেই পেয়ে যান।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

মহাস্থানগড় কী?
উপরের “বিস্তারিত বিবরণ” সেকশনে এই স্থাপনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য লেখা আছে।
অন্যান্য স্থাপনা কোথায় দেখব?
স্থাপনাসমূহ তালিকায় ফিরে গিয়ে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান দেখতে পারবেন।