নভোথিয়েটার

তেজগাঁও • ঢাকা জেলা • ঢাকা

৭৩
নভোথিয়েটার
নভোথিয়েটার
নভোথিয়েটার
+ ১ টি

বিস্তারিত বিবরণ

নভোথিয়েটার, ঢাকা:

বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠন এবং মহাকাশ বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্বগুলোকে সাধারণ মানুষ ও নতুন প্রজন্মের কাছে সহজ-সরল ও আনন্দদায়কভাবে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে গড়ে উঠেছে নভোথিয়েটার, ঢাকা। একসময় এটাকে ‘ভাসানী নভো থিয়েটার’ এবং পরে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার’ নামে ডাকা হলেও ২০২৫ সালে পুনর্নামকরণের মাধ্যমে এটি আবার ‘নভোথিয়েটার’ নামেই আত্মপ্রকাশ করে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সার্বিক পরিচালনায় চলা এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, বরং বাংলাদেশের মহাকাশ বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণার এক অনন্য প্রতীক।

ঢাকার প্রাণকেন্দ্র বিজয় সরণিতে ৫.৪ একর সুবিশাল প্রাঙ্গণ জুড়ে এই স্থাপত্যটি গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে ডোম প্রজেকশন, থ্রি-ডি ফিল্ম, রাইড সিমুলেটর এবং কৃত্রিম তারা মণ্ডলের প্রদর্শনীর মাধ্যমে মহাবিশ্বের সৃষ্টি, গ্রহ-নক্ষত্রের গতিপথ আর গ্যালাক্সির রহস্যকে চোখের সামনে জীবন্ত করে তোলা হয়।

ইতিহাস ও বিকাশ

বাংলাদেশে একটা পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক নভোথিয়েটার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা মূলত গত শতকের নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে গৃহীত হয়। এটি বাস্তবায়নে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রকৌশলীদের যৌথ সমন্বয় ঘটে।

১৯৯৫ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপপ্রধান স্থপতি আলী ইমাম নভোথিয়েটারের প্রাথমিক নকশা প্রণয়ন করেন। ১৯৯৭ সালের ১৭ মার্চ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)-এর বৈঠকে নকশাটি অনুমোদন লাভ করে।

১৭ জুলাই ২০০০ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়। শুরুতে আগারগাঁওয়ে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের পাশে এটি বানানোর কথা থাকলেও পরে বিজয় সরণির বর্তমান স্থানে ৫.৪ একর জমি নির্ধারণ করা হয়।

২০০২ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশী নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ‘মাসুদ অ্যান্ড কোম্পানি’ মূল অবকাঠামো তৈরি করে। বুয়েটের অধ্যাপক আলমগীর হাবিবের নেতৃত্বাধীন উপদেষ্টা কমিটি পুরো কাজ তদারকি করে। জাপানের বিশ্বখ্যাত ‘অপটিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি’ থিয়েটারের সব জটিল কারিগরি যন্ত্রাংশ ও ডোম প্রজেক্টর স্থাপন সম্পন্ন করে।

প্রায় ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই আধুনিক নভোথিয়েটারটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় ২৫ সেপ্টেম্বর ২০০৪ সালে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া উদ্বোধন করেন।

২০ মার্চ ২০২৫ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির নাম সংক্ষেপ ও সংশোধন করে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নভোথিয়েটার’ নামে রূপান্তর করে।

স্থাপত্যশৈলী ও নকশার বৈশিষ্ট্য

নভোথিয়েটারের মূল ভবনের নকশায় প্রাচীন ক্লাসিক্যাল বা ধ্রুপদী স্থাপত্যের সঙ্গে অত্যাধুনিক পাশ্চাত্য নির্মাণশৈলীর এক দৃষ্টিনন্দন সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। স্থপতি আলী ইমাম জ্যোতির্বিজ্ঞানের গাণিতিক সংকেতকে দৃশ্যমান রূপ দিয়েছেন এর বাহ্যিক কাঠামোতে।

রোমান কলাম ও গাণিতিক প্রতীক

জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণায় ‘সাত’ (৭) সংখ্যাটির এক বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে—যেমন সপ্তর্ষীমণ্ডল (Big Dipper)-এর সাতটি তারা। এই ঐতিহাসিক ধারণাকে সম্মান জানিয়ে মূল ভবনের প্রবেশদ্বারের দুই পাশে ৭টি করে মোট ১৪টি ফ্রি হাইট রোমান কলাম নির্মাণ করা হয়েছে। ৪০ ফুট উঁচু এই সুউচ্চ স্তম্ভগুলো ভবনের স্বাভাবিক সৌন্দর্য বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে।

মূল ডোম ও ভবন বিন্যাস

নভোথিয়েটার ভবনটি মোট পাঁচটি তলায় বিভক্ত—মাটির নিচে তিনটি তলা এবং মাটির উপরে দুইটি তলা। ভবনের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বিশালাকার ডোম বা গম্বুজটির ব্যাসার্ধ ৩২ মিটার। মাটির ওপর থেকে হিসাব করলে এর উচ্চতা প্রায় পাঁচতলা ভবনের সমতুল্য। এই ডোমের ভেতরের দেয়ালে প্রজেক্টরের সাহায্যে কৃত্রিম আকাশ ও তারা ফুটিয়ে তোলা হয়।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন দর্শনার্থীদের জন্য পূর্ব দিকে আলাদা ঢালু সিঁড়ি (Ramp) রয়েছে। এছাড়া ভূগর্ভস্থ তলাগুলোতে পৃথিবীর বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জীবনপঞ্জি, ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির রেপ্লিকা এবং দুর্লভ আলোকচিত্র প্রদর্শনী আছে।

অভ্যন্তরীণ সুবিধাসমূহ ও মূল আকর্ষণ

নভোথিয়েটারে দর্শনার্থী এবং শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার জন্য নানা ধরনের আধুনিক ডিজিটাল ও অ্যানালগ প্রদর্শনীর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে:

  1. স্পেস থিয়েটার (Space Theatre): এটি নভোথিয়েটারের প্রধান আকর্ষণ। ২৭৫টি আরামদায়ক হেলে-পড়া (Reclining) আসন সংবলিত এই থিয়েটারে ডোমের ওপর মহাবিশ্বের সৃষ্টি, গ্রহ-উপগ্রহের গতিবিধি এবং নক্ষত্রমণ্ডলের বিবর্তন প্রদর্শিত হয়। প্রজেক্টরের আলোয় দর্শনার্থীদের মনে হয় তাঁরা যেন খোলা আকাশের নিচে বসে সত্যি সত্যি মহাশূন্যের বুক চিরে ভেসে বেড়াচ্ছেন।
  2. রাইড সিমুলেটর (Ride Simulator): ৩০ আসনবিশিষ্ট একটা অত্যাধুনিক স্পেস রাইড সিমুলেটর রয়েছে। এতে আসনগুলো প্রজেকশনের দৃশ্য ও শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দোলে, যা দর্শনার্থীকে সরাসরি রকেট বা স্পেসশিপে চড়ে মহাকাশ ভ্রমণের অনুভূতি দেয়।
  3. স্মার্ট থ্রি-ডি প্রজেকশন ও ডিজিটাল প্ল্যানেটোরিয়াম: এখানে বিভিন্ন থ্রি-ডি শিক্ষামূলক অ্যানিমেশন ও ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী করা হয়, যা বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
  4. সম্মেলন কক্ষ ও সেমিনার হল: নভোথিয়েটারের ভেতরে স্লাইড প্রজেকশন ও আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম সংবলিত ডিজিটাল কনফারেন্স রুম রয়েছে, যেখানে বৈজ্ঞানিক সেমিনার, কর্মশালা ও সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হয়।
  5. সৌরপর্যবেক্ষণ ও টেলিস্কোপ ব্যবস্থা: দর্শনার্থীদের জন্য শক্তিশালী টেলিস্কোপের মাধ্যমে রাতের মেঘমুক্ত আকাশে চাঁদ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি বা শনির মতো গ্রহ ও উপগ্রহ সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগও দেওয়া হয়ে থাকে।


স্থাপনা তালিকায় ফিরে যান

নভোথিয়েটার সম্পর্কে

নভোথিয়েটার হলো বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা/প্রতিষ্ঠান।

উপরের বিবরণ থেকে বিস্তারিত জানুন। তথ্যবক্স থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজেই পেয়ে যান।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

নভোথিয়েটার কী?
উপরের “বিস্তারিত বিবরণ” সেকশনে এই স্থাপনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য লেখা আছে।
অন্যান্য স্থাপনা কোথায় দেখব?
স্থাপনাসমূহ তালিকায় ফিরে গিয়ে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান দেখতে পারবেন।