পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার
বদলগাছী • নওগাঁ • রাজশাহী



বিস্তারিত বিবরণ
পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার - সোমপুর মহাবিহার: ইতিহাস, স্থাপত্য
বাংলাদেশের নওগাঁ জেলায় অবস্থিত পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার—যার আসল নাম সোমপুর মহাবিহার—দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন বৌদ্ধ মহাবিহারগুলোর মধ্যে অন্যতম। পাল রাজবংশের স্বর্ণযুগের স্থাপত্য আর সংস্কৃতির এক অসাধারণ নিদর্শন এটা। অষ্টম শতকের শেষ দিকে তৈরি হওয়া এই বিহার প্রায় তিনশো বছর ধরে ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়াও চীন, তিব্বত, মায়ানমার, ইন্দোনেশিয়া আর কম্বোডিয়ার বৌদ্ধ ভিক্ষু ও পণ্ডিতদের প্রধান শিক্ষা ও সাধনার কেন্দ্র ছিল। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আর দক্ষিণ হিমালয় অঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিহার হওয়ার কারণে ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
কোথায় অবস্থিত
পাহাড়পুর বরেন্দ্র অঞ্চলের লালচে মাটির প্লাবন সমভূমিতে বসে আছে। বিস্তারিতভাবে বললে—
- অবস্থান: পাহাড়পুর গ্রাম, বদলগাছী উপজেলা, নওগাঁ জেলা, রাজশাহী বিভাগ।
- স্থানাঙ্ক: ২৫.০৩১১° উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮.৯৭৭৩° পূর্ব দ্রাঘিমাংশ।
- আশপাশ: প্রাচীন পুণ্ড্রনগর (মহাস্থানগড়) আর কোটিবর্ষ (বানগড়)-এর মাঝামাঝি এলাকায় এর অবস্থান। জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে।
- আয়তন: মূল বিহার প্রাঙ্গণ প্রায় ১০ হেক্টর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত।
স্থানীয় মানুষ আগে কেন্দ্রীয় উঁচু ঢিবিটাকে ‘গোপাল চিতার পাহাড়’ বলত। সেই পাহাড়ের মতো উচ্চতার কারণেই জায়গাটার নাম হয়েছে পাহাড়পুর। যদিও ইতিহাসে এর নাম ছিল সোমপুর মহাবিহার।
ইতিহাস ও বিকাশ
প্রতিষ্ঠা ও সোনালী যুগ (৮ম-৯ম শতক)
পাল রাজবংশের দ্বিতীয় ও সবচেয়ে শক্তিশালী রাজা ধর্মপাল (৭৮১–৮২১ খ্রিষ্টাব্দ) অষ্টম শতকের শেষ দিকে বা নবম শতকের শুরুতে এই বিশাল বিহার তৈরি করেন। তিব্বতীয় ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, তাঁর ছেলে রাজা দেবপালও (৮১০–৮৫০ খ্রিষ্টাব্দ) নির্মাণকাজ ও উঁচু মন্দির গঠনে বড় ভূমিকা রাখেন। দশম শতকে বিখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান এই বিহারের প্রধান আচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
অবক্ষয় ও পতন (১০ম-১৩শ শতক)
নবম শতকের শেষ দিকে গুর্জর-প্রতীহারদের আক্রমণে এবং একাদশ শতকে কৈবর্ত সামন্ত ও চেদীরাজ কর্ণের আক্রমণে বিহারটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে পাল রাজা প্রথম মহীপাল (৯৯৫–১০৪৩ খ্রিষ্টাব্দ) এটাকে আবার মেরামত ও সংস্কার করেন। কিন্তু সেন রাজাদের আমলে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ হয়ে যায়। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দের পর তুর্কি সেনাপতি মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয় আর স্থানীয় রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ভিক্ষুরা বিহার ছেড়ে চলে যান। ধীরে ধীরে এটা ধসে গিয়ে মাটির নিচে চাপা পড়ে।
প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের গল্প
- ১৮০৭–১৮১২ সালে বুকানন হ্যামিল্টন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জরিপকাজে প্রথম স্থানটি পরিদর্শন করেন।
- ১৮৭৯ সালে স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম ঢিবির উপরের অংশ খনন করে চতুর্ভূজাকৃতির ঘরের সন্ধান পান এবং একে ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরেন।
- বলিহারের জমিদারের বাধার কারণে কানিংহামের খননকাজ বাধাগ্রস্ত হয়। ১৯১৯ সালে এটাকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা করা হয়। ১৯২৩ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বরেন্দ্র গবেষণা পরিষদ আর ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের পক্ষে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও কাশিনাথ দীক্ষিতের নেতৃত্বে পূর্ণাঙ্গ খনন হয়। তখনই পুরো বিহার, কেন্দ্রীয় মন্দির আর পোড়ামাটির ফলকচিত্রগুলো আবিষ্কৃত হয়।
স্থাপত্য ও অবকাঠামো
সোমপুর মহাবিহারের নকশা অত্যন্ত নিখুঁত ও পরিকল্পিত। প্রাচীন ভারতের ‘মণ্ডলা’ নকশার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
মূল বিহার (ভিক্ষুদের আবাসন)
চারদিকে চওড়া প্রাচীরবেষ্টিত চতুষ্কোণাকার নকশা। উত্তর ও দক্ষিণ বাহু ২৭৩.৭ মিটার, পূর্ব ও পশ্চিম বাহু ২৭৪.১৫ মিটার লম্বা। চারপাশের দেয়াল ঘেঁষে মোট ১৭৭টি ভিক্ষু কক্ষ আছে—উত্তরে ৪৫টি, আর পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণে ৪৪টি করে। পরবর্তীতে ৯২টি কক্ষে মূর্তি ও বেদীর সন্ধান পাওয়া যায়, যা বোঝায় যে অনেক কক্ষ পরে প্রার্থনাকক্ষে রূপান্তরিত হয়েছিল। উত্তর বাহুর ঠিক মাঝখানে বিশাল ও সুসজ্জিত প্রধান ফটক রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ক্রুশাকার মন্দির
বিহারের ঠিক মাঝখানে বিশাল এক ক্রুশাকার মন্দির দাঁড়িয়ে আছে। এখন এর উচ্চতা ২১ মিটার, কিন্তু আগে কমপক্ষে ৩০ মিটার (প্রায় ১০০ ফুট) উঁচু ছিল। মন্দিরের কেন্দ্রে কোনো দরজা-জানালাহীন একটা বড় ফাঁপা বর্গাকার প্রকোষ্ঠ আছে, যা উঁচু কাঠামোকে স্থিতিশীল রাখার জন্য তৈরি। মন্দিরের বাইরের দেয়ালে হাজারেরও বেশি পোড়ামাটির ফলক আর ৬৩টি কুলুঙ্গিতে পাথরের ভাস্কর্য রয়েছে। এগুলোতে তৎকালীন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, দেব-দেবী, পশুপাখি আর রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি খোদাই করা আছে।
উন্মুক্ত অঙ্গন ও সংলগ্ন স্থাপনা
কেন্দ্রীয় চত্বরে ভোজনশালা, রান্নাঘর, ইট বাঁধানো লম্বা নর্দমা, পাকা কূপ আর ১৬-কোণবিশিষ্ট নক্ষত্র আকৃতির নিবেদন স্তূপ আছে। সীমানা প্রাচীরের বাইরে দক্ষিণে পথসংযুক্ত স্নানাগার ও শৌচাগার রয়েছে। একটু দূরে একটা প্রাচীন স্নানঘাট আর মুসলমান যুগের শুরুর দিকের ‘গন্ধেশ্বরী মন্দির’ও আছে।
প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
পাহাড়পুর শুধু একটা ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক জায়গা নয়। এটা প্রাচীন বাংলার জ্ঞান-বিজ্ঞান, স্থাপত্য আর চারুকলার উৎকর্ষের প্রতীক।
- শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা: তৎকালীন বিশ্বের আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কাজ করেছে। চীন আর তিব্বত থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে পড়তে আসত।
- স্থাপত্যের নতুন ধারা: পাহাড়পুরের ক্রুশাকার মন্দিরের রীতি পরবর্তীতে মিয়ানমারের পাগান আর ইন্দোনেশিয়ার বরোবুদুরসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
- শিল্পকলা: এখানকার টেরাকোটা বা পোড়ামাটির ভাস্কর্যগুলো তৎকালীন লোকশিল্প আর সাধারণ মানুষের জীবনের জীবন্ত ছবি তুলে ধরে।
পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার বা সোমপুর মহাবিহার বাঙালি জাতির অন্যতম বড় প্রাচীন ঐতিহাসিক গৌরব। শত শত বছরের অবহেলা আর প্রকৃতির আঘাত সহ্য করেও টিকে থাকা এই পুরাকীর্তি আমাদের স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রাচীনতার স্বাক্ষর বহন করে। এই বিশ্ব ঐতিহ্যকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা এবং আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরা আমাদের সবার দায়িত্ব।
পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার সম্পর্কে
পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার হলো বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা/প্রতিষ্ঠান।
উপরের বিবরণ থেকে বিস্তারিত জানুন। তথ্যবক্স থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজেই পেয়ে যান।