তারা মসজিদ

ঢাকা জেলা • ঢাকা

৩২
তারা মসজিদ
তারা মসজিদ
তারা মসজিদ

বিস্তারিত বিবরণ

তারা মসজিদ: পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী তারা খচিত মোঘল স্থাপত্যকর্ম

তারা মসজিদ (Sitaron Ki Masjid) বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় আবুল খয়রাত সড়কে অবস্থিত একটি অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক ও নান্দনিক স্থাপনা। সাদা মার্বেল পাথরের ওপর নীলরঙা তারায় খচিত চমৎকার চিনিকানির (চিনি-টিকরি) শিল্পকর্ম এবং সুউচ্চ গম্বুজের কারণে এই মসজিদটি সারা বিশ্বে 'তারা মসজিদ' নামে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছে।

আঠারো শতকের গোড়ার দিকে নির্মিত এই ঐতিহাসিক উপাসনালয়টি মোঘল স্থাপত্যরীতির সাথে স্থানিক আলংকারিক শিল্পের অপূর্ব সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি কেবল ধার্মিক মুসলমানদের প্রার্থনাস্থল হিসেবেই নয়, বরং পুরান ঢাকার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং ইসলামিক স্থাপত্যকলা দর্শনের এক অনবদ্য কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে টিকে রয়েছে।

প্রতিষ্ঠা ও সংস্কারের ইতিহাস

তারা মসজিদের নির্মাণ এবং বর্তমান দৃষ্টিনন্দন অবয়ব লাভের পেছনে দীর্ঘ সময়ের বিবর্তন ও একাধিক সংস্কার প্রক্রিয়া যুক্ত রয়েছে:


মির্জা গোলাম পীর কর্তৃক নির্মাণ

আঠারো শতকের প্রথমার্ধ

ঢাকার ধনাঢ্য জমিদার মির্জা গোলাম পীর (মির্জা আহমদ জান) আরমানিটোলায় (তৎকালীন 'মহল্লা আলে আবু সাঈয়ীদ') প্রথম এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। সে সময় এটি স্থানীয়দের কাছে 'মির্জা সাহেবের মসজিদ' নামে পরিচিত ছিল।


প্রথম বড় সংস্কার ও চিনি-টিকরি অলংকরণ

১৮৬০ - ১৯২৬

১৮৬০ সালে মির্জা গোলাম পীরের মৃত্যুর পর মসজিদটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। ১৯২৬ সালে ঢাকার প্রখ্যাত স্থানীয় ব্যবসায়ী আলী জান বেপারী মসজিদটির ব্যাপক সংস্কার ও সম্প্রসারণ করেন। তিনি জাপান থেকে আনা রঙিন মার্বেল ও কাচের টুকরো (চিনি-টিকরি/চিনিকানি শিল্প) ব্যবহার করে মসজিদের দেয়ালে তারার মোজাইক নকশা যুক্ত করেন।


পাঁচ গম্বুজে সম্প্রসারণ

১৯৮৭

সরকারি উদ্যোগে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে স্থান সংকুলান ও বর্ধিত মুসল্লিদের সুবিধার জন্য মসজিদটিকে তিন গম্বুজ থেকে সম্প্রসারিত করে পাঁচ গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদে রূপান্তর করা হয়।


ঐতিহাসিক স্মারক ও পর্যটন কেন্দ্র

বর্তমান (২০২৬)

বর্তমানে মসজিদটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত একটি সংরক্ষিত ঐতিহাসিক স্মারক এবং পুরান ঢাকার অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ।

স্থাপত্যশৈলী ও অবকাঠামোগত বৈশিষ্ট্য

তারা মসজিদের স্থাপত্যরীতিতে দিল্লি, আগ্রা ও লাহোরের সতেরো শতকের মোঘল স্থাপত্যের স্পষ্ট ছাপ পরিলক্ষিত হয়:

  1. আকার ও আয়তন: প্রারম্ভিক অবস্থায় মির্জা গোলাম পীরের সময় এটি ছিল তিন গম্বুজবিশিষ্ট ক্ষুদ্রকার মসজিদ (দৈর্ঘ্য ৩৩ ফুট ও প্রস্থ ১২ ফুট)। পরবর্তীতে ১৯২৬ সালের বারান্দা সংযোজন এবং ১৯৮৭ সালের সম্প্রসারণের পর বর্তমান মসজিদটির দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে ৭০ ফুট (২১.৩৪ মিটার) এবং প্রস্থ ২৬ ফুট (৭.৯৮ মিটার)।
  2. গম্বুজ ও মিনারসমূহ: মসজিদে বর্তমানে মোট ৫টি সুবিশাল গম্বুজ এবং কোণগুলোতে ৪টি সুউচ্চ কোণার মিনার (Corner Towers) রয়েছে। কেন্দ্রীয় গম্বুজটি আকারে সবচেয়ে বড় এবং সাদা মার্বেল পাথরের ওপর নীল রঙের তারা দিয়ে সুশোভিত।
  3. চিনিকানি/চিনি-টিকরি মোজাইক শিল্প: মসজিদের বহিরাঙ্গন এবং অভ্যন্তরভাগের দেয়ালে সাদা প্লাস্টারের ওপর অসংখ্য রঙিন কাচ, সিরামিক এবং মার্বেল পাথরের ছোট ছোট টুকরো দিয়ে তারা, ফুল ও ফুলদানির নিখুঁত মোজাইক কারুকাজ করা হয়েছে। এই বিশেষ রীতির অলংকরণকে 'চিনিকানি শিল্প' বা 'চিনি-টিকরি' বলা হয়।
  4. মেহরাব ও খিলান: মূল প্রার্থনা কক্ষে প্রবেশের জন্য সুদৃশ্য খিলানযুক্ত একাধিক পথ রয়েছে। ভেতরে একাধিক কারুকার্যময় মেহরাব রয়েছে, যা ঐতিহ্যবাহী মোঘল নকশায় তৈরি।

সাংস্কৃতিক গুরুত্ব ও ঐতিহ্য

তারা মসজিদ কেবল একটি ধর্মীয় কেন্দ্র নয়, বরং পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত:

  1. বাংলাদেশের মুদ্রায় অবস্থান: এর অনন্য ইতিহাস ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ পূর্বে বাংলাদেশের ১০০ টাকার নোটে তারা মসজিদের ছবি মুদ্রিত ছিল।
  2. পর্যটন কেন্দ্র: প্রতিদিন দেশ-বিদেশের অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক, স্থপতি ও পর্যটক এই ঐতিহাসিক মোঘল স্থাপত্যের অনন্য অলংকরণ দেখতে আরমানিটোলায় আগমন করেন।


স্থাপনা তালিকায় ফিরে যান

তারা মসজিদ সম্পর্কে

তারা মসজিদ হলো বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা/প্রতিষ্ঠান।

উপরের বিবরণ থেকে বিস্তারিত জানুন। তথ্যবক্স থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজেই পেয়ে যান।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

তারা মসজিদ কী?
উপরের “বিস্তারিত বিবরণ” সেকশনে এই স্থাপনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য লেখা আছে।
অন্যান্য স্থাপনা কোথায় দেখব?
স্থাপনাসমূহ তালিকায় ফিরে গিয়ে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান দেখতে পারবেন।