উত্তরা গণভবন দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি
নাটোর সদর উপজেলা • নাটোর • রাজশাহী



বিস্তারিত বিবরণ
উত্তরা গণভবন দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি: ইতিহাস, স্থাপত্য
বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থাপত্যের মধ্যে নাটোরের উত্তরা গণভবন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। একসময় এটা দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি নামে পরিচিত ছিল। আঠারো শতকে তৈরি হওয়া এই সুন্দর প্রাসাদটি দিঘাপতিয়া মহারাজাদের বাসভবন ও প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল। স্বাধীনতার পর এটা গণভবন এবং বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। মুঘল আর ইউরোপীয় মিশ্র স্থাপত্যশৈলী, পরিখাবেষ্টিত বিশাল চত্বর, দুর্লভ গাছপালা আর রাজকীয় প্রত্নসামগ্রীর সমৃদ্ধ সংগ্রহের কারণে উত্তরা গণভবন বাংলাদেশের ইতিহাস ও পর্যটনের এক অনন্য সম্পদ হয়ে উঠেছে।
অবস্থান ও প্রাথমিক পরিচিতি
উত্তরা গণভবন নাটোর জেলার অন্যতম প্রধান প্রশাসনিক ও ঐতিহাসিক কেন্দ্র।
- অবস্থান: নাটোর জেলা সদর, নাটোর, রাজশাহী বিভাগ।
- দূরত্ব: নাটোর শহর থেকে প্রায় ২.৪ কিলোমিটার উত্তরে দিঘাপতিয়া নামক স্থানে অবস্থিত।
- আয়তন: পরিখা ও প্রাচীরসহ পুরো কমপ্লেক্স প্রায় ৪১.৫০ থেকে ৪৩ একর জমির ওপর বিস্তৃত।
- স্থাপত্যরীতি: ইন্দো-আরবীয় (Indo-Saracenic) ও পশ্চিমা/ইউরোপীয় স্থাপত্যের অপূর্ব মিশ্রণ।
- প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ: বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের আওতায় এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নাটোর জেলা প্রশাসনের ওপর ন্যস্ত।
ইতিহাস ও বিকাশ
রাজবংশের গোড়াপত্তন ও প্রাথমিক নির্মাণ (১৭৩৪)
দিঘাপতিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রাজা দয়ারাম রায় (১৬৮০–১৭৬০)। তিনি নাটোর রাজপরিবারের রাজা রামজীবনের বিশ্বস্ত দেওয়ান ছিলেন। ১৭৩৪ সালে তিনি দিঘাপতিয়ায় মূল প্রাসাদ ও আনুষঙ্গিক ভবনগুলোর নির্মাণকাজ শুরু করেন।
১৮৯৭ সালের ভূমিকম্প ও পুনর্নির্মাণ
১৮৯৭ সালের ১০ জুন দিঘাপতিয়ার ৬ষ্ঠ রাজা প্রমদানাথ রায়ের আমলে নাটোরের ডোমপাড়া মাঠে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের অধিবেশন হয়। সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু মাত্র দুদিন পর, ১২ জুনের প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে রাজপ্রাসাদটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর রাজা প্রমদানাথ রায় ১৮৯৭ থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত প্রায় এগারো বছর ধরে দেশি-বিদেশি প্রকৌশলী, কারিগর ও চিত্রশিল্পীদের সহায়তায় সাড়ে ৪১ একর জমির ওপর নতুন করে পুরো প্রাসাদ কমপ্লেক্সটি পুনর্নির্মাণ করেন।
দেশবিভাগ ও সরকারি মালিকানা
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর দিঘাপতিয়ার রাজপরিবার ভারতে চলে যান। ১৯৫০ সালে জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন পাস হলে প্রাসাদের মালিকানা সরকারের হাতে চলে আসে।
নামকরণ ও রাজনৈতিক গুরুত্ব
দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকার পর ১৯৬৭ সালের ২৪ জুলাই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান ভবনটিকে ‘গভর্নরের বাসভবন’ হিসেবে উদ্বোধন করেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এর নাম পরিবর্তন করে ‘উত্তরা গণভবন’ রাখেন। একই দিনে তিনি এই প্রাসাদের ভেতরে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ঢাকার বাইরের আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভা (Cabinet Meeting) আহ্বান করেন। এ ঘটনা ভবনটিকে রাষ্ট্রীয় ও ঐতিহাসিক মর্যাদা এনে দেয়।
প্রাসাদ কমপ্লেক্স ও স্থাপত্য
উত্তরা গণভবন এলাকায় প্রধান প্রাসাদসহ ছোট-বড় মোট ১২টি ভবন আছে। পুরো এলাকা সুউচ্চ প্রাচীর ও একটা প্রশস্ত পরিখা দিয়ে ঘেরা।
প্রধান প্রবেশদ্বার ও ঘড়ি টাওয়ার
প্রাসাদের পূর্ব দিকে একটা ৪-তলাবিশিষ্ট পিরামিডাকৃতির বিশাল রাজকীয় প্রবেশদ্বার রয়েছে। ওপরের দিকে ক্রমশ সরু হয়ে এটা একটা বড় ঘড়িওয়ালা টাওয়ারে পরিণত হয়েছে। ঘড়ির মেকানিজম আর সারিবদ্ধ খিলানপথ প্রবেশদ্বারটাকে একটা রাজকীয় গাম্ভীর্য দিয়েছে।
মূল প্রাসাদ ভবন
মূল রাজপ্রাসাদ একতলা এবং ইংরেজি ‘E’ অক্ষরের আদলে তৈরি। ভেতরে আছে একটা সুবিশাল অভ্যর্থনা হল, একটা ডাইনিং হল, একটা সম্মেলন কক্ষ আর নয়টা শয়নকক্ষ। হলের কেন্দ্রে ৭.৬২ মিটার উঁচু একটা বিশাল গম্বুজ আছে, যার নিচ দিয়ে প্রাকৃতিক আলো-বাতাস চলাচল করে। হলরুমে কারুকার্যময় রাজকীয় সোফা ও বিশাল আয়না রয়েছে—যেখানে বসলে চারপাশের প্রত্যেককে স্পষ্ট দেখা যায়। এছাড়া রাজার খাট ও রাজসিংহাসনও সংরক্ষিত আছে।
কুমার প্যালেস ও অন্যান্য ভবন
মূল ভবনের দক্ষিণে অবস্থিত কুমার প্যালেস একটা নান্দনিক দ্বিতল ভবন। ওপরের তলায় চারটা শয়নকক্ষ ও ড্রেসিং রুম, নিচতলায় একাধিক কক্ষ আছে। অন্যান্য স্থাপনার মধ্যে রয়েছে খাজাঞ্চিখানা (কোষাগার), ম্যানেজার অফিস, তিনটা কর্তারাণী বাড়ি, রান্নাঘর, আস্তাবল, মোটর গ্যারেজ, স্টাফ কোয়ার্টার আর নিরাপত্তা চৌকি।
পরিবেশ ও প্রকৃতি
উত্তরা গণভবন শুধু ইটের স্থাপত্য নয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর বিরল উদ্ভিদেরও এক অপূর্ব নিদর্শন।
প্রাসাদের দক্ষিণ ব্লকের সামনে সুদৃশ্য ইতালীয় বাগান আছে। এখানকার নান্দনিক আসবাব, মার্বেল পাথরের ভাস্কর্য ও বেঞ্চ ইতালি ও কলকাতা থেকে আনা হয়েছিল। বাগানের কোণে ছিপ হাতে কালো মার্বেলের নারী ভাস্কর্যটি অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
চত্বরের ভেতরে গোলপুকুর, পদ্মপুকুর, শ্যামসাগর, কাছারিপুকুর, কালীপুকুর ও কেষ্টজির পুকুর—এই ছয়টা দীঘি/পুকুর আর চারপাশে শানবাঁধানো প্রশস্ত পরিখা রয়েছে।
প্রাঙ্গণে প্রচুর প্রাচীন ও দুর্লভ ভেষজ ও ফুলগাছ আছে। ঢাকার জাতীয় স্মৃতিসৌধের সৌন্দর্যবর্ধনে ব্যবহৃত ‘ব্রাউনিয়া’ ও ‘ককেসিয়া’ গাছ এখান থেকেই নেওয়া হয়েছিল। এছাড়া রাজ-অশোক, পারিজাত, কপূর, যষ্টিমধু, মাধবীলতা, নীলমণিলতা, চন্দন ও হৈমন্তীর মতো ঐতিহাসিক বৃক্ষ এখানে বিদ্যমান।
উত্তরা গণভবন সংগ্রহশালা
দিঘাপতিয়া রাজপরিবারের স্মৃতি রক্ষার্থে ২০১৮ সালের ৯ মার্চ পুরাতন ট্রেজারি ভবনে ‘উত্তরা গণভবন সংগ্রহশালা’ স্থাপন করা হয়।
এখানে রাজপরিবারের ব্যবহৃত মার্বেল পাথরের বাথটাব, রাজসিংহাসন, রাজার মুকুট, গাউন, রাজকীয় পালঙ্ক, ঘূর্ণায়মান চেয়ার, ড্রেসিং টেবিল ও পিতলের গোলাপজলদানি সংরক্ষিত আছে। চিনা মাটির ডিনার সেট, কাচের জার, মার্বেলের থালা-বাটি এবং রকমারি আকৃতির রাজকীয় টেবিলও প্রদর্শিত হচ্ছে।
রাজকুমারী ও লেখিকা ইন্দুপ্রভা চৌধুরাণীর স্মরণে একটা কক্ষ উৎসর্গ করা হয়েছে। সেখানে তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরি, পাণ্ডুলিপি, স্বামী মহেন্দ্রনাথ চৌধুরীর চিঠি এবং তাঁর লেখা বিখ্যাত ‘বঙ্গোপসাগর’ কবিতা ফ্রেমে বাঁধাই করে রাখা আছে। এছাড়া রাজপরিবারের প্রাচীন লাইব্রেরির বইপত্র ও শেষ রাজা প্রতিভানাথ রায়ের ইন্স্যুরেন্স সংক্রান্ত ঐতিহাসিক কাগজপত্রও এখানে সংরক্ষিত।
উত্তরা গণভবন বা দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি বাংলার ঐতিহ্যবাহী ভূস্বামীয় স্থাপত্য আর স্বাধীনতার পরবর্তী রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের এক গৌরবময় দলিল। তিনশো বছরের পুরোনো ইতিহাস, ভূমিকম্পের পর পুনর্নির্মাণ, বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত আর বর্তমানের আধুনিক সংগ্রহশালা—সব মিলিয়ে এটা বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ও পর্যটন মানচিত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
উত্তরা গণভবন দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি সম্পর্কে
উত্তরা গণভবন দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি হলো বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা/প্রতিষ্ঠান।
উপরের বিবরণ থেকে বিস্তারিত জানুন। তথ্যবক্স থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজেই পেয়ে যান।