১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচন ও আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়
বিস্তারিত বিবরণ
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন ছিল বাঙালি জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব ও মোড়ঘোরানো অধ্যায়। এটি কেবল একটি সংসদীয় নির্বাচন ছিল না; বরং এটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ৭ কোটি মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ, মর্যাদা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার ওপর এক ঐতিহাসিক জনমত বা গণভোট (Referendum)।
নিচে এই নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, আইনি ভিত্তি, অবিস্মরণীয় ফলাফল এবং স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে এর সুদূরপ্রসারী মানবিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিশদভাবে তুলে ধরা হলো:
১. নির্বাচনের রাজনৈতিক পটভূমি ও লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার (LFO)
১৯৬৯ সালের তীব্র গণঅভ্যুত্থানের মুখে সামরিক স্বৈরশাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের পতন ঘটে। ২৫ মার্চ ১৯৬৯ ক্ষমতা গ্রহণ করেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। আন্দোলনের উত্তাপ প্রশমিত করতে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তিনি সারা দেশে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দেন।
লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার (LFO)
১৯৭০ সালের ৩০ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান Legal Framework Order (LFO) বা ‘আইনি কাঠামো আদেশ’ জারি করেন। এতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল:
- এক ব্যক্তি, এক ভোট (One Man, One Vote): এতদিন 'ওয়ান ইউনিট' প্রথার মাধ্যমে দুই পাকিস্তানের আসন সমান রাখার যে বৈষম্যমূলক নিয়ম ছিল, তা বাতিল করা হয়।
- জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বণ্টন: প্রথমবারের মতো জনসংখ্যার অনুপাতে পূর্ব পাকিস্তান বেশি আসন লাভ করে। জাতীয় পরিষদের মোট ৩১৩টি আসনের মধ্যে কেবল পূর্ব পাকিস্তানের জন্যই ১৬৯টি আসন (১৬২টি সাধারণ + ৭টি সংরক্ষিত মহিলা আসন) বরাদ্দ করা হয়।
২. বঙ্গবন্ধুর মাস্টারস্ট্রোক: নির্বাচনকে '৬-দফার ওপর গণভোট' ঘোষণা
তৎকালীন অনেক রাজনৈতিক দল (বিশেষ করে বামপন্থী দলগুলো) এলএফও-এর কঠোর শর্তাবলি এবং পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার বাধ্যবাধকতার কারণে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নির্বাচনকে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণের বিরুদ্ধে এবং তাঁর ঘোষিত ৬-দফা ও ১১-দফা দাবির পক্ষে এক ঐতিহাসিক গণভোট হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি বাংলার ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষকে বোঝান—ভোটে জয়ী হয়ে আইনি ও সাংবিধানিক ক্ষমতা হাতে পেলেই কেবল বাঙালিদের চিরদিনের জন্য শোষণমুক্ত করা সম্ভব।
৩. নির্বাচন ও ঘূর্ণিদুর্গত মানুষের মানবিক বিপর্যয়
নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাঝেই ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর ঘটে যায় মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ—‘গ্রেট ভোলা সাইক্লোন’। মহা প্রলয়ংকরী এই ঘূর্ণিঝড়ে পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে (বিশেষ করে ভোলা, পটুয়াখালী, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম জেলায়) ৫ লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারায়।
- কেন্দ্রীয় সরকারের অমানবিক অবহেলা: এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের পর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতায় চরম অবহেলা ও উদাসীনতা প্রকাশ পায়। তৎকালীন পূর্ব বাংলায় চাল-কাপড় না পাঠিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতা ও সেনাসদস্যদের আনাগোনা বাড়ানো হয়েছিল।
- জনমনে চূড়ান্ত ক্ষোভ: দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে বঙ্গবন্ধু ক্ষোভে ও কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং ঘোষণা করেন, "পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেরা বাঙালিদের মানুষ বলেই মনে করে না। এই চরম অবহেলা ও বৈষম্যের জবাব বাঙালিরা ব্যালটের মাধ্যমেই দেবে।" দুর্যোগের কারণে কিছু উপকূলীয় আসনে নির্বাচন পিছিয়ে ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে আয়োজন করা হয়।
৪. ফলাফলের চিত্রে অভূতপূর্ব একচ্ছত্র বিজয়
১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর (এবং উপকূলীয় অঞ্চলে ১৭ জানুয়ারি ১৯৭১) অনুষ্ঠিত হয় বহুল প্রতীক্ষিত সেই নির্বাচন। নির্বাচনে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে সর্বস্তরের মানুষ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক 'নৌকা'-তে ভোট দেয়।
জাতীয় পরিষদ (National Assembly)
- মোট আসন: ৩১৩টি (সংরক্ষিত মহিলা আসনসহ)
- পূর্ব পাকিস্তানের আসন: ১৬৯টি
- আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত আসন: ১৬৭টি (১৬২টি সাধারণ আসনের মধ্যে ১৬০টি + ৭টি সংরক্ষিত মহিলা আসনের সবকটি)।
- ফলাফল: আওয়ামী লীগ এককভাবে জাতীয় পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা (Absolute Majority) অর্জন করে সমগ্র পাকিস্তানের সরকার গঠনের আইনি অধিকার লাভ করে।
provincial পরিষদ (East Pakistan Provincial Assembly)
- মোট আসন: ৩১০টি (৩০০টি সাধারণ + ১০টি সংরক্ষিত মহিলা আসন)
- আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত আসন: ২৯৮টি (২৮৮টি সাধারণ + ১০টি সংরক্ষিত মহিলা আসন)।
রাজনৈতিক বিভাজন: এই নির্বাচনের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক ছিল আঞ্চলিক রাজনৈতিক মেরুকরণ। আওয়ামী লীগ পশ্চিম পাকিস্তানে কোনো আসন পায়নি, আবার পশ্চিম পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান পিপলস পার্টি (PPP) ৮১টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় হলেও পূর্ব বাংলায় তারা একটি আসন বা ভোটও পায়নি। এটি প্রমাণ করে দুই পাকিস্তানের মানসিক বিচ্ছেদ আগেই ঘটে গিয়েছিল।
৫. বিজয়ের সুদূরপ্রসারী ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রভাব
১. গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক বৈধতা: এই বিজয়ের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবল আওয়ামী লীগের নেতা থাকেননি; তিনি সমগ্র পাকিস্তানের নির্বাচিত একমাত্র বৈধ নেতা ও হবু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পান। ২. ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানি ষড়যন্ত্র: সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সত্ত্বেও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান পূর্বঘোষিত ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন একতরফাভাবে স্থগিত করে দেন। ৩. অসহযোগ আন্দোলন ও একাত্তরের ডাক: ক্ষমতা হস্তান্তরের এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে পুরো পূর্ব বাংলা আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলে ওঠে। ২ মার্চ থেকে শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলন। ৪. ৭ই মার্চের ভাষণ থেকে স্বাধীনতা: ক্ষমতা হস্তান্তরের চক্রান্তই বাঙালিদের বুঝিয়ে দেয় যে পাকিস্তানের কাঠামোয় অধিকার পাওয়া অসম্ভব। ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন—"এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।"
১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচন ও আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় সম্পর্কে
১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচন ও আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় হলো বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক স্থান।
অবস্থান: ঢাকা।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন ছিল বাঙালি জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব ও মোড়ঘোরানো অধ্যায়। এটি কেবল একটি সংসদীয় নির্বাচন ছিল না; বরং এটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ৭ কোটি মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ, মর্যাদা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার ওপর এক ঐতিহাসিক জনমত বা গণভোট (Referendum) । নিচে এই নির্বাচনের...