১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ
বিস্তারিত বিবরণ
১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ: একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের কঠিনতম মানবিক বিপর্যয়
১৯৭৪ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত স্থায়ী এই দুর্ভিক্ষটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক এবং জটিল অধ্যায়। এটি কেবল একটি খাদ্যাভাবের ঘটনা ছিল না; এর পেছনে জড়িয়ে ছিল ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অভ্যন্তরীণ বাজার ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা।
১. ঐতিহাসিক পটভূমি ও যুদ্ধোত্তর ভঙ্গুর অর্থনীতি
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও স্বাধীনতার পরপরই দেশকে এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়।
- ভৌত অবকাঠামোর বিনাশ: যুদ্ধের সময় দেশের রাস্তাঘাট, রেললাইন, সেতু ও চট্টগ্রাম-মোংলা সমুদ্রবন্দর অচল হয়ে পড়েছিল।
- কৃষি ও উৎপাদনের ক্ষতি: ১৯৭১ সালে চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। লাখ লাখ কৃষক তাদের ভিটেমাটি ছেড়ে ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিলেন, যার ফলে দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়।
- শূন্য রাজকোষ ও মুদ্রা সংকট: পাকিস্তান থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে সদ্য স্বাধীন দেশ কোনো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পায়নি। মার্কিন সাময়িকী টাইম-এর ১৯৭২ সালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পাকিস্তানি বাহিনী যাওয়ার সময় ব্যাংক ও অর্থব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ দেউলিয়া করে দিয়ে যায়।
- ১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড়ের ধাক্কা: ১৯৭০ সালের ভয়াবহ প্রলয়ংকরী মন্বন্তর ও ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষত কাটিয়ে ওঠার আগেই যুদ্ধ শুরু হওয়ায় দেশের সঞ্চিত খাদ্যভাণ্ডার সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে গিয়েছিল।
২. প্রাকৃতিক দুর্যোগ: ১৯৭৪-এর প্রলয়ংকরী বন্যা
১৯৭৪ সালের এপ্রিল থেকে জুলাই মাসের মধ্যে বাংলাদেশে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হয়।
- ব্রহ্মপুত্র নদীর প্লাবন: আগস্ট মাসের দিকে ব্রহ্মপুত্র নদী ও এর উপনদীগুলোর পানি বিপদসীমার অনেক উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে।
- ফসল ধ্বংস: এই বন্যায় দেশের প্রায় অর্ধেক এলাকা প্লাবিত হয় এবং রোপা আমনসহ তৎকালীন প্রধান ধানক্ষেতগুলো সম্পূর্ণরূপে পানির নিচে তলিয়ে যায়। বিশেষ করে রংপুর, কুড়িগ্রাম, বগুড়া, সিলেট ও ময়মনসিংহে ফসলের অপূরণীয় ক্ষতি হয়।
- যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা: বন্যার ফলে বন্যাকবলিত অঞ্চলগুলোর সাথে রাজধানীর সরবরাহ ব্যবস্থার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যার কারণে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
৩. আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য সাহায্য স্থগিত
১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত দিক ছিল তৎকালীন আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি।
- পিএল-৪৮০ (PL-480) এবং কিউবা বিতর্ক: বাংলাদেশ সে সময় তীব্র খাদ্যসংকট মোকাবিলার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে খাদ্য সহায়তার অনুরোধ জানায়। কিন্তু মার্কিন সরকার ‘Public Law 480’ এর অধীনে খাদ্য সহায়তা দিতে অস্বীকৃতি জানায় বা বিলম্ব করে।
- কারণ: মার্কিন নীতি অনুযায়ী, কোনো দেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুভাবাপন্ন দেশ কিউবার সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক রাখে, তবে তাকে সাহায্য দেওয়া যাবে না। বাংলাদেশ সে সময় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য কিউবায় পাট রপ্তানি করছিল।
- সাহায্য পৌঁছাতে বিলম্ব: মার্কিন চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার কিউবায় পাট রপ্তানি চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য হয়। মার্কিন খাদ্যবাহী জাহাজ যখন বাংলাদেশে এসে পৌঁছায়, ততক্ষণে দেশের উত্তরাঞ্চলে অনাহারে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
৪. অর্থনীতিবিদ নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের বিশ্লেষণ: খাদ্য ঘাটতি নাকি বিতরণ ব্যর্থতা?
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য সেন ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের ওপর গভীর গবেষণা চালান। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'Poverty and Famines: An Essay on Entitlement and Deprivation' -এ তিনি দেখান যে, ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে গড় খাদ্যশস্যের উৎপাদন বিগত বছরের তুলনায় খুব কম ছিল না।
তিনি এই দুর্ভিক্ষকে ‘Exchange Entitlement Failure’ (বিনিময় অধিকারের ব্যর্থতা) হিসেবে চিহ্নিত করেন:
- কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারি: চালের দাম বন্যার খবরের পরপরই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। অসাধু ব্যবসায়ী, জোতদার ও মজুতদারেরা ভবিষ্যতে আরও বেশি দামে বিক্রির আশায় চাল ধরে রাখে।
- ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস: বন্যা ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দিনমজুর, ভূমিহীন কৃষক ও গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। বাজারে চাল থাকলেও তা কেনার মতো নগদ অর্থ বা ক্রয়ক্ষমতা তাদের ছিল না।
- সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান: খাদ্যশস্যের একাংশ সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশে চোরাচালান হয়ে যাওয়ার ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে সংকট আরও তীব্র হয়।
৫. ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির চিত্র
- মৃত্যুসংখ্যা:
- সরকারি পরিসংখ্যান: সরকারি হিসাবে অনাহারে মৃত্যুর সংখ্যা ২৭,০০০ থেকে ৪০,০০০ জন বলা হয়েছিল।
- বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক গবেষণা: অধ্যাপক অমর্ত্য সেনসহ বিভিন্ন স্বাধীন গবেষকের মতে, প্রত্যক্ষ অনাহার এবং অনাহারজনিত রোগব্যাধি (যেমন: কলেরা, ডায়রিয়া, ডাইরিয়া, ম্যালেরিয়া) মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ৪,৫০,০০০ থেকে ১৫ লাখ পর্যন্ত পৌঁছায়।
- সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল: রংপুরের কুড়িগ্রাম জেলা ছিল এই দুর্ভিক্ষের কেন্দ্রবিন্দু। তৎকালীন চিলমারী ও কুড়িগ্রামের লঙ্গরখানাগুলোতে প্রতিদিন শত শত মানুষ খাবারের জন্য আকুতি জানাত।
- সামাজিক প্রভাব: এই দুর্ভিক্ষের সবচেয়ে বড় শিকার হয় গ্রামীণ ভূমিহীন ও দিনমজুর শ্রেণী। বেঁচে থাকার তাগিদে লাখ লাখ মানুষ ভিটেমাটি, গবাদিপশু ও কৃষি সরঞ্জাম জলের দামে বিক্রি করে শহরের দিকে পা বাড়ায়, যা ঢাকায় বিশাল বস্তি ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর জন্ম দেয়।
৬. পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্যাভাবের সমাপ্তি
১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাসে খাদ্যশস্য ও চালের দাম সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়। পরবর্তীতে কয়েকটি পদক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে: ১. রবি শস্যের আগমন: শীতকালীন রবি শস্য ও আগাম ধান বাজারে আসতে শুরু করলে চালের দাম কমতে থাকে। ২. আন্তর্জাতিক সাহায্য: শেষের দিকে বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা জরুরি ত্রাণ পৌঁছাতে শুরু করে। ৩. লঙ্গরখানা পরিচালনা: সরকার ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন সারা দেশে হাজার হাজার লঙ্গরখানা খুলে ভুখা মানুষদের একবেলা খাদ্যের ব্যবস্থা করে। ৪. ডিসেম্বর ১৯৭৪: ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ বাজারে চালের সরবরাহ স্বাভাবিক হয় এবং দুর্ভিক্ষের প্রত্যক্ষ প্রকোপ শেষ হয়। তবে স্বাস্থ্যগত জটিলতা ও অপুষ্টিজনিত কারণে প্রাণহানি ১৯৭৫ সালের প্রথম দিক পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে
১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ হলো বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক স্থান।
১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ: একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের কঠিনতম মানবিক বিপর্যয় ১৯৭৪ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত স্থায়ী এই দুর্ভিক্ষটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক এবং জটিল অধ্যায়। এটি কেবল একটি খাদ্যাভাবের ঘটনা ছিল না; এর পেছনে জড়িয়ে ছিল ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, প্রলয়ংকরী...