ইতিহাস ও ঐতিহ্য

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা

১০২

বিস্তারিত বিবরণ

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ছিল পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানে দায়ের করা একটি ঐতিহাসিক রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা। ১৯৬৮ সালের শুরুর দিকে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার আওয়ামী লীগ নেতা ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানসহ মোট ৩৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে এ মামলা দায়ের করে।

মামলার অফিসিয়াল নাম ছিল "রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য" (রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান গং)। তবে পাকিস্তান সরকারের দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়েছিল, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় বসে এই ষড়যন্ত্রের সূচনা হয়েছিল—তাই এটি সাধারণ মানুষের কাছে "আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা" হিসেবেই সর্বাধিক পরিচিতি পায়। এতে অভিযোগ করা হয়, শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য আসামিরা ভারতের সহায়তায় পাকিস্তানের অখণ্ডতা বিনষ্টের ষড়যন্ত্র করছিলেন।

দীর্ঘ চার দশক পর ২০১১ সালে মামলার অন্যতম আসামি ক্যাপ্টেন এ. শওকত আলী তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, এই মামলার মূল অভিযোগটি প্রকৃতপক্ষে সত্য ছিল।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা—যার আসল নাম ছিল 'রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য'—বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোর একটি। এটিকে বাইরে থেকে একটি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হিসেবে সাজানো হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল পরাধীনতার শিকল ভাঙার এক গভীর মানবিক ও সাহসিক উপাখ্যান।

এই ইতিহাসকে কেবল রাজনৈতিক তথ্যের চশমায় না দেখে, একজন মানুষের অস্তিত্ব ও অধিকার আদায়ের মানবিক চোখ দিয়ে দেখলে এর ভেতরের প্রতিটি ঘটনা জীবন্ত হয়ে ওঠে।

১. নেপথ্যের মানবিক সত্য: দেশপ্রেম নাকি 'ষড়যন্ত্র'?

১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের পর থেকেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) মানুষ বুঝতে পেরেছিল যে, শাসনের হাতবদল হলেও শোষণ থামেনি। পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে গণ্য করত। ভাষার অধিকার হরণ, অর্থনৈতিক শোষণ এবং প্রশাসনিক বৈষম্যে বাঙালিরা নিজেদের দেশেই পরবাসী হয়ে পড়েছিল।

এই চরম অবহেলা ও অন্যায়ের পটভূমিতে কয়েকজন দূরদর্শী ও প্রদেশপ্রেমিক সামরিক ও বেসামরিক বাঙালি কর্মকর্তা অনুধাবন করেছিলেন যে, কেবল রাজনৈতিক দাবি তুলে এই শোষণ বন্ধ করা যাবে না।

  1. বিপ্লবের সুপ্ত বাসনা: লেঃ কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, সার্জেন্ট জহুরুল হক, সিএসপি অফিসার রুহুল কুদ্দুসদের মতো মানুষেরা নিজের জীবনের সমস্ত নিরাপত্তা, সম্মান ও ভবিষ্যৎকে বাজি রেখেছিলেন। তারা জানতেন, এটি ধরা পড়লে পরিণতি হবে ফাঁসি বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তবুও নিজেদের সন্তান, পরিবার ও আগামী প্রজন্মের জন্য একটি স্বাধীন ও বৈষম্যহীন ভূখণ্ডের স্বপ্নে তারা এক হয়েছিলেন।
  2. আগরতলা বৈঠক ও বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা: শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন, নিরস্ত্র আন্দোলনের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট সশস্ত্র ও কূটনৈতিক ভিত্তির প্রয়োজন। ১৯৬৩ সালে ত্রিপুরার আগরতলায় গোপন বৈঠকের পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল কোনো দেশের কাছে আত্মসমর্পণ নয়, বরং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও ভূরাজনৈতিক সহায়তার ব্যবস্থা করা। কিন্তু পাকিস্তান সরকারের গোয়েন্দাদের হাতে বিষয়টি প্রকাশ পেয়ে গেলে আইয়ুব সরকার এটিকে বাঙালিদের চিরতরে স্তব্ধ করার একটি হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা করে।

২. ট্রাইব্যুনালের পেছনের মানবিক নির্যাতন ও রাজসাক্ষীর ট্র্যাজেডি

মামলায় ৩৫ জন আসামির ওপর যেভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম এক কালো অধ্যায়।

  1. অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন: মামলার তদন্তের নামে আটক বাঙালি সেনা ও কর্মকর্তাদের ইন্টারোগেশন সেলে নিয়ে গিয়ে যে নিষ্ঠুর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তা ছিল বর্ণনাতীত। গভীর রাতে আলো জ্বালিয়ে ঘুমাতে না দেওয়া, ক্রমাগত প্রহার, এবং পরিবার ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো।
  2. রাজসাক্ষীদের আত্মগ্লানি: আইয়ুব সরকার ১১ জন রাজসাক্ষী তৈরি করেছিল। তবে এদের অধিকাংশকেই অমানুষিক ভয়ভীতি ও ব্ল্যাকমেইল করে সরকারের শেখানো বয়ান দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় এদের অনেকের চোখেমুখে যে ভয় ও অপরাধবোধ ফুটে উঠেছিল, তা প্রমাণের বদলে উল্টো আইয়ুব সরকারের ষড়যন্ত্রকেই জনগণের সামনে নগ্ন করে দিয়েছিল।

৩. সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যাকাণ্ড: এক শহীদের রক্তে জ্বলে ওঠা দাবানল

মামলাটি যখন চলছিল, তখন কুর্মিটোলা সেনানিবাসে বন্দিদের রাখা হয়েছিল চরম নিষ্ঠুরতায়। প্রতিমুহূর্তে তাঁদের মৃত্যুর ভয় দেখানো হতো।

১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ভোরবেলা কেবল একটি তারিখ নয়, এটি ছিল বাঙালি জাতির সহ্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার দিন।

  1. ঠান্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ড: বন্দি অবস্থায় প্রস্রাব করতে চাওয়ার মতো সাধারণ মানবিক কারণে সার্জেন্ট জহুরুল হক ও ফজলুল হককে পাকিস্তানি সেন্ট্রিরা খুব কাছ থেকে গুলি করে। জহুরুল হক সেদিন রাতে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে শাহাদাত বরণ করেন।
  2. এক মায়ের কোল খালি ও পুরো শহরের গর্জন: সার্জেন্ট জহুরুল হকের এই অকাল ও নির্মম মৃত্যু বাঙালির হৃদয়ে এক গভীর ক্ষত ও একই সাথে প্রচণ্ড ক্ষোভের জন্ম দেয়। মানুষ বুঝতে পারে, ঢাকা সেনানিবাসের ওই অন্ধ প্রকোষ্ঠে তাঁদের প্রিয় নেতাদের তিলে তিলে মেরে ফেলা হচ্ছে।
  3. সান্ধ্য আইন ভেঙে জনতার ঢল: জহুরুল হকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই ঢাকার রাস্তা রক্তে উত্তাল হয়ে ওঠে। মায়েরা, বোনেরা, সাধারণ ছাত্র ও কৃষকেরা লাঠি-সোঁটা হাতে রাজপথে নেমে আসে। মানুষের আক্রোশ এতটাই তীব্র ছিল যে, ট্রাইব্যুনালের প্রধান বিচারপতি এস. এ. রহমান তাঁর সরকারি বাসভবনে অগ্নিকাণ্ডের পর প্রাণ বাঁচাতে নাইট গাউন পরা অবস্থায় পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন।

৪. ঐতিহাসিক পরিণতি: এক নেতার জন্ম ও একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত্তি

এই মামলাটি আইয়ুব সরকার করেছিল শেখ মুজিবকে চিরতরে মুছে ফেলার জন্য, কিন্তু প্রকৃতির বিচার ছিল সম্পূর্ণ উল্টো।

  1. 'মুজিব' থেকে 'বঙ্গবন্ধু': সাধারণ মানুষ তাঁদের নেতার জীবন বাঁচাতে নিজের জীবন বাজি রেখেছিল। গণঅভ্যুত্থানের মুখে বাধ্য হয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে সরকার মামলাটি প্রত্যাহার করে সব আসামিকে সসম্মানে মুক্তি দেয়। পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ জনতার ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তোফায়েল আহমেদের কণ্ঠে শেখ মুজিবুর রহমান পান 'বঙ্গবন্ধু' (বাঙালির বন্ধু) উপাধি।
  2. আইয়ুবী শাসনের যবনিকা: বাঙালিদের স্বাধিকার আন্দোলনের প্রবল উত্তাপ সহ্য করতে না পেরে মাত্র এক মাসের মাথায়, ২৫ মার্চ ১৯৬৯, স্বৈরশাসক আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
  3. একাত্তরের প্রেরণা: আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বাঙালিদের শিখিয়েছিল—আইনি লড়াই বা পাকিস্তান কাঠামোর ভেতরে গোলটেবিল বৈঠক করে বাঙালি কখনো মুক্ত হতে পারবে না। এই আত্ম উপলব্ধিই ১৯৭০-এর নির্বাচনে ঐতিহাসিক রায় এনে দেয় এবং পরিশেষে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তরিত হয়।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা কোনো ব্যর্থ চক্রান্ত ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির মুক্তির লক্ষ্যে কয়েকজন সাহসী সন্তানের আত্মত্যাগের শুরু, যা অবশেষে লাল-সবুজের স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিল।

ঐতিহাসিক স্থান তালিকায় ফিরে যান

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সম্পর্কে

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হলো বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক স্থান।

অবস্থান: ঢাকা → ঢাকা জেলা।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ছিল পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানে দায়ের করা একটি ঐতিহাসিক রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা। ১৯৬৮ সালের শুরুর দিকে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার আওয়ামী লীগ নেতা ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানসহ মোট ৩৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে এ মামলা দায়ের করে। মামলার অফিসিয়াল নাম ছিল "রাষ্ট্র বনাম...

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা কী?
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ছিল পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানে দায়ের করা একটি ঐতিহাসিক রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা। ১৯৬৮ সালের শুরুর দিকে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার আওয়ামী লীগ নেতা ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানসহ মোট ৩৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে এ মামলা দায়ের...
অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থান কোথায় দেখব?
ঐতিহাসিক স্থান তালিকায় ফিরে গিয়ে অন্যান্য স্থান দেখতে পারবেন।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা | বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থান | তথ্যবক্স | Totthobox