ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন (ফকির-সন্ন্যাসী, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, সাঁওতাল বিদ্রোহ)
বিস্তারিত বিবরণ
১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অন্যায় শোষণের বিরুদ্ধে বাংলার সাধারণ মানুষ, কৃষক ও আদিবাসীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ব্রিটিশরা আধুনিক সামরিক শক্তি দিয়ে এসব আন্দোলন দমন করলেও, এগুলোই পরবর্তীতে স্বাধীনতার চেতনার প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে।
১. ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (১৭৬০–১৮০০ খ্রি.)
এটি ছিল বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম দীর্ঘস্থায়ী ও সশস্ত্র গেরিলা প্রতিরোধ আন্দোলন।
- নেতৃত্ব: ফকিরদের পক্ষে মজনু শাহ (চিরাগ আলী শাহ) এবং সন্ন্যাসীদের পক্ষে ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানী নেতৃত্ব দেন।
- বিদ্রোহের কারণ: ব্রিটিশরা তাঁদের ঐতিহ্যবাহী তীর্থযাত্রার ওপর 'তীর্থ কর' ধার্য করে এবং 'ডাকাত' আখ্যা দিয়ে যাতায়াত নিষিদ্ধ করে। ১৭৭০ সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পর কৃষকদের ওপর শোষণে ফকির-সন্ন্যাসীরা ক্ষুব্ধ হন।
- ফলাফল: উত্তর ও পূর্ব বাংলায় তাঁরা কোম্পানির কুঠিতে আক্রমণ চালিয়ে গেরিলা যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন। ১৭৮৬ সালে মজনু শাহের মৃত্যু এবং অতিরিক্ত সামরিক অভিযানের কারণে উনিশ শতকের শুরুতে বিদ্রোহ স্তিমিত হয়ে পড়ে।
২. তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা ও বারাসাত বিদ্রোহ (১৮৩১ খ্রি.)
সৈয়দ মীর নিসার আলী (তিতুমীর) ২৪ পরগনা, নদীয়া ও ফরিদপুরে ব্রিটিশ নীলকর ও শোষক জমিদারদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক সংগ্রাম গড়ে তোলেন।
- বিদ্রোহের কারণ: মক্কায় হজ্জ পালনকালে সৈয়দ আহমদ বেরেলভীর সান্নিধ্যে এসে তিতুমীর 'তারিকা-ই-মুহাম্মাদিয়া' আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হন। দেশে ফিরে কৃষক ও তাঁতিদের ঐক্যবদ্ধ করলে স্থানীয় জমিদাররা মুসলিমদের ওপর অন্যায্য কর (যেমন: দাড়ির কর) চাপিয়ে দেয়।
- বাঁশের কেল্লা ও পতন: জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে লড়তে তিনি ২৪ পরগনার নারিকেলবাড়িয়ায় বিখ্যাত 'বাঁশের কেল্লা' নির্মাণ করেন এবং অঞ্চলটিকে স্বাধীন ঘোষণা করেন। ১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর ব্রিটিশদের আধুনিক কামানের গোলার আঘাতে বাঁশের কেল্লা ধ্বংস হয় এবং তিতুমীর বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন।
৩. সাঁওতাল বিদ্রোহ বা সাঁওতাল হুল (১৮৫৫–১৮৫৬ খ্রি.)
রাজমহল পাহাড় ও ভাগলপুর (‘দামিন-ই-কোহ’) অঞ্চলের সাঁওতাল আদিবাসীরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যে প্রলয়ঙ্কারী আন্দোলন তৈরি করেন, তা ইতিহাসে 'সাঁওতাল হুল' নামে পরিচিত।
- নেতৃত্ব: মূল নেতৃত্বে ছিলেন চার ভাই—সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব।
- বিদ্রোহের কারণ: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর ব্রিটিশদের নিযুক্ত জমিদার, মহাজন (যাদের ‘দিকু’ বলা হতো) ও নীলকরদের চরম অত্যাচার এবং রেললাইন নির্মাণে নারীদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে এ আন্দোলন শুরু হয়।
ফলাফল: ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন ভগনাডিহির মাঠে প্রায় ৩০,০০০ সাঁওতাল স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। শেষপর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার সামরিক আইন জারি করে প্রায় ২০,০০০ সাঁওতালকে নির্মমভাবে হত্যা করে। সিধু ও কানুকে ফাঁসি দেওয়া হলেও ব্রিটিশরা পরবর্তীতে 'সাঁওতাল পরগনা' গঠন করতে বাধ্য হয়।
পলাশী পরবর্তী ব্রিটিশ বিরোধী প্রধান প্রতিরোধ আন্দোলনসমূহ: এক নজরে সারসংক্ষেপ :
ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (১৭৬০–১৮০০ খ্রি.):
- প্রধান নেতা: মজনু শাহ ও ভবানী পাঠক।
- মূল প্রতিপক্ষ: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও স্থানীয় শোষক শ্রেণী।
- প্রধান বৈশিষ্ট্য: এটি ছিল বাংলার ইতিহাসে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রথম দীর্ঘস্থায়ী ও সফল সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধ।
তিতুমীরের বারাসাত বিদ্রোহ (১৮৩১ খ্রি.):
- প্রধান নেতা: সৈয়দ মীর নিসার আলী (তিতুমীর)।
- মূল প্রতিপক্ষ: ব্রিটিশ নীলকর ও অত্যাচারী স্থানীয় জমিদার গোষ্ঠী।
- প্রধান বৈশিষ্ট্য: ২৪ পরগনার নারিকেলবাড়িয়ায় ঐতিহাসিক ‘বাঁশের কেল্লা’ নির্মাণ করে স্বাধীন সত্তা ঘোষণা ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
সাঁওতাল বিদ্রোহ বা হুল (১৮৫৫–১৮৫৬ খ্রি.):
- প্রধান নেতা: সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব।
- মূল প্রতিপক্ষ: ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী এবং ‘দিকু’ নামে পরিচিত বহিরাগত শোষক মহাজন শ্রেণী।
প্রধান বৈশিষ্ট্য: নিজেদের জমি ও স্বাধিকার রক্ষার জন্য আদিবাসীদের সর্বাত্মক ও রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রাম।
ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, তিতুমীরের আন্দোলন কিংবা সাঁওতাল হুল—প্রতিটি প্রতিরোধই ছিল সাম্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের প্রতীক। সাধারণ লাঠি ও তীর-ধনুক নিয়ে ব্রিটিশদের আধুনিক কামানের মুখোমুখি হওয়ার এই সাহসিকতা উপমহাদেশজুড়ে স্বাধীনতার মূল উদ্দীপনা জুগিয়েছিল।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন (ফকির-সন্ন্যাসী, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, সাঁওতাল বিদ্রোহ) সম্পর্কে
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন (ফকির-সন্ন্যাসী, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, সাঁওতাল বিদ্রোহ) হলো বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক স্থান।
অবস্থান: রংপুর।
১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অন্যায় শোষণের বিরুদ্ধে বাংলার সাধারণ মানুষ, কৃষক ও আদিবাসীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ব্রিটিশরা আধুনিক সামরিক শক্তি দিয়ে এসব আন্দোলন দমন করলেও, এগুলোই পরবর্তীতে স্বাধীনতার চেতনার প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে। ১. ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (১৭৬০–১৮০০ খ্রি.) এটি...