সংবিধান প্রণয়ন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন (১৯৭২–১৯৭৫)
বিস্তারিত বিবরণ
সংবিধান প্রণয়ন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন :
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নেয় এক নতুন সার্বভৌম রাষ্ট্র—গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। তবে এই বিজয়ের আনন্দ উদযাপনের পরপরই সদ্য স্বাধীন দেশটির সামনে এসে দাঁড়ায় এক হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ। দেশ তখন কেবল ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হয়েছিল, কিন্তু সার্বিক অবকাঠামো, অর্থনীতি, প্রশাসন ও সমাজ ব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ। ১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়, যার আঘাত কাটিয়ে ওঠার আগেই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ, এবং নয় মাসের দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম ধ্বংসযজ্ঞের পর দেশের পরিস্থিতি ছিল চরম নাজুক। এই অভূতপূর্ব ও সংকটময় মুহূর্তে শুরু হয় স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের এক ঐতিহাসিক মহাযজ্ঞ।
১. যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট
স্বাধীনতা লাভের পর নতুন এই দেশটির সামনে যেসকল মৌলিক ও সংকটময় পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিল, তা নিচে উল্লেখ করা হলো:
- অবকাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞ: যুদ্ধকালে সড়ক, সেতু, কালভার্ট, রেলপথ, বন্দর এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর মাইন ও ডুবন্ত জাহাজের কারণে অচল হয়ে পড়েছিল, যা বাণিজ্য ও ত্রাণ পরিবহনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
- খাদ্যাভাব ও শূন্য রাজকোষ: কৃষি খাত ধ্বংস হওয়ায় এবং খাদ্য গুদামগুলো খালি থাকায় দেশে চরম খাদ্যসংকট দেখা দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা কোনো শক্ত আর্থিক রিজার্ভ ছিল না; প্রশাসনিকভাবে একটি প্রাদেশিক ব্যবস্থাকে এক রাতে কেন্দ্রীয় সরকারে রূপান্তর করার কঠিন দায়িত্ব চলে আসে।
- শরণার্থী পুনর্বাসন: ভারতে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১ কোটি শরণার্থীর নিজ দেশে প্রত্যাবাসন এবং তাদের দ্রুত বাসস্থান, খাদ্য ও চিকিৎসার সংস্থান করা ছিল সে সময়ের অন্যতম বড় মানবিক চ্যালেঞ্জ।
- উচ্চ বেকারত্ব ও নিরক্ষরতা: বিপুল সংখ্যক নিরক্ষর, অপ্রশিক্ষিত ও চাকরিহীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা আবশ্যক হয়ে পড়েছিল।
২. অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন ও নেতৃত্বের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন
বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠনে প্রশাসনিক উদ্যোগসমূহ ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হয়:
ক. মুজিবনগর সরকারের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন
১৯৭১ সালের ২২শে ডিসেম্বর প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং মন্ত্রিপরিষদের অন্যান্য সদস্যরা কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে এসে তেজগাঁও বিমানবন্দরে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাদের প্রথম সিদ্ধান্তগুলোর অন্যতম ছিল—মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী ও মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি) ও নেজামে ইসলাম পার্টিকে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা। পরের দিন ২৩শে ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সচিবালয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক কাজের দিকনির্দেশনা দেন।
খ. বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও সংসদীয় পদ্ধতির প্রবর্তন
১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১১ই জানুয়ারি তিনি অস্থায়ী সংবিধান আদেশ জারির মাধ্যমে দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। ১২ই জানুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতির পদে অধিষ্ঠিত হন।
৩. রাষ্ট্রীয় প্রতীক ও সাংবিধানিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয় নিশ্চিতকরণে দ্রুত কিছু ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়:
- জাতীয় পতাকা: সবুজ আয়তক্ষেত্রের ভেতরে উদীয়মান সূর্যের প্রতীক লাল বৃত্তসংবলিত জাতীয় পতাকার রূপটি ১৯৭২ সালের ১৭ই জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয় এবং ‘জাতীয় পতাকা বিধিমালা ১৯৭২’ জারি করা হয়।
- জাতীয় সঙ্গীত: ১৩ই জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের প্রথম বৈঠকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটির প্রথম ১০ লাইনকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে নির্বাচন করা হয়।
৪. আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণ
যুদ্ধোত্তর দেশে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের কাছে থাকা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা ছিল সবচেয়ে জরুরি বিষয়।
- অস্ত্র সমর্পণের নির্দেশ: ১৯৭২ সালের ১৭ই জানুয়ারি সরকার নির্দেশ জারি করে যে, সকল গণবাহিনী ও সাধারণ মানুষকে সরকারের কাছে অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে।
- ঐতিহাসিক মুহূর্ত: ১৯৭২ সালের ৩১শে জানুয়ারি থেকে দেশের সমস্ত বীর মুক্তিযোদ্ধারা সারিবদ্ধভাবে সরকারের কাছে তাদের অস্ত্র সমর্পণ করতে শুরু করেন, যা আইন-শৃঙ্খলা স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে এক ইতিবাচক সূচনা এনে দেয়।
৫. মিত্র বাহিনীর প্রত্যাহার ও বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপন
একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক বিশ্বে নিজের অবস্থান শক্ত করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়:
- ভারতীয় সামরিক বাহিনীর প্রত্যাহার: একটি স্বাধীন দেশের মাটিতে বিদেশী সৈন্যের অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্নের সৃষ্টি করতে পারে বিবেচনা করে, শেখ মুজিবুর রহমানের অনুরোধে ১৯৭২ সালের ১৫ই মার্চের মধ্যে ভারতীয় মিত্র বাহিনী তাদের সমস্ত সেনাসদস্যকে বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেয়।
- কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও সদস্যপদ: বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে নতুন রাষ্ট্রের অবস্থান তুলে ধরে দ্রুততম সময়ে জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, ওআইসি (OIC) এবং বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ অর্জন করা হয়। বহু দেশ একে একে বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান করে।
৬. অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও বাজেট
তৎকালীন শূন্য রাজকোষ এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে পরিকল্পনা কমিশন গঠন ও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক কৌশল গ্রহণ করা হয়।
ক. পরিকল্পনা কমিশন গঠন (৩১শে মার্চ ১৯৭২)
মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত ক্ষুদ্রকায় ‘পরিকল্পনা সেল’-এর ওপর ভিত্তি করে ১৯৭২ সালের ৩১শে মার্চ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘পরিকল্পনা কমিশন’ গঠন করা হয়। পদাধিকারবলে এর চেয়ারম্যান ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এবং ডেপুটি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. নুরুল ইসলাম।
খ. প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৩-১৯৭৮)
পরিকল্পনা কমিশন গঠন করার মাত্র দেড় বছরের মধ্যে ১৯৭৩ সালের নভেম্বর মাসে দেশের প্রথম ‘পাঁচ বছর মেয়াদী অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা’ (First Five-Year Plan) পেশ করা হয়। এতে বাৎসরিক ৫.৫০% অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়, যেখানে দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং কৃষির পুনরুজ্জীবনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
গ. স্বাধীন দেশের প্রথম বাজেট পেশ
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় বাজেট ঘোষিত হয় ১৯৭২ সালের ৩০শে জুন। অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ প্রথম বাজেট পেশ করেন, যার আকার ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এই বাজেটের প্রায় ৬৪% অর্থ সরাসরি উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ যথাক্রমে ১৯৭২-৭৩, ১৯৭৩-৭৪ এবং ১৯৭৪-৭৫—পরপর তিনটি অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরে অর্থমন্ত্রী আজিজুর রহমান মল্লিক ১৫৪৯ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছিলেন।
প্রধান পুনর্গঠন কার্যক্রমের সংক্ষিপ্ত সারণী
- ২২শে ডিসেম্বর ১৯৭১ (মুজিবনগর সরকারের ঢাকায় প্রত্যাবর্তন): সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রে প্রশাসনিক ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়।
- ১০ই জানুয়ারি ১৯৭২ (বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন): দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নেতৃত্বের পূর্ণতা অর্জিত হয়।
- ১৩ই জানুয়ারি ১৯৭২ (‘আমার সোনার বাংলা’ জাতীয় সঙ্গীত ঘোষণা): স্বাধীন রাষ্ট্রের আত্মপরিচয় ও সাংবিধানিক ভিত্তি মজবুত করা হয়।
- ১৭ই জানুয়ারি ১৯৭২ (জাতীয় পতাকার রূপ গ্রহণ ও অস্ত্র সমর্পণের নির্দেশ): আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় পতাকার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা হয়।
- ১৫ই মার্চ ১৯৭২ (ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার): স্বাধীন ও সার্বভৌম হিসেবে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক মর্যাদা নিশ্চিত হয়।
- ৩১শে মার্চ ১৯৭২ (পরিকল্পনা কমিশন গঠন): দেশের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ ও দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি করা হয়।
- ৩০শে জুন ১৯৭২ (প্রথম বাজেট পেশ - ৭৮৬ কোটি টাকা): যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের উন্নয়ন ও পুনর্গঠনে অর্থনৈতিক ভিত্তি স্থাপন করা হয়।
- নভেম্বর ১৯৭৩ (প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা পেশ - ১৯৭৩-৭৮): বার্ষিক ৫.৫০% অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
সংবিধান প্রণয়ন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন (১৯৭২–১৯৭৫) সম্পর্কে
সংবিধান প্রণয়ন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন (১৯৭২–১৯৭৫) হলো বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক স্থান।
অবস্থান: ঢাকা → ঢাকা জেলা।
সংবিধান প্রণয়ন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন : ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নেয় এক নতুন সার্বভৌম রাষ্ট্র—গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। তবে এই বিজয়ের আনন্দ উদযাপনের পরপরই সদ্য স্বাধীন দেশটির সামনে এসে দাঁড়ায় এক হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ। দেশ তখন কেবল ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে...