ইতিহাস ও ঐতিহ্য

প্রাচীন বাংলার সূচনা ও আদি জনপদসমূহ

১৭০

বিস্তারিত বিবরণ

প্রাচীনকালে বর্তমান বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ মিলে গঠিত সুবিশাল ভূখণ্ড কোনো একক রাষ্ট্র বা শাসনব্যবস্থার অধীনে ছিল না। গঙ্গা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র ও করতোয়াসহ অসংখ্য নদ-নদী পরিবেষ্টিত এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলটি বিভিন্ন ভৌগোলিক খণ্ডে বিভক্ত ছিল। প্রাকৃতিক সীমানা দ্বারা বিভক্ত এই অঞ্চলগুলোতে আলাদা আলাদা সমাজ, সংস্কৃতি ও শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। প্রাচীন বাংলার এই ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বিভাজনগুলোকে ইতিহাসে 'জনপদ' বলা হয়। প্রাচীন বাংলার ইতিহাস মূলত এই জনপদগুলোরই ইতিহাস।

জনপদ কী?

সংস্কৃত 'জন' শব্দের অর্থ মানুষ বা অধিবাসী এবং 'পদ' শব্দের অর্থ পা বা পা রাখার স্থান। অর্থাৎ, প্রাচীনকালে সাধারণ মানুষ যেখানে দলবদ্ধভাবে বসবাস শুরু করেছিল, সেই নির্দিষ্ট ভূখণ্ডকেই জনপদ বলা হতো। প্রাচীন শিলালিপি, সাহিত্য এবং বিদেশি পরিব্রাজকদের বিবরণীতে বাংলার এই জনপদগুলোর নাম ও বিস্তৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

প্রাচীন বাংলার প্রধান জনপদসমূহ

ভৌগোলিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে প্রাচীনকালে জনপদগুলোর সীমানা প্রায়ই পরিবর্তিত হতো। বাংলার উল্লেখযোগ্য আদি জনপদগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১. পুণ্ড্র (Pundra)

প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ হলো পুণ্ড্র। ধারণা করা হয়, 'পুণ্ড্র' নামের এক প্রাচীন জাতি এই জনপদ গড়ে তুলেছিল। বর্তমান বাংলাদেশের বগুড়া, রংপুর, রাজশাহী ও দিনাজপুর এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ অঞ্চলের কিছু অংশ নিয়ে এই জনপদ বিস্তৃত ছিল। পুণ্ড্রদের রাজধানীর নাম ছিল 'পুণ্ড্রনগর', যা বর্তমানে বগুড়ার মহাস্থানগড় নামে পরিচিত। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে এখানে প্রাচীন সভ্যতার বহু নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে।

২. বঙ্গ (Vanga)

'বঙ্গ' একটি অতি প্রাচীন জনপদ। প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থ 'ঐতরেয় আরণ্যক'-এ প্রথম বঙ্গ নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া ও পটুয়াখালী জেলার অংশবিশেষ নিয়ে বঙ্গ জনপদ গঠিত ছিল। ভাগীরথী নদীর পূর্ব তীর থেকে শুরু করে মেঘনার মোহনা পর্যন্ত এই জনপদের বিস্তৃতি ছিল বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন। কালক্রমে এই 'বঙ্গ' নাম থেকেই 'বাংলা' বা 'বাংলাদেশ' নামের উৎপত্তি হয়েছে।

৩. সমতট (Samatata)

পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার মেঘনা নদীর মোহনা সংলগ্ন সমতল অঞ্চল প্রাচীনকালে সমতট নামে পরিচিত ছিল। বর্তমান কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলই ছিল প্রাচীন সমতট জনপদের মূল কেন্দ্র। চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-এর বিবরণ অনুযায়ী সমতট ছিল একটি আর্দ্র নিম্নভূমি। এর প্রাচীন রাজধানী ছিল 'বড়কামতা', যা কুমিল্লার কাছাকাছি অবস্থিত।

৪. গৌড় (Gaur)

প্রাচীন সাহিত্যে গৌড় নামটি বহুবার উল্লেখিত হলেও ঠিক কোন অঞ্চলে এটি প্রথম গড়ে উঠেছিল, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে সপ্তম শতকে রাজা শশাঙ্কের শাসনামলে গৌড় একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমান মালদহ, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম এবং বর্ধমান জেলার কিছু অংশ গৌড়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। শশাঙ্কের রাজধানী ছিল 'কর্ণসুবর্ণ'।

৫. হরিকেল (Harikela)

সপ্তম শতকের লেখকদের বর্ণনায় হরিকেল নামের জনপদের উল্লেখ পাওয়া যায়। চীনা পরিব্রাজক ইৎসিং-এর মতে, হরিকেল ছিল পূর্ব ভারতের শেষ সীমায়। বর্তমান সিলেট (প্রাচীন শ্রীহট্ট) থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলটি প্রাচীনকালে হরিকেল জনপদ নামে পরিচিত ছিল।

৬. রাঢ় (Radha)

ভাগীরথী নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত রাঢ় অঞ্চলটি প্রাচীন বাংলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। এই জনপদটি মূলত উত্তর রাঢ় ও দক্ষিণ রাঢ়—এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান, বাঁকুড়া, হুগলী ও মেদিনীপুর জেলার অংশবিশেষ নিয়ে রাঢ় জনপদ গঠিত ছিল। অজয় নদ ছিল উত্তর ও দক্ষিণ রাঢ়ের প্রাকৃতিক সীমানা।

৭. বরেন্দ্র (Varendra)

পুণ্ড্রবর্ধন জনপদের একটি অংশ হিসেবে বরেন্দ্র বা বরেন্দ্রী জনপদ পরিচিত। গঙ্গা ও করতোয়া নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল, অর্থাৎ বর্তমান রাজশাহী বিভাগের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে বরেন্দ্রভূমি গঠিত ছিল।

প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ও প্রাচীন সভ্যতার বিকাশ

প্রাচীন বাংলার এই জনপদগুলো যে উন্নত ও সুসংগঠিত সভ্যতার কেন্দ্র ছিল, তার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে। বগুড়ার মহাস্থানগড়ে (প্রাচীন পুণ্ড্রনগর) প্রাপ্ত পাথরে খোদাই করা ব্রাহ্মী লিপির শিলালিপি থেকে প্রমাণিত হয় যে, প্রাক-মৌর্য ও মৌর্য যুগে (খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে) এখানে উন্নত নগর সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল।

এছাড়া নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বরে প্রাপ্ত প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ, রৌপ্যমুদ্রা এবং নানা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন প্রমাণ করে যে, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় আড়াই হাজার বছর আগে বা তারও পূর্বে এক সমৃদ্ধ বাণিজ্য-ভিত্তিক নগর সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল।

  1. প্রাচীনকালের এই বিচ্ছিন্ন জনপদগুলো সময়ের পরিক্রমায় বিভিন্ন সময় শক্তিশালী শাসকদের অধীনে একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করেছে। মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন যুগ পেরিয়ে এই খণ্ডিত জনপদগুলোই ধীরে ধীরে একটি একক রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক সত্তায় পরিণত হতে শুরু করে, যা বাংলার পরবর্তী ইতিহাসের ভিত্তি রচনা করেছিল।
ঐতিহাসিক স্থান তালিকায় ফিরে যান

প্রাচীন বাংলার সূচনা ও আদি জনপদসমূহ সম্পর্কে

প্রাচীন বাংলার সূচনা ও আদি জনপদসমূহ হলো বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক স্থান।

প্রাচীনকালে বর্তমান বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ মিলে গঠিত সুবিশাল ভূখণ্ড কোনো একক রাষ্ট্র বা শাসনব্যবস্থার অধীনে ছিল না। গঙ্গা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র ও করতোয়াসহ অসংখ্য নদ-নদী পরিবেষ্টিত এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলটি বিভিন্ন ভৌগোলিক খণ্ডে বিভক্ত ছিল। প্রাকৃতিক সীমানা দ্বারা বিভক্ত এই অঞ্চলগুলোতে আলাদা আলাদা সমাজ, সংস্কৃতি ও...

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

প্রাচীন বাংলার সূচনা ও আদি জনপদসমূহ কী?
প্রাচীনকালে বর্তমান বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ মিলে গঠিত সুবিশাল ভূখণ্ড কোনো একক রাষ্ট্র বা শাসনব্যবস্থার অধীনে ছিল না। গঙ্গা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র ও করতোয়াসহ অসংখ্য নদ-নদী পরিবেষ্টিত এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলটি বিভিন্ন ভৌগোলিক খণ্ডে বিভক্ত ছিল। প্রাকৃতিক সীমানা দ্বারা বিভক্ত এই...
অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থান কোথায় দেখব?
ঐতিহাসিক স্থান তালিকায় ফিরে গিয়ে অন্যান্য স্থান দেখতে পারবেন।