ইতিহাস ও ঐতিহ্য

লাহোর প্রস্তাব (১৯৪০) ও পাকিস্তান আন্দোলন

১০১

বিস্তারিত বিবরণ

১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব (যা 'পাকিস্তান প্রস্তাব' নামেও খ্যাত) ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড়। এই প্রস্তাবের মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো উপমহাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোর সমন্বয়ে পৃথক ও স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের আনুষ্ঠানিক দাবি উত্থাপিত হয়, যা পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের রূপরেখা হিসেবে কাজ করেছিল।

১. লাহোর প্রস্তাবের পটভূমি

  1. রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন এবং ১৯৩৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগের আশানুরূপ ফল না হওয়া ও তৎকালীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির ফলে মুসলিম সমাজের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়।
  2. দ্বি-জাতি তত্ত্বের উন্মেষ: ১৯৪০ সালে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনে তৎকালীন সভাপতি মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ তাঁর দীর্ঘ বক্তৃতায় হিন্দু ও মুসলমানদের দুটি পৃথক জাতি হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং তাঁদের জন্য পৃথক স্বতন্ত্র ভূমির যুক্তি তুলে ধরেন।

২. উত্থাপন ও মূল ঘটনাপ্রবাহ (১৯৪০ খ্রি.)

  1. খসড়া প্রণয়ন ও উপস্থাপনা: পাঞ্জাবের (তৎকালীন অবিভক্ত পাঞ্জাব) মুখ্যমন্ত্রী সিকান্দার হায়াত খান প্রস্তাবের প্রাথমিক খসড়া তৈরি করেন। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে বাংলার (তৎকালীন অবিভক্ত বাংলা) মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক ঐতিহাসিক এই প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেন। চৌধুরী খালিকুজ্জামানসহ অন্য নেতৃবৃন্দ এটি সমর্থন করেন।
  2. 'শেরে বাংলা' উপাধি: লাহোর প্রস্তাব উপস্থাপনের সময় ফজলুল হকের বাগ্মিতা ও বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে এই সম্মেলনেই তাঁকে 'শেরে বাংলা' (বাংলার বাঘ) উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
  3. প্রস্তাব গ্রহণ: বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ১৯৪০ সালের ২৪ মার্চ সর্বসম্মতিক্রমে লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হয়।

৩. লাহোর প্রস্তাবের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ

১. ১৯৩৫ সালের আইনের বিরোধিতা: ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে প্রস্তাবিত কেন্দ্রীয় 'যুক্তরাষ্ট্রীয়' (Federal) কাঠামো ভারতীয় পরিস্থিতির সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অকার্যকর হওয়ায় তা সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করা হয়। ২. ভৌগোলিক সীমানা পুনর্গঠন: ভৌগোলিক অবস্থান বিচারে সংলগ্ন ও সন্নিহিত অঞ্চলগুলোকে সীমানা পরিবর্তনপূর্বক এমনভাবে গঠন করার দাবি জানানো হয়, যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম এলাকাগুলো অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। ৩. ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ (Independent States) ধারণা: প্রস্তাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম (যেমন: পাঞ্জাব, সিন্ধু, খাইবার পাখতুনখাওয়া/সীমান্ত প্রদেশ, বেলুচিস্তান) এবং উত্তর-পূর্ব (যেমন: বাংলা ও আসাম) অঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোকে নিয়ে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ (Independent States) গঠন করা হবে, যার প্রতিটি অঙ্গরাজ্য বা ইউনিট হবে সম্পূর্ণরূপে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম। ৪. সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষা: সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অঞ্চলে অমুসলিম সংখ্যালঘুদের এবং যেসব এলাকায় মুসলমানরা সংখ্যালঘু, সেখানে তাদের সাথে আলোচনা করে সংবিধানে কার্যকর ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার বিধান রাখতে হবে।

৪. প্রস্তাবের বিতর্ক ও পরবর্তী পরিবর্তন (১৯৪৬ খ্রি.)

  1. 'পাকিস্তান' নাম ও সংবাদপত্রের ভূমিকা: মূল লাহোর প্রস্তাবে 'পাকিস্তান' শব্দের কোনো উল্লেখ ছিল না। কিন্তু তৎকালীন বিভিন্ন হিন্দু ও ব্রিটিশ সংবাদপত্র একে 'পাকিস্তান দাবি' হিসেবে আখ্যায়িত করে ব্যঙ্গ করলেও, এটি দ্রুত সাধারণ মুসলিম জনতার মাঝে একটি জনপ্রিয় স্লোগানে পরিণত হয়।
  2. ১৯৪৬ সালের দিল্লি সম্মেলন ও বিতর্ক: ১৯৪৬ সালের ৭ এপ্রিল দিল্লিতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের আইনপ্রণেতাদের সম্মেলনে লাহোর প্রস্তাবের মূল ভিত্তি পরিবর্তন করা হয়।
  3. 'States' থেকে 'State': সোহরাওয়ার্দী কর্তৃক উত্থাপিত নতুন প্রস্তাবে বহুবচনবাচক ‘States’ (স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ)-এর জায়গায় একবচনবাচক ‘State’ (একটি সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্র) স্থলাভিষিক্ত করা হয়।
  4. বিতর্ক: বাংলার নেতা আবুল হাশিম এর তীব্র আইনি প্রতিবাদ জানান এবং মূল লাহোর প্রস্তাবে যে একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছিল তা স্মরণ করিয়ে দেন। জিন্নাহ এটিকে প্রথমে "মুদ্রণজনিত ভুল" (Typo) বললেও পরবর্তীতে আবুল হাশিম ও অন্যান্য বাঙালি নেতাদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে, ভৌগোলিক স্বায়ত্তশাসনের মূল স্পিরিট অক্ষুণ্ন থাকবে।

১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব কেবল একটি রাজনৈতিক সনদ ছিল না; এটি ছিল বাংলা (ঢাকা বিভাগ, ঢাকা জেলা) ও উপমহাদেশের মুসলিম জনগণের স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। যদিও ১৯৪৬ সালে একে একক পাকিস্তান রাষ্ট্রে রূপ দেওয়া হয়েছিল, তবে এর মূল প্রস্তাবে নিহিত থাকা "স্বাধীন ও সার্বভৌম অঞ্চল"-এর ধারণাটিই পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল ঐতিহাসিক ও আইনি ভিত্তি তৈরি করেছিল।

ঐতিহাসিক স্থান তালিকায় ফিরে যান

লাহোর প্রস্তাব (১৯৪০) ও পাকিস্তান আন্দোলন সম্পর্কে

লাহোর প্রস্তাব (১৯৪০) ও পাকিস্তান আন্দোলন হলো বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক স্থান।

অবস্থান: ঢাকা।

১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব (যা 'পাকিস্তান প্রস্তাব' নামেও খ্যাত) ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড়। এই প্রস্তাবের মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো উপমহাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোর সমন্বয়ে পৃথক ও স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের আনুষ্ঠানিক দাবি উত্থাপিত হয়, যা পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে ভারত...

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

লাহোর প্রস্তাব (১৯৪০) ও পাকিস্তান আন্দোলন কী?
১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব (যা 'পাকিস্তান প্রস্তাব' নামেও খ্যাত) ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড়। এই প্রস্তাবের মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো উপমহাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোর সমন্বয়ে পৃথক ও স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের আনুষ্ঠানিক দাবি...
অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থান কোথায় দেখব?
ঐতিহাসিক স্থান তালিকায় ফিরে গিয়ে অন্যান্য স্থান দেখতে পারবেন।