ইতিহাস ও ঐতিহ্য

মুর্শিদকুলি খান ও স্বাধীন নবাবী আমল (১৭১৭–১৭৫৭ খ্রি:)

১০১

বিস্তারিত বিবরণ

১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদকুলি খান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন নবাবী আমল ছিল বাংলার ইতিহাসে রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক উজ্জ্বল অধ্যায়। ১৭১৭ থেকে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের পলাশীর যুদ্ধ পর্যন্ত স্থায়িত্ব পাওয়া এই আমল একদিকে যেমন রাজস্ব ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এনেছিল, অন্যদিকে তেমনই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছিল।

১. মুর্শিদকুলি খান ও স্বাধীন নবাবীর সূচনা (১৭১৭–১৭২৭ খ্রি:)

১৭০০ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আওরঙ্গজেব মুর্শিদকুলি খানকে বাংলার ‘দেওয়ান’ (রাজস্ব কর্মকর্তা) হিসেবে নিযুক্ত করেন। পরবর্তীতে ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট ফাররুখশিয়ার তাঁকে বাংলার ‘নাজিম’ (সুবেদার) হিসেবে স্বীকৃতি দিলে তিনি সুবেদার ও দেওয়ান—দুই পদ একত্রিত করে বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব হিসেবে শাসন শুরু করেন।

  1. রাজধানী স্থানান্তর: ১৭০৪ খ্রিস্টাব্দেই তিনি প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে এবং মোগল রাজপুত্র আজিম-উস-শানের ষড়যন্ত্র এড়াতে রাজধানী জাহাঙ্গীরনগর (ঢাকা) থেকে মাকসুদাবাদে স্থানান্তর করেন। ১৭০৪-১৭০৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে সম্রাটের অনুমতিতে স্থানটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘মুর্শিদাবাদ’।
  2. রাজস্ব সংস্কার (মাল জসমেনি): তিনি প্রশাসনিক সংস্কার করে মধ্যস্বত্বভোগীদের অবসান ঘটান এবং সরাসরি জমিদারি ও ‘ইজারা’ ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজস্ব আদায় জোরদার করেন। ফলে মোগল সাম্রাজ্যে পতন দেখা দিলেও বাংলায় প্রচুর রাজস্ব উদ্বৃত্ত থাকে।
  3. অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: তাঁর সুশাসনের ফলে বাংলা তৎকালীন ভারতের সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।

২. পরবর্তীতে প্রধান নবাবগণ এবং শাসনকাল

মুর্শিদকুলি খানের পর তাঁর উত্তরসূরিরা বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় পূর্ণ স্বাধীনভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করেন।

সুজাউদ্দিন খান ও সরফরাজ খান (১৭২৭–১৭৪০ খ্রি:)

মুর্শিদকুলি খানের মৃত্যুর পর তাঁর জামাতা সুজাউদ্দিন খান (১৭২৭–১৭৩৯ খ্রি:) সিংহাসনে বসেন। তিনি বিহারকে বাংলার অন্তর্ভুক্ত করে এক বিশাল প্রশাসনিক অঞ্চল গঠন করেন। তবে তাঁর পুত্র সরফরাজ খান (১৭৩৯–১৭৪০ খ্রি:) অদক্ষ প্রমাণিত হলে বিহারের নায়েব নাযিম আলীবর্দী খান ‘গিরিয়ার যুদ্ধে’ তাঁকে পরাজিত করে ক্ষমতা দখল করেন।

আলীবর্দী খান ও মারাঠা আক্রমণ (১৭৪০–১৭৫৬ খ্রি:)

আলীবর্দী খান ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ ও কৌশলী শাসক।

  1. বর্গীর হামলা প্রতিহতকরণ: তাঁর ১৭ বছরের শাসনকালের বড় অংশজুড়ে ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে মারাঠা বা ‘বর্গী’ হামলাকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়। শেষপর্যন্ত ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দে চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে তিনি বাংলাকে সুরক্ষিত করেন।
  2. ইউরোপীয়দের নিয়ন্ত্রণ: তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিসহ ইউরোপীয় বণিকদের বাংলায় বাণিজ্য করতে দিলেও তাদের কোনো রাজনৈতিক দুর্গার্মাণ বা সামরিক আধিপত্য বিস্তার করতে দেননি।

৩. নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও স্বাধীন নবাবীর পতন (১৭৫৬–১৭৫৭ খ্রি:)

  1. ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে মাতামহ আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর মাত্র ২৩ বছর বয়সে সিরাজউদ্দৌলা বাংলার নবাব হন। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই তাঁকে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নানা ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হতে হয়।
  2. ঘসেটি বেগম ও শওকত জঙ্গের ষড়যন্ত্র ➔ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্য ➔ মির জাফর ও জগৎ শেঠের বিশ্বাসঘাতকতা ➔ পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭)
  3. বিরোধের কারণ: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ নির্মাণ শুরু করে, নবাবের আদেশ অমান্য করে এবং দস্তকের (করমুক্ত বাণিজ্য পারমিট) অপব্যবহার করে।
  4. পলাশীর যুদ্ধ (২৩ জুন ১৭৫৭): ব্রিটিশ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ নবাবের প্রধান সেনাপতি মির জাফর, প্রভাবশালী বণিক জগৎ শেঠ এবং রায়দুর্লভের সাথে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে প্রহসনমূলক যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন এবং পরবর্তীতে নিহত হন।

৪. স্বাধীন নবাবী আমলের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

  1. বাণিজ্য ও অর্থনীতি: এই আমলেই বাংলা বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সুতি বস্ত্র, রেশম, শোরার বিপুল চাহিদার কারণে বিশ্বের সোনা-রূপা বাংলায় এসে জমা হতো।
  2. সার্বভৌমত্বের বিকাশ: মোগল কেন্দ্র দুর্বল হয়ে পড়লেও নবাবদের কারণে বাংলা নিজস্ব স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখেছিল।
  3. ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা: ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন নবাবী আমলের অবসান ঘটে এবং ভারতীয় উপমহাদেশে দীর্ঘ ১৯০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের কালো অধ্যায় শুরু হয়।

মুর্শিদকুলি খান থেকে শুরু হওয়া স্বাধীন নবাবী আমল ছিল বাংলার আর্থিক প্রাচুর্য ও রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের গৌরবময় যুগ। তবে দরবারের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কোন্দল, আমাত্যদের বিশ্বাসঘাতকতা এবং ব্রিটিশ বণিকদের সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবের কারণে ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে এই স্বাধীন নবাবী সুর্যের অস্তমিত ঘটে।

ঐতিহাসিক স্থান তালিকায় ফিরে যান

মুর্শিদকুলি খান ও স্বাধীন নবাবী আমল (১৭১৭–১৭৫৭ খ্রি:) সম্পর্কে

মুর্শিদকুলি খান ও স্বাধীন নবাবী আমল (১৭১৭–১৭৫৭ খ্রি:) হলো বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক স্থান।

১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদকুলি খান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন নবাবী আমল ছিল বাংলার ইতিহাসে রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক উজ্জ্বল অধ্যায়। ১৭১৭ থেকে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের পলাশীর যুদ্ধ পর্যন্ত স্থায়িত্ব পাওয়া এই আমল একদিকে যেমন রাজস্ব ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এনেছিল, অন্যদিকে তেমনই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিকে...

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

মুর্শিদকুলি খান ও স্বাধীন নবাবী আমল (১৭১৭–১৭৫৭ খ্রি:) কী?
১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদকুলি খান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন নবাবী আমল ছিল বাংলার ইতিহাসে রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক উজ্জ্বল অধ্যায়। ১৭১৭ থেকে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের পলাশীর যুদ্ধ পর্যন্ত স্থায়িত্ব পাওয়া এই আমল একদিকে যেমন রাজস্ব ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এনেছিল,...
অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থান কোথায় দেখব?
ঐতিহাসিক স্থান তালিকায় ফিরে গিয়ে অন্যান্য স্থান দেখতে পারবেন।
মুর্শিদকুলি খান ও স্বাধীন নবাবী আমল (১৭১৭–১৭৫৭ খ্রি:) | বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থান | তথ্যবক্স | Totthobox