ইতিহাস ও ঐতিহ্য

১৯৪৭ এর দেশভাগ ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান

৮৯

বিস্তারিত বিবরণ

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতীয় উপমহাদেশে দীর্ঘ প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে। এর ঠিক একদিন আগে, ১৪ আগস্ট, লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ‘থ্রি জুন প্ল্যান’ (৩রা জুনের পরিকল্পনা) অনুযায়ী ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হয়ে ‘পাকিস্তান’ এবং ‘ভারত’ নামে দুটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়।

লাহোর প্রস্তাবের মূল চেতনাকে একপাশে সরিয়ে রেখে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পূর্ব বাংলাকে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামে নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের একটি দূরবর্তী প্রদেশ বানিয়ে দেওয়া হয়।

১. দেশভাগের পটভূমি ও লর্ড মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে ভারতে শাসন বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব থেকে শুরু করে বিশ শতকের নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজ, নৌবিদ্রোহ এবং মহাত্মা গান্ধী ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর রাজনৈতিক আন্দোলনের চাপে ব্রিটিশরা ভারত ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।

  1. ৩রা জুনের পরিকল্পনা (১৯৪৭ খ্রি.): ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন ১৯৪৭ সালের ৩ জুন ভারত বিভাগের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয় দলই দেশভাগের এই প্রস্তাব মেনে নেয়।
  2. সিলেটের গণভোট (জুলাই ১৯৪৭ খ্রি.): আসামের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা সিলেট (সিলেট বিভাগ, সিলেট জেলা) ভারতের সাথে থাকবে নাকি পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবে, তা নির্ধারণে ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ জুলাই একটি ঐতিহাসিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে সিলেটের সিংহভাগ মানুষ পাকিস্তানের পক্ষে রায় দিলে এটি পূর্ব বাংলার (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান; বর্তমান বাংলাদেশ) অন্তর্ভুক্ত হয়।

২. রেডক্লিফ লাইন ও দেশভাগের মানবিক বিপর্যয়

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সীমানা নির্ধারণের জন্য ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার সাইরিল রেডক্লিফ-এর নেতৃত্বে ‘বাউন্ডারি কমিশন’ গঠন করা হয়।

  1. মানচিত্রের ওপর কালির দাগ: রেডক্লিফ এই অঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতা, নদীনালা বা বহু বছরের জনবসতির কথা বিবেচনা না করে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে টেবিল ম্যাপের ওপর দাগ টেনে সীমানা নির্ধারণ করেন, যা ইতিহাসে ‘রেডক্লিফ লাইন’ নামে পরিচিত। এর ফলে বহু মানুষের শোবার ঘর ভারতে আর রান্নাঘর পাকিস্তানে পড়ে যাওয়ার মতো অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
  2. ইতিহাসের বৃহত্তম উদ্বাস্তু সংকট: সীমানা ঘোষণার সাথে সাথে উপমহাদেশ জুড়ে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। কোটি কোটি মানুষ তাদের ভিটেমাটি ছেড়ে রাতারাতি উদ্বাস্তু হয়ে সীমান্ত পাড়ি দিতে বাধ্য হয়। এই দেশভাগের প্রক্রিয়ায় প্রায় ১০ থেকে ২০ লাখ মানুষ সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় প্রাণ হারান এবং অসংখ্য নারী নির্যাতনের শিকার হন।

৩. পূর্ব বাংলা ও পাকিস্তানের নতুন ঔপনিবেশিক রূপ

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট করাচিতে (সিন্ধু প্রদেশ, পাকিস্তান) পাকিস্তানের স্বাধীনতার দলিল স্বাক্ষরিত হয়। লর্ড মাউন্টব্যাটেন পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নাম ঘোষণা করেন। ১৫ আগস্ট জওহরলাল নেহেরু স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দিল্লির (দিল্লি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, ভারত) লাল কেল্লায় তেরঙা পতাকা উত্তোলন করেন।

  1. ভৌগোলিক অসমতা: পাকিস্তানের মানচিত্রে পূর্ব বাংলা (ঢাকা বিভাগ, ঢাকা জেলাকেন্দ্রিক পূর্ব পাকিস্তান) যুক্ত হলেও পশ্চিম পাকিস্তানের (করাচি) সাথে এর দূরত্ব ছিল প্রায় ১০০০ মাইল। মাঝখানে ছিল বিশাল ভারত ভূখণ্ড। কেবল ধর্মের মিল ছাড়া এই দুই অঞ্চলের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মধ্যে কোনো মিল ছিল না।
  2. নতুন শোষণের সূচনা: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সূর্য অস্তমিত হলেও, বাঙালিরা খুব দ্রুতই বুঝতে পারে যে তারা আসলে স্বাধীনতার নামে এক নতুন সুদূর পরাহত ও শোষক পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অধীনে আটকা পড়েছে। রাজধানী, সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্রের মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে।

৪. দেশভাগের প্রভাব: অসাম্প্রদায়িক চেতনার বীজ

ব্রিটিশদের ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ নীতির চূড়ান্ত পরিণতি ছিল এই দেশভাগ। তবে ১৯৪৭ সালের এই কৃত্রিম দেশভাগের পরই মূলত বাঙালিরা তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। আর এই নতুন চেতনার প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকেই, যা পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের রূপ নেয়।


১৯৪৭ সালের দেশভাগ ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর মোড়। এটি ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটালেও বাঙালিদের জন্য প্রকৃত স্বাধীনতা নিয়ে আসেনি; বরং ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক শোষণের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। তবে এই অন্যায় বঞ্চনাই পরবর্তীতে বাঙালির মনে স্বাধিকার ও ভাষা চেতনার বীজ রোপণ করে, যা একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে।

ঐতিহাসিক স্থান তালিকায় ফিরে যান

১৯৪৭ এর দেশভাগ ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান সম্পর্কে

১৯৪৭ এর দেশভাগ ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হলো বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক স্থান।

অবস্থান: ঢাকা।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতীয় উপমহাদেশে দীর্ঘ প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে। এর ঠিক একদিন আগে, ১৪ আগস্ট, লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ‘থ্রি জুন প্ল্যান’ (৩রা জুনের পরিকল্পনা) অনুযায়ী ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হয়ে ‘পাকিস্তান’ এবং ‘ভারত’ নামে দুটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়। লাহোর...

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১৯৪৭ এর দেশভাগ ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান কী?
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতীয় উপমহাদেশে দীর্ঘ প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে। এর ঠিক একদিন আগে, ১৪ আগস্ট, লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ‘থ্রি জুন প্ল্যান’ (৩রা জুনের পরিকল্পনা) অনুযায়ী ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হয়ে ‘পাকিস্তান’ এবং ‘ভারত’ নামে দুটি স্বাধীন ও...
অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থান কোথায় দেখব?
ঐতিহাসিক স্থান তালিকায় ফিরে গিয়ে অন্যান্য স্থান দেখতে পারবেন।
১৯৪৭ এর দেশভাগ ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান | বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থান | তথ্যবক্স | Totthobox