জনমিতি ও সমাজ

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তাদের জীবনধারা

বাংলাদেশের পরিচিতি · বিস্তারিত তথ্য

১৮৩
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তাদের জীবনধারা
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তাদের জীবনধারা
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তাদের জীবনধারা
+ ২ টি

বিস্তারিত বিবরণ

বাংলাদেশ মূলত বাঙালি অধ্যুষিত দেশ হলেও এর ভূখণ্ডে আবহমানকাল ধরে বসবাস করে আসছে বৈচিত্র্যময় ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অধিকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও বহুমাত্রিক সমাজব্যবস্থা গঠনে এই নৃগোষ্ঠীগুলোর অবদান অনস্বীকার্য। সরকারি পরিসংখ্যান ও বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ৫০টিরও বেশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। তাদের স্বতন্ত্র সমাজব্যবস্থা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, ভাষা এবং উৎসব বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ ও বর্ণিল করেছে।

ভৌগোলিক অবস্থান ও বিস্তৃতি

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো মূলত দেশের দুটি প্রধান অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে বসবাস করে: ১. পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল: রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি—এই তিন পার্বত্য জেলায় চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, পাংখোয়া, খুমী, চাক, লুসাই প্রভৃতি নৃগোষ্ঠীর বসবাস। ২. সমতল ভূমি ও অন্যান্য অঞ্চল: দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল (রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর, রংপুর) এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে (সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা) সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো বসবাস করে। এদের মধ্যে সাঁওতাল, গারো, খাসিয়া, মণিপুরী, হাজং, ওঁরাও, রাখাইন ও মাহালি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া উপকূলীয় অঞ্চল কক্সবাজার ও পটুয়াখালীতে রাখাইন সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে।

প্রধান কয়েকটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

  1. চাকমা: বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত সবচেয়ে বৃহৎ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হলো চাকমা। তারা মূলত বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। তাদের প্রধান উৎসব ‘বিজু’।
  2. সাঁওতাল: সমতল ভূমিতে বসবাসকারী সবচেয়ে বড় নৃগোষ্ঠী সাঁওতাল। তারা মূলত রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলে বাস করে। সাঁওতাল বিদ্রোহ ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। তাদের প্রধান উৎসব ‘সোহরাই’।
  3. গারো: ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও নেত্রকোনা অঞ্চলে গারোদের বসবাস। তাদের সমাজব্যবস্থা মাতৃতান্ত্রিক। বর্তমানে গারোদের অধিকাংশই খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী। তাদের প্রধান কৃষিভিত্তিক উৎসব হলো ‘ওয়ানগালা’।
  4. মারমা: পার্বত্য চট্টগ্রামের দ্বিতীয় বৃহত্তম নৃগোষ্ঠী হলো মারমা। তারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। মারমাদের অন্যতম প্রধান উৎসব ‘সাংগ্রাই’, যা জলকেলির (পানি খেলা) জন্য বিখ্যাত।
  5. মণিপুরী: সিলেট ও মৌলভীবাজার অঞ্চলে বসবাসরত মণিপুরীদের নিজস্ব সমৃদ্ধ সংস্কৃতি রয়েছে। ‘মণিপুরী নৃত্য’ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত এবং তাদের প্রধান উৎসব ‘রাসলীলা’ বা ‘রাসমেলা’।

জীবনধারা ও সমাজব্যবস্থা

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর জীবনযাত্রা বাঙালিদের তুলনায় বেশ ভিন্ন ও বৈচিত্র্যময়। প্রকৃতির সাথে নিবিড় সম্পর্ক রেখেই তাদের জীবন আবর্তিত হয়।

১. সমাজ ও পরিবার প্রথা: অধিকাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক হলেও গারো এবং খাসিয়া সমাজ সম্পূর্ণ মাতৃতান্ত্রিক। মাতৃতান্ত্রিক সমাজে পরিবারের প্রধান হন নারী এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকারও মেয়েরা পেয়ে থাকে। সমাজ পরিচালনায় পার্বত্য অঞ্চলে ‘সার্কেল চিফ’ বা রাজা, হেডম্যান (মৌজা প্রধান) এবং কার্বারি (গ্রাম প্রধান) প্রথা প্রচলিত রয়েছে। সমতলের নৃগোষ্ঠীদের মধ্যেও নিজস্ব পঞ্চায়েত বা গোত্রপ্রধান ব্যবস্থা বিদ্যমান।

২. অর্থনীতি ও পেশা: ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ি ঢালে জঙ্গল পরিষ্কার করে তারা যে বিশেষ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে, তাকে ‘জুম চাষ’ বলা হয়। তবে বর্তমানে অনেকেই সমতল পদ্ধতিতে হালচাষ, ফলের বাগান (যেমন: আনারস, কমলা, পেঁপে) এবং রাবার বাগানের সাথে যুক্ত হয়েছেন। খাসিয়ারা পান চাষের জন্য বিখ্যাত। এছাড়া হস্তশিল্প, বাঁশ ও বেতের কাজ এবং নিজস্ব তাঁতে কাপড় বোনার ক্ষেত্রেও তারা অত্যন্ত দক্ষ।

৩. খাদ্যাভ্যাস: তাদের খাদ্যাভ্যাসে পাহাড়ি ও স্থানীয় উপকরণের প্রাধান্য দেখা যায়। ভাতের পাশাপাশি বিভিন্ন শাকসবজি, মাছ ও মাংস তাদের দৈনন্দিন খাবার। চাকমাদের জনপ্রিয় খাবার ‘বাঁশ কোড়ল’ (কচি বাঁশ)। এছাড়া ছোট মাছ বা চিংড়ি শুকিয়ে তৈরি বিশেষ ধরনের শুঁটকি ‘নাপ্পি’ বা ‘সিদল’ পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীদের রান্নায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন উৎসব-পার্বণে চাল থেকে তৈরি বিশেষ পানীয় (যেমন: হাঁড়িয়া বা চুয়ানি) পরিবেশনের প্রচলন রয়েছে।

৪. পোশাক ও অলংকার: অধিকাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নিজস্ব তাঁতে বোনা কাপড় পরিধান করে। চাকমা নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের নাম ‘পিনন ও হাদি’। মারমা নারীরা ‘থামি’ এবং পুরুষরা লুঙ্গি ও শার্ট পরে। গারো নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘দকমান্দা’। এছাড়া মণিপুরী তাঁতের শাড়ি ও চাদর সারা দেশেই অত্যন্ত জনপ্রিয়। অলংকার হিসেবে তারা রুপা, তামা, পুঁতি, এবং বিভিন্ন বন্য প্রাণীর হাড় ও দাঁতের তৈরি গহনা ব্যবহার করতে পছন্দ করে।

৫. উৎসব ও সংস্কৃতি: ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকাংশ উৎসবই প্রকৃতি ও কৃষিভিত্তিক। নতুন বছর বরণ বা ফসল তোলার সময় তারা আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠে। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমাদের ‘বিজু’, মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ এবং ত্রিপুরাদের ‘বৈসুক’ উৎসবকে একত্রে ‘বৈসাবি’ বলা হয়, যা পাহাড়ে সবচেয়ে বড় উৎসব। এসব উৎসবে তারা নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র (যেমন: বাঁশি, মাদল, ঢোল) বাজিয়ে ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশন করে।

বর্তমান অবস্থা ও সরকারি উদ্যোগ

আধুনিকতার ছোঁয়া ও নগরায়নের ফলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর জীবনযাত্রায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। অনেকেই এখন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার্থে বাংলাদেশ সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাজশাহী, নেত্রকোনা ও মৌলভীবাজারে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট’ স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, সাদ্রী প্রভৃতি ভাষায় প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হয়েছে, যেন শিশুরা তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ করতে পারে।

প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে বসবাসকারী এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো তাদের সততা, সরলতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি ও সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণ বাংলাদেশের বহুমাত্রিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বাংলাদেশের পরিচিতি তালিকায় ফিরে যান

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তাদের জীবনধারা সম্পর্কে

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তাদের জীবনধারা ক্যাটাগরি: জনমিতি ও সমাজ.

বাংলাদেশ মূলত বাঙালি অধ্যুষিত দেশ হলেও এর ভূখণ্ডে আবহমানকাল ধরে বসবাস করে আসছে বৈচিত্র্যময় ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অধিকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও বহুমাত্রিক সমাজব্যবস্থা গঠনে এই নৃগোষ্ঠীগুলোর অবদান অনস্বীকার্য। সরকারি পরিসংখ্যান ও বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ৫০টিরও...

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তাদের জীবনধারা কী?
বাংলাদেশ মূলত বাঙালি অধ্যুষিত দেশ হলেও এর ভূখণ্ডে আবহমানকাল ধরে বসবাস করে আসছে বৈচিত্র্যময় ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অধিকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও বহুমাত্রিক সমাজব্যবস্থা গঠনে এই নৃগোষ্ঠীগুলোর অবদান অনস্বীকার্য। সরকারি পরিসংখ্যান ও বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ৫০টিরও...
অন্যান্য তথ্য কোথায় পাব?
বাংলাদেশের পরিচিতি তালিকায় ফিরে গিয়ে অন্যান্য তথ্য দেখতে পারবেন।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তাদের জীবনধারা | বাংলাদেশের পরিচিতি | তথ্যবক্স | Totthobox