ভূগোল ও পরিবেশ

নদ-নদী, ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ু

বাংলাদেশের পরিচিতি · বিস্তারিত তথ্য

১৪০
নদ-নদী, ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ু
নদ-নদী, ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ু
নদ-নদী, ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ু
+ ৫ টি

বিস্তারিত বিবরণ

পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার বা সোমপুর মহাবিহার বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন, বৃহৎ এবং তাৎপর্যপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। রাজশাহী বিভাগের নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুর গ্রামে অবস্থিত এই মহাবিহারটি একসময় ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চা ও ধর্মচর্চার কেন্দ্র ছিল। প্রাচীন বাংলার গৌরবময় ইতিহাস ও স্থাপত্যকলার অসামান্য নিদর্শন হিসেবে এটি বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও প্রতিষ্ঠা

অষ্টম শতাব্দীর শেষের দিকে বা নবম শতাব্দীর শুরুতে পাল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় রাজা ধর্মপাল (৭৮১-৮২১ খ্রিষ্টাব্দ) এই বিশাল বিহারটি নির্মাণ করেন। পাল বংশের রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলায় বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির ব্যাপক প্রসার ঘটে। সে সময় এই বিহারের মূল নাম ছিল ‘সোমপুর মহাবিহার’। প্রাচীন তিব্বতীয় সূত্র এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল থেকে জানা যায়, এটি সে যুগে সমগ্র এশিয়ার অন্যতম প্রধান উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র ছিল। বিখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান একসময় এই মহাবিহারে অবস্থান করে ধর্ম, দর্শন ও শাস্ত্র চর্চা করেছিলেন এবং বেশ কয়েকটি গ্রন্থ অনুবাদ করেছিলেন বলে জানা যায়।

নামকরণের ইতিহাস

কালের পরিক্রমায় মহাবিহারটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার পর এটি মাটি, বালু ও লতাপাতায় ঢেকে গিয়ে একটি সুউচ্চ ঢিবি বা পাহাড়ের রূপ ধারণ করে। স্থানীয় সাধারণ মানুষ এই বিশাল ঢিবিটিকে ‘পাহাড়’ মনে করত। সেই ঢিবির অবস্থান থেকেই মূলত জায়গাটির নাম হয় ‘পাহাড়পুর’ এবং সেই সূত্রে প্রাচীন সোমপুর মহাবিহার আধুনিককালে পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার নামে পরিচিতি লাভ করে।

স্থাপত্যশৈলী ও গঠন

পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং দৃষ্টিনন্দন। সম্পূর্ণ বিহারটি প্রায় ২৭ একর (প্রায় ১১ হেক্টর) জায়গা জুড়ে বিস্তৃত, যা একে উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ বিহারের মর্যাদা দিয়েছে।

  1. চতুষ্কোণাকার নকশা: বিহারটি একটি বিশাল বর্গাকার কাঠামোর ওপর নির্মিত। এর চারদিক ঘিরে ভিক্ষু ও শিক্ষার্থীদের বসবাসের জন্য মোট ১৭৭টি কক্ষ (Cell) রয়েছে। এর মধ্যে উত্তর দিকে ৪৫টি এবং অন্য তিন দিকে ৪৪টি করে কক্ষ অবস্থিত।
  2. মূল মন্দির: বিহারের বিশাল আঙিনার ঠিক মাঝখানে একটি সুউচ্চ ক্রুশাকার (Cruciform) মূল মন্দির রয়েছে। এই মন্দিরটির স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত জটিল ও অনন্য। ক্রমান্বয়ে ওপরের দিকে উঠে যাওয়া ধাপে ধাপে তৈরি এই মন্দিরের গঠন মিয়ানমার বা ইন্দোনেশিয়ার প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দিরগুলোর (যেমন: বোরোবুদুর) সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
  3. পোড়ামাটির ফলক (টেরাকোটা): পাহাড়পুর বিহারের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো এর দেয়ালজুড়ে থাকা অসংখ্য পোড়ামাটির ফলক। প্রায় ২,৮০০টিরও বেশি টেরাকোটা ফলক মূল মন্দিরের দেয়ালে সন্নিবেশিত ছিল। এসব ফলকে সে সময়কার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, জীবজন্তু, পাখি, ফুল এবং হিন্দু ও বৌদ্ধ দেবদেবীর নানা পৌরাণিক কাহিনী অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও আবিষ্কার

উনিশ শতকের শুরুর দিকে ১৮০৭ থেকে ১৮১২ সালের মধ্যে ব্রিটিশ জরিপকারী বুকানন হ্যামিলটন প্রথম এই স্থানটি পরিদর্শন করেন এবং এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করেন। পরবর্তীতে ১৮৭৯ সালে প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম এখানে খননকাজ শুরু করার উদ্যোগ নেন, কিন্তু স্থানীয় জমিদারের বিরোধিতার কারণে তা বেশিদূর এগোতে পারেনি।

পরবর্তীতে ১৯২২-২৩ সালে ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের (Archaeological Survey of India) উদ্যোগে প্রত্নতত্ত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, কে. এন. দীক্ষিত এবং অন্যান্যদের নেতৃত্বে এখানে বিজ্ঞানভিত্তিক ও ব্যাপক খননকাজ পরিচালিত হয়। এই খননের ফলেই প্রাচীন সোমপুর মহাবিহারের পূর্ণাঙ্গ রূপ মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বিভিন্ন ধাপে এখানকার সংস্কার ও সংরক্ষণের কাজ করেছে।

পতন ও বিলুপ্তি

পাহাড়পুর বিহারের পতন একদিনে ঘটেনি। একাদশ শতকের শেষভাগে পাল সাম্রাজ্যের দুর্বলতা এবং সেন বংশের উত্থানের ফলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা তাদের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা হারাতে শুরু করে। দ্বাদশ শতকের দিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক অস্থিরতা, বহিঃশত্রুর আক্রমণ এবং সম্ভবত অগ্নিকাণ্ডের কারণে বিহারটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাংলাদেশের পরিচিতি তালিকায় ফিরে যান

নদ-নদী, ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ু সম্পর্কে

নদ-নদী, ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ু ক্যাটাগরি: ভূগোল ও পরিবেশ.

পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার বা সোমপুর মহাবিহার বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন, বৃহৎ এবং তাৎপর্যপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। রাজশাহী বিভাগের নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুর গ্রামে অবস্থিত এই মহাবিহারটি একসময় ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চা ও ধর্মচর্চার কেন্দ্র ছিল। প্রাচীন বাংলার গৌরবময় ইতিহাস ও...

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

নদ-নদী, ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ু কী?
পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার বা সোমপুর মহাবিহার বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন, বৃহৎ এবং তাৎপর্যপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। রাজশাহী বিভাগের নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুর গ্রামে অবস্থিত এই মহাবিহারটি একসময় ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চা ও ধর্মচর্চার কেন্দ্র ছিল। প্রাচীন বাংলার গৌরবময় ইতিহাস ও...
অন্যান্য তথ্য কোথায় পাব?
বাংলাদেশের পরিচিতি তালিকায় ফিরে গিয়ে অন্যান্য তথ্য দেখতে পারবেন।
নদ-নদী, ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ু | বাংলাদেশের পরিচিতি | তথ্যবক্স | Totthobox