সঙ্গীতশিল্পী

আইয়ুব বাচ্চু

৫
আইয়ুব বাচ্চু
আইয়ুব বাচ্চু
আইয়ুব বাচ্চু
+ ১ টি

জীবন বৃত্তান্ত

জীবন ও সংগীতসাধনা

আইয়ুব বাচ্চু (১৬ আগস্ট ১৯৬২ – ১৮ অক্টোবর ২০১৮) ছিলেন একজন প্রখ্যাত দূরদর্শী সংগীতজ্ঞ, গায়ক-গীতিকার, সুরকার এবং কিংবদন্তি গিটারবাদক। তাঁকে বাংলাদেশের সংগীতে পপ-রক ও হার্ড রক ধারার অন্যতম প্রধান প্রবর্তক এবং দেশের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ গিটারবাদকদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর ব্যান্ড ‘এল আর বি’ (Love Runs Blind)-এর মাধ্যমে তিনি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে রক মিউজিকের এক স্বর্ণযুগ গড়ে তোলেন। গিটারের জাদুকরী সুর, অনন্য কণ্ঠশৈলী এবং গভীর আবেগময় গান দিয়ে তিনি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছেন।

জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন

আইয়ুব বাচ্চু ১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার খরনা ইউনিয়নে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম ইশহাক চৌধুরী এবং মায়ের নাম নুরজাহান বেগম। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার জ্যেষ্ঠ।

কৈশোরে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর তাঁদের পরিবার চট্টগ্রাম শহরের জুবীলি রোডে বসবাস শুরু করে। ১৯৭৩ সালে ১১তম জন্মদিনে বাবা তাঁকে প্রথম একটি গিটার উপহার দেন। লেড সেপলিনের মতো বিখ্যাত ব্রিটিশ ও আমেরিকান রক ব্যান্ডের গান শুনে এবং বিশেষ করে কিংবদন্তি গিটারবাদক জিমি হেনড্রিক্সের বাদনশৈলীতে মুগ্ধ হয়ে তিনি গিটার শেখার প্রতি গভীরভাবে অনুরাগী হন।

শিক্ষাজীবন ও সংগীতের সূচনা

তিনি ১৯৭৯ সালে চট্টগ্রাম সরকারি মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

কলেজ জীবনে বন্ধুদের নিয়ে তিনি গঠন করেন প্রথম ব্যান্ড ‘আগলি বয়েজ’ (যেখানে গায়ক ছিলেন কুমার বিশ্বজিৎ)। ১৯৭৭ সালে তিনি প্রখ্যাত ব্যান্ড ‘ফিলিংস’-এ (বর্তমানে নগর বাউল) গিটারবাদক হিসেবে যোগ দেন এবং সেখানে জেমসের সাথে কাজ করেন। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে তিনি বিখ্যাত ব্যান্ড ‘সোলস’-এ মূল গিটারবাদক ও গায়ক হিসেবে যোগদান করেন। সোলসের সাথে ১০ বছর যুক্ত থেকে তিনি সুপার সোলস (১৯৮২), কলেজের করিডোরে (১৯৮৫), মানুষ মাটির কাছাকাছি (১৯৮৭) এবং ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট (১৯৮৮) অ্যালবামে অবদান রাখেন।

‘এল আর বি’ গঠন ও কালজয়ী সাফল্য

হেভি রক ও রকিং গিটার মিউজিকের প্রতি অগাধ ভালোবাসার কারণে ১৯৯০ সালের শেষের দিকে তিনি সোলস ত্যাগ করেন এবং ১৯৯১ সালের ৫ এপ্রিল ঢাকায় গঠন করেন নিজের স্বপ্নের ব্যান্ড ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’, যা পরবর্তীতে ‘এল আর বি’ (লাভ রানস ব্লাইন্ড) নামে বিশ্বজুড়ে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

  1. ঐতিহাসিক অ্যালবাম: ১৯৯২ সালে এল আর বি প্রকাশ করে বাংলাদেশের সংগীত ইতিহাসের প্রথম জোড়া অ্যালবাম—এল আর বি ১ ও এল আর বি ২। এরপর প্রকাশিত হয় সুখ (১৯৯৩), যা বাংলা রক মিউজিকের অন্যতম সেরা অ্যালবাম হিসেবে বিবেচিত। এই অ্যালবামের কালজয়ী গান ‘সেই তুমি (চলো বদলে যাই)’ আইয়ুব বাচ্চুর জীবনের অন্যতম সেরা সৃষ্টি।
  2. অন্যান্য ব্যান্ড অ্যালবাম: তবুও (১৯৯৪), ঘুমন্ত শহরে (১৯৯৫), স্বপ্ন (১৯৯৬), আমাদের বিস্ময় (১৯৯৮), মন চাইলে মন পাবে (২০০১), স্পর্শ (২০০৭) ইত্যাদি।
  3. আন্তর্জাতিক পারফর্ম্যান্স: এল আর বি প্রথম বাংলাদেশি ব্যান্ড হিসেবে নিউ ইয়র্কের ঐতিহ্যবাহী ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে কনসার্ট করার গৌরব অর্জন করে।

একক ক্যারিয়ার ও বৈচিত্র্যময় সৃষ্টি

একজন একক শিল্পী হিসেবেও আইয়ুব বাচ্চু অভূতপূর্ব সাফল্য পান।

  1. একক অ্যালবাম: ১৯৮৬ সালে তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম রক্ত গোলাপ প্রকাশিত হয়। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত ময়না অ্যালবামের মাধ্যমে একক শিল্পী হিসেবে তাঁর ব্যাপক পরিচিতি ঘটে। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত একক অ্যালবাম ‘কষ্ট’, যার “কষ্ট পেতে ভালোবাসি”, “কষ্ট কাকে বলে” গানগুলো অভাবনীয় জনপ্রিয়তা লাভ করে।
  2. যন্ত্রসংগীত: ২০০৭ সালে তিনি প্রকাশ করেন দেশের প্রথম পুরোদস্তুর বাদ্যযন্ত্রভিত্তিক (ইনস্ট্রুমেন্টাল) অ্যালবাম ‘সাউন্ড অব সাইলেন্স’।
  3. চলচ্চিত্রের গান: চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেও তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা পান। তাঁর গাওয়া আম্মাজান চলচ্চিত্রের শিরোনাম গান “আম্মাজান” বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম সফল গান। এছাড়া ‘সাগরিকা’, ‘ব্যাচেলর’, ‘রং নাম্বার’ ইত্যাদি চলচ্চিত্রে তাঁর গান সর্বজনাদৃত হয়।

ব্যক্তিগত জীবন ও স্বীকৃতি

আইয়ুব বাচ্চু ১৯৯১ সালের ৩১ জানুয়ারি ফেরদৌস চন্দনার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের দুই সন্তান—কন্যা ফাইরুজ সাফরা আইয়ুব এবং পুত্র আহনাফ তাজওয়ার আইয়ুব। সংগীত চর্চার পাশাপাশি তিনি ঢাকায় ‘এবি কিচেন’ নামে নিজস্ব সাউন্ড স্টুডিও ও রেকর্ড লেবেল গড়ে তোলেন।

সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার, সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস, বাচসাস পুরস্কার এবং ভারতে ‘টেপ্রি সিনে আজীবন সম্মাননা’ লাভ করেন। বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০২৬ সালে মরণোত্তর একুশে পদক-এ ভূষিত করে।

তিরোধান ও স্মৃতি

দীর্ঘদিন ফুসফুস ও হৃদরোগের জটিলতায় ভোগার পর ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর ৫৬ বছর বয়সে ঢাকায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এই মহান সংগীতশিল্পী মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জন্মশহর চট্টগ্রামে চৈতন্য গলিতে মায়ের কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

তাঁর স্মৃতিকে অমর করে রাখতে চট্টগ্রামের প্রবর্তক মোড়ে ১৮ ফুট উচ্চতার একটি গিটারের ভাস্কর্য ‘রূপালী গিটার’ স্থাপন করা হয়।


প্রোফাইল আর্কাইভে ফিরে যান

আইয়ুব বাচ্চু সম্পর্কে

আইয়ুব বাচ্চু প্রোফাইলটি সঙ্গীতশিল্পী শ্রেণির তথ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।

জীবন ও সংগীতসাধনা আইয়ুব বাচ্চু (১৬ আগস্ট ১৯৬২ – ১৮ অক্টোবর ২০১৮) ছিলেন একজন প্রখ্যাত দূরদর্শী সংগীতজ্ঞ, গায়ক-গীতিকার, সুরকার এবং কিংবদন্তি গিটারবাদক। তাঁকে বাংলাদেশের সংগীতে পপ-রক ও হার্ড রক ধারার অন্যতম প্রধান প্রবর্তক এবং দেশের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ গিটারবাদকদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর ব্যান্ড ‘এল আর বি’...

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

আইয়ুব বাচ্চু কী?
জীবন ও সংগীতসাধনা আইয়ুব বাচ্চু (১৬ আগস্ট ১৯৬২ – ১৮ অক্টোবর ২০১৮) ছিলেন একজন প্রখ্যাত দূরদর্শী সংগীতজ্ঞ, গায়ক-গীতিকার, সুরকার এবং কিংবদন্তি গিটারবাদক। তাঁকে বাংলাদেশের সংগীতে পপ-রক ও হার্ড রক ধারার অন্যতম প্রধান প্রবর্তক এবং দেশের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ গিটারবাদকদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর ব্যান্ড ‘এল আর বি’...
অন্যান্য প্রোফাইল কোথায় দেখব?
প্রোফাইল আর্কাইভ তালিকায় ফিরে গিয়ে অন্যান্য ব্যক্তিদের প্রোফাইল দেখতে পারবেন।