সমাজসংস্কারকসাহিত্যিকনারী অধিকার কর্মী

বেগম রোকেয়া

৩১৫
বেগম রোকেয়া
বেগম রোকেয়া
বেগম রোকেয়া
+ ১ টি

জীবন বৃত্তান্ত

জীবন ও সাহিত্যকর্ম

বেগম রোকেয়া (৯ ডিসেম্বর ১৮৮০ – ৯ ডিসেম্বর ১৯৩২) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভিক বাঙালি সমাজসংস্কারক, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, নারীবাদী চিন্তাবিদ এবং নারীশিক্ষার অগ্রদূত। তৎকালীন রক্ষণশীল ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মুসলিম নারীদের পর্দার আড়াল থেকে বের করে শিক্ষা, জ্ঞান ও আত্মমর্যাদার আলোয় আলোকিত করার ক্ষেত্রে তিনি অবিস্মরণীয় অবদান রেখে গেছেন। তাঁকে বাংলা তথা দক্ষিণ এশিয়ার নারীমুক্তির আন্দোলনের অন্যতম প্রধান পথপ্রদর্শক হিসেবে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়।

জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন

বেগম রোকেয়া ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার) পায়রাবন্দ গ্রামের এক অভিজাত রক্ষণশীল মুসলিম জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্ণ নাম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। তাঁর পিতার নাম জহীরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের এবং মাতার নাম রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরাণী।

তৎকালীন রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের কোনো সুযোগ ছিল না। কঠোর পর্দার আড়ালে বাড়িতে মেয়েদের আরবি ও ফারসি শেখানো হতো। তবে রোকেয়ার বড় ভাই ইব্রাহিম সাবের এবং বড় বোন করিমুননেসার উৎসাহ ও প্রচ্ছন্ন সহযোগিতায় তিনি রাতের আঁধারে মোমবাতির আলোয় বাংলা, ইংরেজি এবং আধুনিক শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগী হয়ে ওঠেন।

বিবাহ ও দাম্পত্য জীবন

১৮৯৬ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে ভাগলপুরের বিশিষ্ট জমিদার ও ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট খান বাহাদুর সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন-এর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন অত্যন্ত উদার ও প্রগতিশীল মনের মানুষ। তিনি রোকেয়ার লেখালেখি ও শিক্ষার স্পৃহাকে কেবল উৎসাহিতই করেননি, বরং তাঁর সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করার জন্য সব রকমের সুযোগ করে দেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ১৯০৯ সালে সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর রোকেয়া তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তির একটি অংশ নারীশিক্ষার প্রসারে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন।

সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা

স্বামীর মৃত্যুর মাত্র পাঁচ মাস পর, ১৯০৯ সালের ১ অক্টোবর বিহারের ভাগলপুরে মাত্র পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে বেগম রোকেয়া প্রতিষ্ঠা করেন ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’। পরবর্তীতে পারিবারিক ও সামাজিক বিভিন্ন জটিলতার কারণে ১৯১১ সালে তিনি স্কুলটি কলকাতার বালিগঞ্জে স্থানান্তরিত করেন। গোড়ার দিকে নানা প্রতিকূলতা, সমাজের তীব্র বিরোধিতা এবং ছাত্রী স্বল্পতা সত্ত্বেও তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বুঝিয়ে মেয়েদের স্কুলে আনতে সক্ষম হন। এই বিদ্যালয়টিই পরবর্তীকালে কলকাতার অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বালিকা বিদ্যালয়ে পরিণত হয়।

সাহিত্যকর্ম ও সৃষ্টির বৈচিত্র্য

বেগম রোকেয়া কেবল একজন সমাজসংস্কারকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যিক। তাঁর লেখনীতে সমাজের কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস এবং নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদের সুর উচ্চারিত হয়েছে।

১. সুলতানার স্বপ্ন (Sultana’s Dream)

১৯০৫ সালে মাদ্রাজ থেকে প্রকাশিত ‘সুলতানার স্বপ্ন’ তাঁর একটি বিশ্বখ্যাত কল্পবিজ্ঞান ও নারীবাদী উপন্যাসিকা (ইংরাজিতে রচিত)। এতে ‘লেডি ল্যান্ড’ বা এমন এক সমাজের কল্পনা করা হয়েছে যেখানে পুরুষেরা পর্দার অন্তরালে থাকে এবং নারীরা রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনা করে। এটি বিশ্ব সাহিত্যেই নারীবাদী কল্পবিজ্ঞানের অন্যতম আদি নিদর্শন।

২. প্রবন্ধ ও অন্যান্য গ্রন্থ

  1. মতিচূর (প্রথম খণ্ড ১৯০৪, দ্বিতীয় খণ্ড ১৯২২): এটি তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ সংকলন। এতে নারীদের অধিকার, আত্মমর্যাদা এবং সামাজিক মুক্তির নানা দিক অত্যন্ত সাবলীলভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
  2. পদ্মরাগ (১৯২৪): এটি তাঁর একটি মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজবাস্তবতা নির্ভর উপন্যাস, যেখানে নারী মুক্তি ও তাদের স্বাবলম্বী হওয়ার সংগ্রামের চিত্র ফুটে উঠেছে।
  3. অরক্ষিত প্রবাস (১৯৩১) এবং নারীর অধিকার: সমাজে নারীদের ওপর চলা বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিবাদী রচনা।

সমাজ সংস্কার ও আঞ্জুমান-ই-খাওয়াতিন-ই-ইসলাম

নারী সমাজের সামগ্রিক উন্নতির জন্য শিক্ষা প্রসারের পাশাপাশি তিনি ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘আঞ্জুমান-ই-খাওয়াতিন-ই-ইসলাম’ (মুসলিম নারী সমিতি) নামক সংগঠন। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি অসহায়, দরিদ্র ও স্বামী পরিত্যক্ত নারীদের নানা ধরনের কুটির শিল্প, সেলাই ও কারিগরি শিক্ষা প্রদান এবং তাদের আইনি ও সামাজিক অধিকার রক্ষায় কাজ করেন।

তিরোধান

১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর তাঁর নিজ জন্মদিনে (৯ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুদিনও বটে) ৫২ বছর বয়সে কলকাতার বালিগঞ্জে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের প্রাঙ্গণেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন। কলকাতার সোদপুরে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

বেগম রোকেয়া তাঁর আজীবন সংগ্রাম ও অসামান্য দূরদর্শিতার মাধ্যমে নারী সমাজের মেরুদণ্ড শক্ত করে গেছেন। তাঁর অমর আদর্শ ও চিন্তাধারা আজও বিশ্বজুড়ে নারী অধিকার ও সমতার লড়াইয়ে একটি উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করছে।

কর্মজীবনের ইতিহাস

প্রতিষ্ঠাতা
1909 – 1932
প্রধান শিক্ষিকা
1909 – 1932
প্রোফাইল আর্কাইভে ফিরে যান

বেগম রোকেয়া সম্পর্কে

বেগম রোকেয়া প্রোফাইলটি সমাজসংস্কারক, সাহিত্যিক, নারী অধিকার কর্মী শ্রেণির তথ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।

জীবন ও সাহিত্যকর্ম বেগম রোকেয়া (৯ ডিসেম্বর ১৮৮০ – ৯ ডিসেম্বর ১৯৩২) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভিক বাঙালি সমাজসংস্কারক, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, নারীবাদী চিন্তাবিদ এবং নারীশিক্ষার অগ্রদূত। তৎকালীন রক্ষণশীল ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মুসলিম নারীদের পর্দার আড়াল থেকে বের করে শিক্ষা, জ্ঞান ও আত্মমর্যাদার আলোয় আলোকিত করার...

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

বেগম রোকেয়া কী?
জীবন ও সাহিত্যকর্ম বেগম রোকেয়া (৯ ডিসেম্বর ১৮৮০ – ৯ ডিসেম্বর ১৯৩২) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভিক বাঙালি সমাজসংস্কারক, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, নারীবাদী চিন্তাবিদ এবং নারীশিক্ষার অগ্রদূত। তৎকালীন রক্ষণশীল ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মুসলিম নারীদের পর্দার আড়াল থেকে বের করে শিক্ষা, জ্ঞান ও আত্মমর্যাদার আলোয় আলোকিত করার...
অন্যান্য প্রোফাইল কোথায় দেখব?
প্রোফাইল আর্কাইভ তালিকায় ফিরে গিয়ে অন্যান্য ব্যক্তিদের প্রোফাইল দেখতে পারবেন।