জহির রায়হান



জীবন বৃত্তান্ত
জীবন ও সাহিত্যকর্ম
জহির রায়হান (১৯ আগস্ট ১৯৩৫ – ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত বাঙালি কথাসাহিত্যিক, কালজয়ী চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও সাংবাদিক। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও প্রগতিশীল সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম প্রধান পুরোধা। তাঁর লেখনী ও চলচ্চিত্রে সমাজবাস্তবতা, ভাষার অধিকার এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল চেতনা অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর নির্মিত ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মম গণহত্যার চিত্র তুলে ধরে বিশ্বজনমত গঠনে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছিল।
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
জহির রায়হান ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট বর্তমান ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আসল নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। তাঁর বাবার নাম মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ এবং মায়ের নাম সৈয়দা কাসিমুন্নেসা। তাঁর বড় ভাই শহীদুল্লা কায়সার ছিলেন একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবী, প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন।
ভাষা আন্দোলন ও রাজপথের সংগ্রাম
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে জহির রায়হান অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আমতলা থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল নিয়ে বের হওয়া প্রথম ১০ জন ছাত্রের দলে তিনিও ছিলেন, যার ফলে তিনি গ্রেপ্তার হন ও কারাবরণ করেন। ভাষা আন্দোলনের সেই ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং চেতনা পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
সাহিত্যকর্ম ও সৃষ্টির বৈচিত্র্য
কথাশিল্পী হিসেবে জহির রায়হান খুব অল্প বয়সেই খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর উপন্যাসে গ্রামীণ সমাজচিত্র থেকে শুরু করে মধ্যবিত্তের জীবনসংগ্রাম ও রাজনৈতিক সচেতনতার স্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে।
- হাজার বছর ধরে (১৯৬৪): এটি তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস, যাতে আবহমান গ্রামবাংলার মানুষের জীবন, অন্ধবিশ্বাস ও গ্রামীণ সংস্কৃতির জীবন্ত রূপ ফুটে উঠেছে। এই উপন্যাসের জন্য তিনি মর্যাদাপূর্ণ ‘আদমজী সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন।
- আরেক ফাল্গুন (১৯৬৯): ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত তাঁর একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ উপন্যাস।
- বরফ গলা নদী (১৯৬৯): মধ্যবিত্ত পরিবারের অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও মানবিক মূল্যবোধের ক্ষয়িষ্ণু রূপ নিয়ে রচিত উপন্যাস।
- আর কত দিন (১৯৭০): যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা নিয়ে রচিত একটি আন্তর্জাতিক মানের রাজনৈতিক উপন্যাস।
- অন্যান্য উপন্যাস: ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’, ‘তৃষ্ণা’, ‘কয়েকটি সংলাপ’ ইত্যাদি।
চলচ্চিত্র নির্মাণ ও মহান মুক্তিযুদ্ধ
১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে তিনি চলচ্চিত্রে পা রাখেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলা চলচ্চিত্রের ধারাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান।
- জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০): এটি তাঁর পরিচালিত সবচেয়ে কালজয়ী চলচ্চিত্র। তৎকালীন পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসনের প্রেক্ষাপটে একটি পরিবারের রূপকের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, একুশে ফেব্রুয়ারির গান ও গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে এতে চিত্রায়িত করা হয়।
- অন্যান্য চলচ্চিত্র: ‘কখনো আসেনি’ (১৯৬১ - প্রথম পরিচালিত ছবি), ‘কাঁচের দেয়াল’ (১৯৬৩), ‘সঙ্গম’ (১৯৬৪ - পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র), ‘বাহানা’ (১৯৬৫ - পাকিস্তানের প্রথম সিনেমা স্কোপ ছবি), ‘আনোয়ারা’ (১৯৬৭)।
- স্টপ জেনোসাইড (১৯৭১): মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ভারতে অবস্থান নিয়ে মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালান। পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা ও শরণার্থীদের করুণ চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে তিনি নির্মাণ করেন ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ (Stop Genocide)। এছাড়া ‘এ স্টেট ইজ বন’ (A State is Born) নামক প্রামাণ্যচিত্রও তিনি তৈরি করেন।
নিখোঁজ ও তিরোধান
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর আলবদর বাহিনী তাঁর বড় ভাই বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লা কায়সারকে অপহরণ করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি জহির রায়হান খবর পান যে তাঁর নিখোঁজ ভাই মিরপুরে বন্দি আছেন। ভাইকে খুঁজতে গিয়ে মিরপুরে ছদ্মবেশী আলবদর ও সশস্ত্র বিহারিদের হাতে তিনি নিখোঁজ হন। এরপর তাঁর আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি মিরপুরেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
জহির রায়হান সম্পর্কে
জহির রায়হান প্রোফাইলটি মুক্তিযোদ্ধা, চলচ্চিত্র নির্মাতা / পরিচালক, ঔপন্যাসিক শ্রেণির তথ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
জীবন ও সাহিত্যকর্ম জহির রায়হান (১৯ আগস্ট ১৯৩৫ – ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত বাঙালি কথাসাহিত্যিক, কালজয়ী চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও সাংবাদিক। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও প্রগতিশীল সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম প্রধান পুরোধা। তাঁর লেখনী ও চলচ্চিত্রে সমাজবাস্তবতা, ভাষার অধিকার...